৩রা মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ১৮ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

/

ট্রাম্পের মাথার ভেতরে আসলে কী চলছে

ট্রাম্পের মাথার ভেতরে আসলে কী চলছে

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও নিকোলা মাদুরো

ভেনেজুয়েলার কট্টর সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার খবর বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ও বিস্ময় ছড়াবে।

এই অভ্যুত্থান অবৈধ। এটি উসকানিহীন। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্যও এটি বিপজ্জনক। এটি আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন বিরোধী। এই অভিযান সার্বভৌম ভূখণ্ডের অধিকার উপেক্ষা করে, যা ভেনেজুয়েলার ভেতরে নৈরাজ্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ায়। এটি নীতির নামে বিশৃঙ্খলা। কিন্তু এটাই এখনকার দুনিয়া। ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুনিয়া।

ভেনেজুয়েলার ওপর সরাসরি হামলা যুক্তরাষ্ট্রের সীমাহীন ক্ষমতার এক ভয়ংকর প্রদর্শন। একই সপ্তাহে ট্রাম্প আরেকটি পশ্চিমবিরোধী ও অজনপ্রিয় শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন। সেটি ইরান। মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ কয়েক মাস ধরেই বাড়ছিল। এর মধ্যে কথিত মাদক পাচারকারীদের নৌকায় প্রাণঘাতী সামুদ্রিক হামলাও ছিল।

ট্রাম্প দাবি করছেন, ভেনেজুয়েলা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ মাদক প্রবেশ ঠেকাতেই তিনি এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, তথাকথিত ‘অপরাধী’ অভিবাসীদের ঢল থামানোই তাঁর লক্ষ্য।

২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসনের মতোই, এবারও অভিযোগ উঠেছে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল ও গ্যাস সম্পদের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নজর রয়েছে। এই সন্দেহ আরও জোরালো হয়েছে, কারণ যুক্তরাষ্ট্র বারবার অবৈধভাবে ভেনেজুয়েলার তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করেছে।

তবে ট্রাম্পের মূল উদ্দেশ্য সম্ভবত ব্যক্তিগত। মাদুরোর প্রতি তাঁর ব্যক্তিগত শত্রুতা রয়েছে। পাশাপাশি তিনি উনিশ শতকের মনরো নীতি নতুন করে জাগিয়ে তুলতে চান। অর্থাৎ পুরো পশ্চিম গোলার্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চান।

কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রোসহ আঞ্চলিক নেতারা এই অভ্যুত্থানে ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পেত্রোর সঙ্গে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিরোধও হয়েছে। অনেক নেতাই আশঙ্কা করছেন, তাঁরাও একদিন ওয়াশিংটনের নতুন আক্রমণাত্মক আধিপত্যের শিকার হতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক জাহাজ ‘ইউএসএস আইডব্লিউও জিমা’-তে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রুথ সোশ্যালে ছবিটি প্রকাশ করেছেন।

কিউবার বামপন্থী সরকারের উদ্বেগের কারণ আরও বেশি। তারা সস্তা জ্বালানি, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার জন্য ভেনেজুয়েলার সরকারের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বহুবারই বলেছেন, তিনি হাভানায় শাসন পরিবর্তন চান।

পানামাতেও উদ্বেগ তীব্র হচ্ছে। পানামা খালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্প আগেও সেখানে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। মাদুরোর আটক হওয়ার ঘটনা অনেকের কাছে ১৯৮৯ সালের স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্র পানামা আক্রমণ করে দেশটির তৎকালীন শাসক ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার করেছিল।

বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ববাদী ও অগণতান্ত্রিক শাসনগুলো এখন ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। ওয়াশিংটনের গণতান্ত্রিক মিত্ররাও তা–ই করবে। ইরান এই অভ্যুত্থানকে নিন্দা জানিয়েছে। তাদের ভয় পাওয়ার কারণ আছে। তবে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হয়তো তাঁর ভেনেজুয়েলার মিত্রের পতনে পুরোপুরি অসন্তুষ্ট নন।

