৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

ডেঙ্গু দমনে প্রযুক্তির ব্যবহার: ডিএনসিসির বিশেষ অভিযানে ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান

ডেঙ্গু দমনে প্রযুক্তির ব্যবহার: ডিএনসিসির বিশেষ অভিযানে ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান
ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান
ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান

বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই রাজধানীর জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কঠোর অবস্থানে নেমেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ এবং ডেঙ্গু আতঙ্ক থেকে নগরবাসীকে বাঁচাতে আজ সকাল থেকে উত্তরার বিভিন্ন সেক্টর ও মিরপুর এলাকায় বিশেষ চিরুনি অভিযান শুরু হয়েছে। এবারের অভিযানের প্রধান আকর্ষণ হলো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ; যেখানে ভবনের দুর্গম ছাদে ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান করা হচ্ছে। অভিযানে সরাসরি উপস্থিত থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডিএনসিসি মেয়র।

মশা নিধনে চিরুনি অভিযানের সূচনা

আজ ভোরে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর থেকে এই বিশেষ অভিযানের সূচনা হয়। সিটি কর্পোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী, মশক নিধন কর্মী এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত বিশাল দল প্রতিটি রাস্তায় ও গলিতে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কাজ শুরু করে। মেয়র জানিয়েছেন, প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০ দিনব্যাপী এই চিরুনি অভিযান চলবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় গত বছর ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি ছিল, সেখানে ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

ড্রোন প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ

উচ্চবিত্ত এলাকায় অনেক সময় ভবনের ছাদে বাগান থাকে বা নির্মাণাধীন ভবনের উপরে পানি জমে থাকে, যেখানে সাধারণ কর্মীদের পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। এই সমস্যার সমাধানে ডিএনসিসি কর্তৃপক্ষ ড্রোনের সাহায্য নিচ্ছে। আজ উত্তরার বহুতল ভবনগুলোতে ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান করার সময় বেশ কিছু চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। ড্রোনের ক্যামেরায় অনেক ভবনের কার্নিশ এবং ছাদে পরিষ্কার পানির জমানো আধার দেখা গেছে, যা এডিস মশার আদর্শ প্রজনন ক্ষেত্র।

মেয়রের প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ ও কড়া হুঁশিয়ারি

অভিযান চলাকালে মিরপুর এলাকায় মেয়র নিজে ড্রোন মনিটরিং স্ক্রিনে লার্ভার উপস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, “নগরবাসীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। আমরা প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন প্রতিটি ঘরের ছাদে পৌঁছে যাচ্ছি। ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান করার ফলে এখন আর কেউ লার্ভা লুকিয়ে রাখতে পারবে না।” তিনি আরও জানান, যে সব বাড়ির ছাদে লার্ভা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরো পড়ুনঃ গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ

নির্মাণাধীন ভবনে জরিমানা ও আইনি পদক্ষেপ

আজকের অভিযানে উত্তরা ও মিরপুরের বেশ কয়েকটি নির্মাণাধীন ভবনকে বড় অংকের জরিমানা করা হয়েছে। অনেক স্থানে বেজমেন্টে ও নির্মাণ সামগ্রীর স্তূপে পানি জমে লার্ভা জন্মানোর প্রমাণ পেয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান করে এই ভবনগুলোকে চিহ্নিত করা হয়। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা জানান, লার্ভা পাওয়ায় আজ মোট তিনটি ভবন মালিককে ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়েছে এবং অনাদায়ে কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

জনসচেতনতা ও নগরবাসীর ভূমিকা

কেবল সিটি কর্পোরেশনের একার পক্ষে শহরকে মশামুক্ত রাখা সম্ভব নয়। মেয়র বারবার নগরবাসীকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান করে আমরা আপনাদের সচেতন করতে পারি, কিন্তু আপনাদের বাড়ির আঙ্গিনা পরিষ্কার রাখার দায়িত্ব আপনাদেরই। বিশেষ করে ডাবের খোসা, টব বা পরিত্যক্ত পাত্রে যেন পানি না জমে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।”

মিরপুর ও উত্তরার চিরুনি অভিযানের প্রভাব

মিরপুরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ড্রোন ও ফগার মেশিনের সমন্বিত ব্যবহার আজ স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আশার আলো জাগিয়েছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, অনেক সময় বড় বড় অ্যাপার্টমেন্টের ছাদে মশার চাষ হলেও বাইরে থেকে কিছু বোঝা যায় না। এখন ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান করার ফলে বাড়ির মালিকরা আরও বেশি সচেতন হতে বাধ্য হচ্ছেন। মিরপুরের মশক নিধন কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা ড্রোনের নির্দেশিত স্থানগুলোতে দ্রুত লার্ভিসাইড স্প্রে করতে পারেন।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ডিএনসিসি মেয়র ঘোষণা করেছেন যে, সারা বছরই মশক নিধন কার্যক্রম চলবে তবে বর্ষার এই সময়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান কার্যক্রম সম্প্রসারণ করা হবে। এছাড়া জিআইএস (GIS) ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ডেঙ্গু হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে সেখানে বিশেষ মশক নিধন তেল ও কীটনাশক প্রয়োগ করা হবে।

নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিশেষ নির্দেশনা

রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ও ব্যক্তিগত ভবন নির্মাতাদের প্রতি কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্মাণাধীন প্রাঙ্গণে পানি জমলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। আজ যে সব স্থানে জরিমানা করা হয়েছে, সেখানে দেখা গেছে অবহেলার কারণেই মশার প্রজনন হচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে ওপর থেকে লার্ভা শনাক্ত করা সহজ হওয়ায় নির্মাণাধীন ভবনের লুকানো জায়গাগুলো এখন কর্তৃপক্ষের নজরে। মূলত ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান অভিযান এই খাতের অবহেলা দূর করতে সহায়ক হবে।

মশক নিধনে নতুন ওষুধের কার্যকারিতা

এবার অভিযানের পাশাপাশি নতুন আমদানিকৃত লার্ভিসাইডের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। চিরুনি অভিযানের দলগুলো লার্ভা পাওয়ার সাথে সাথেই ড্রেন ও ডোবাতে এই ওষুধ প্রয়োগ করছে। মেয়রের উপস্থিতিতে উত্তরা এলাকায় ওষুধের কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। ডিএনসিসি মনে করছে, ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান করার পর সঠিক ওষুধ প্রয়োগ করলে এ বছর ডেঙ্গুর হার সর্বনিম্ন রাখা সম্ভব হবে।

 

মশা নিধনে ড্রোনের মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আজ উত্তরা ও মিরপুরের অভিযানে যেভাবে ড্রোন দিয়ে মশার লার্ভা সন্ধান করা হয়েছে এবং জরিমানা করা হয়েছে, তাতে সাধারণ জনগণের মধ্যে একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছেছে। স্মার্ট সিটি গড়ার লক্ষ্যে প্রযুক্তির এমন সঠিক প্রয়োগ ডেঙ্গুমুক্ত ঢাকা গড়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর