২৫শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ১১ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

/

কর্টিসল কী? স্ট্রেস হরমোন নিয়ে যা জানা জরুরি

কর্টিসল কী? স্ট্রেস হরমোন নিয়ে যা জানা জরুরি

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

ব্যস্ত জীবনযাপন ও কাজের চাপের কারণে অনেক প্রাপ্তবয়স্কই আজকাল অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগের মধ্যে থাকেন। তবে এই চাপ যদি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে, তাহলে শরীরে কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। কর্টিসলকে সাধারণভাবে বলা হয় “স্ট্রেস হরমোন”।

চাপের পরিস্থিতিতে শরীরকে সতর্ক ও সক্রিয় রাখতে কর্টিসল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকলে তা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

চলুন, জেনে নিই কর্টিসল কী, কেন এর মাত্রা বেড়ে যায়, এর ক্ষতিকর প্রভাব এবং কিভাবে এই স্ট্রেস হরমোন নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করা যায়।

কর্টিসল কী?
কর্টিসল হলো শরীরের স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন। যদিও একে ‘স্ট্রেস হরমোন’ বলা হয়, তবে এর কাজ শুধু চাপের প্রতিক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়।

ব্যানার–ইউনিভার্সিটি মেডিসিনের এন্ডোক্রাইনোলজিস্ট ডা. লীনা শাহলা জানান, কর্টিসল কিডনির ওপর অবস্থিত অ্যাড্রিনাল গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। এই গ্রন্থিগুলো হাইপোথ্যালামিক–পিটুইটারি–অ্যাড্রিনাল অ্যাক্সিসের অংশ, যেখানে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস ও পিটুইটারি গ্রন্থি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পিটুইটারি গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত অ্যাড্রিনোকর্টিকোট্রপিক হরমোন কর্টিসলের উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে। কর্টিসল শরীরের বিপাকক্রিয়া, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা এবং প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
পাশাপাশি স্ট্রেসের সময় ‘ফাইট অর ফ্লাইট’ প্রতিক্রিয়ায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

কর্টিসলের মাত্রা কেন বেড়ে যায়?
ডা. শাহলা জানান, কর্টিসল একটি স্বাভাবিক দৈনিক ছন্দ বা সার্কেডিয়ান রিদম অনুসরণ করে। সাধারণত সকালে এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে এবং দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কমে রাতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। এই প্রক্রিয়া ঘুম ও জাগরণের সময়সূচি ঠিক রাখতে সাহায্য করে। তবে যদি সকালের পরও দীর্ঘ সময় কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকে, তাহলে তা কোনো অন্তর্নিহিত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে

চিকিৎসা পরিভাষায় একে বলা হয় হাইপারকর্টিসোলিজম।

কর্টিসল বেড়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণগুলো হলো—
১। কুশিং সিনড্রোম বা কুশিং রোগ (পিটুইটারি বা অ্যাড্রিনাল গ্রন্থির টিউমারের কারণে)
২। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক বা শারীরিক স্ট্রেস
৩। মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার ব্যায়াম (যদিও পরে কর্টিসল স্বাভাবিক হয়)
৪। ঘুমের অভাব বা নিম্নমানের ঘুম
৫। দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ বা অটোইমিউন রোগ
৬। কিছু ওষুধ, বিশেষ করে কর্টিকোস্টেরয়েড (যেমন প্রেডনিসোন)
৭। অতিরিক্ত অ্যালকোহল ও ক্যাফেইন গ্রহণ

কর্টিসল বেশি হলে কী ধরনের সমস্যা হতে পারে?
দীর্ঘদিন কর্টিসলের মাত্রা বেশি থাকলে শরীর ও মনে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন—
পেটের চারপাশে অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি,
উচ্চ রক্তচাপ, 
ডায়াবেটিস,
অস্টিওপোরোসিস, 
হৃদরোগ,
স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়া,
অনিদ্রা ও অন্যান্য ঘুমের সমস্যা,
মেজাজের পরিবর্তন ও খিটখিটে ভাব,
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও পেশির দুর্বলতা,
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া,
অনিয়মিত মাসিক,
যৌন ইচ্ছা হ্রাস,

কর্টিসল কমানোর উপায়
আপনার কর্টিসল বেশি মনে হলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। রক্ত, লালা বা প্রস্রাব পরীক্ষার মাধ্যমে কর্টিসলের মাত্রা নির্ণয় করা যায়। কারণ জানা গেলে চিকিৎসা সহজ হয়।

স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণের কৌশল
গভীর শ্বাস-প্রশ্বাস, ধ্যান ও যোগব্যায়াম,
নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ (প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা, সাইক্লিং বা সাঁতার),
মাইন্ডফুলনেস চর্চা, যেমন মাইন্ডফুল মেডিটেশন বা সচেতনভাবে খাওয়া,
ঘুমকে গুরুত্ব দিন, 
নির্দিষ্ট ঘুম ও জাগরণের সময়সূচি বজায় রাখুন,
শান্ত ও আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করুন,
ঘুমের আগে ক্যাফেইন ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস এড়িয়ে চলুন,
ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন,
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলুন (শস্য, শাকসবজি, ফল, প্রোটিন ও স্বাস্থ্যকর চর্বি),
সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখুন,
সময় ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করুন।

ওষুধ কি প্রয়োজন?
অধিকাংশ ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমেই কর্টিসল নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তবে কুশিং সিনড্রোমের মতো অবস্থায় বিশেষ ওষুধ, অস্ত্রোপচার বা রেডিয়েশন থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। ডা. শাহলা দীর্ঘদিন স্টেরয়েড ব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে কম মাত্রা এবং সবচেয়ে কম সময়ের জন্য স্টেরয়েড ব্যবহার করা উচিত।

কাজ বা পারিবারিক জীবনের চাপ যদি অসহনীয় মনে হয়, তাহলে চিকিৎসক বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলুন। দীর্ঘদিন কর্টিসল বেশি থাকলে তা শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণ, পর্যাপ্ত ঘুম ও ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনের মাধ্যমে কর্টিসলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। নিজের যত্নে নেওয়া ছোট ছোট পদক্ষেপই দীর্ঘমেয়াদে আপনার স্বাস্থ্য ও সুখে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

সূত্র: ব্যানার হেলথ

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর