পবিত্র কোরআনে আসহাবুল উখদুদ তথা খাদের অধিবাসীদের কাহিনি এমন এক অনন্য ইতিহাসের কথা তুলে ধরে, যা সত্যের প্রতি অবিচল ও ঈমানের দৃঢ়তা এবং আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ নিদর্শন। যারা মূলত জালেম শাসকের জুলুমের কাছে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। তাদের ইতিহাস আমাদের নিয়ে যায় ইয়েমেনের হিমিয়ার রাজবংশের শেষ শাসক জু নুওয়াসের শাসনামলে, আনুমানিক ৫২০ খ্রিস্টাব্দে। সে ছিল এক নিষ্ঠুর ও অত্যাচারী শাসক।
তার রাজত্বকালে নাজরান অঞ্চলে এক বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে, যার ফলে সেখানকার মানুষ ব্যাপকভাবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। এই ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে এক কিশোর, যাকে আল্লাহ বিশেষভাবে মনোনীত করেছিলেন। আল্লাহর কুদরতে এই কিশোর জন্মান্ধ, কুষ্ঠরোগী ও নানা দুরারোগ্যে আক্রান্ত মানুষদের আরোগ্য দান করত। একদিন এমনই একজন সুস্থপ্রাপ্ত ব্যক্তি অত্যাচারী রাজা জু নুওয়াসের দরবারে উপস্থিত হয়।
রাজা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কে তোমাকে সুস্থ করেছে?’ লোকটি বলল, ‘আমার প্রভু—আল্লাহ।’ রাজা বলল, ‘আমি?’ সে দৃঢ়ভাবে জবাব দিল, ‘না, বরং জগৎসমূহের রব।’ এই জবাবে রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত সেই কিশোরের সন্ধান পায়। তবে বহু চেষ্টা করেও রাজা তাকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়।
অবশেষে কিশোর নিজেই বলে দেয় কিভাবে তাকে হত্যা করা সম্ভব। সে বলে, “আমাকে একটি কাঠের সঙ্গে বেঁধে লোকজনকে একত্র করো। তারপর আমার তূণ থেকে একটি তীর নিয়ে বলবে—‘আল্লাহর নামে, ছেলেটির প্রভুর নামে’, তারপর তীর নিক্ষেপ করবে।” রাজা তাই করল। তীরটি কিশোরের শরীরে বিদ্ধ হলো এবং সে শহীদ হলো।
তখন উপস্থিত লোকেরা একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, ‘আমরাও এই কিশোরের প্রভুতে বিশ্বাস করি!’ তখন এ ঘটনায় রাজা ক্রুদ্ধ হয়ে আদেশ দিল—যারা ঈমান এনেছে তাদের সবাইকে একত্র করতে। বিশাল বিশাল পরিখা (খাদ) খনন করা হলো এবং তাতে আগুন জ্বালানো হলো। প্রত্যেক বিশ্বাসীকে বলা হলো— ধর্ম ত্যাগ করো, নতুবা জীবন্ত আগুনে নিক্ষিপ্ত হও। হাজার হাজার ধৈর্যশীল ও ঈমানদার মানুষ সেই আগুনে ঝাঁপ দিয়ে শাহাদাত বরণ করল। তাদের রক্ত ও আত্মত্যাগ ইতিহাসে ঈমানের অবিচলতার এক চিরন্তন দৃষ্টান্ত হয়ে রইল। এ কারণেই কোরআনে তাদের স্মরণ করা হয়েছে। আসহাবুল উখদুদ নামে ঐতিহাসিক উখদুদ শহরটি বর্তমানে সৌদি আরবের নাজরান অঞ্চলের দক্ষিণাংশে অবস্থিত, নাজরান শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে। শহরটি প্রায় চার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত ছিল এবং একসময় এটি ছিল সমৃদ্ধ ও উন্নত জনপদ। প্রত্নতাত্ত্বিক খননকার্যে এখান থেকে অসংখ্য মৃৎপাত্র, অলংকার, শিলালিপি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন উদ্ধার হয়েছে, যা এর সমৃদ্ধ সভ্যতার সাক্ষ্য বহন করে। ইসলামের আগমন পর্যন্ত এই শহরটি মূলত খ্রিস্টান অধ্যুষিত ছিল। পরবর্তীকালে, ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়লে এখানকার মানুষদের সামনে তিনটি পথ উন্মুক্ত করা হয়—ইসলাম গ্রহণ, যুদ্ধ অথবা জিজিয়া প্রদান। হিজরতের নবম বছরে নাজরান থেকে খ্রিস্টানদের একটি প্রতিনিধিদল মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে উপস্থিত হয়। তারা তাদের বিশ্বাসে অবিচল থেকে জিজিয়া প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।