পুতিনের ইউক্রেন আগ্রাসন থেকে ট্রাম্পের উসকানিহীন সহিংসতায় ঝাঁপিয়ে পড়া খুব একটা আলাদা নয়। দুজনই অবৈধভাবে প্রতিবেশী দেশে হামলা চালিয়েছেন। দুজনই সেই দেশের নেতৃত্ব অপসারণ করতে চেয়েছেন। চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের জন্য এটি একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত।

গত সপ্তাহেই তাঁর বাহিনী তাইওয়ানের তথাকথিত ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের’ বিরুদ্ধে সামরিক মহড়া চালিয়েছে। ট্রাম্প এমন একটি নজির স্থাপন করলেন, যা সি একদিন আনন্দের সঙ্গেই অনুসরণ করতে পারেন।

ট্রাম্পের এই অভ্যুত্থান ব্রিটেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও পশ্চিমা গণতন্ত্রগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তাদের উচিত, এবং অবশ্যই উচিত, এটির স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে নিন্দা করা।

এই ঘটনা সেই আন্তর্জাতিক নিয়ম ও নীতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে, যেগুলো তারা গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র আবারও জাতিসংঘকে উপেক্ষা করেছে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যকার বিরোধ মেটানোর প্রচলিত পথও এড়িয়ে গেছে। ভেনেজুয়েলার পরে কী হবে, সে বিষয়ে তাদের খুব কমই ভাবনা আছে বলে মনে হয়।

ট্রাম্পের মাথার ভেতরে আসলে কী চলছে। একটি নিরীহ ব্যাখ্যা হলো, যুদ্ধ ও শান্তির বিষয়ে তিনি নিজেই জানেন না তিনি কী করছেন। তার কোনো কৌশল নেই। কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। তিনি মুহূর্তের অনুভূতির ওপর ভর করে চলতে চলতেই নীতি বানান।

কারাকাসের সরকার কার্যত শিরচ্ছেদ হয়েছে। তবে শাসকগোষ্ঠীর আরও অনেক শীর্ষ ব্যক্তি এখনো সক্রিয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাঁরা প্রতিরোধের ডাক দিচ্ছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণের কথাও বলছেন। বেসামরিক হতাহতের অপ্রমাণিত খবরও রয়েছে। যদি ক্ষমতার শূন্যতা তৈরি হয়, তাহলে জনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারে। গৃহযুদ্ধ শুরু হতে পারে। অথবা সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান এখানেই শেষ হয়েছে কি না, নাকি আরও বাড়বে, সেটিও স্পষ্ট নয়।

নির্বাসিত বিরোধী নেতারা, যেমন ২০২৫ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো দ্রুত দেশে ফিরবেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণ গণতন্ত্র ফিরে আসবে, এমন ধারণা শিশুসুলভ। সামনের কয়েক দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সবকিছুর দায় ট্রাম্পের ওপরই বর্তায়। ট্রাম্প নিজেকে সব সময় ‘বিশ্ব শান্তির দূত’ বলে তুলে ধরেছেন, সেটি ছিল বিভ্রান্তিকর। এখন সেটির অবসান হওয়া উচিত। এটাই সময়, কিয়ার স্টারমারসহ ইউরোপের নেতারা প্রকাশ্যে তাঁকে তাঁর প্রকৃত রূপে চিনে নেবেন। তিনি একজন বৈশ্বিক যুদ্ধবাজ। সবার জন্যই একধরনের হুমকি।

রাশিয়া-ইউক্রেন বা ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মতো সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তিনি যখন বারবার হঠাৎ ঢুকে পড়েন, সময়সীমা বেঁধে দেন, হুমকি দেন, পক্ষ বেছে নেন এবং মানুষের দুর্দশাকে পণ্যে পরিণত করেন, তখন ন্যায্য ও স্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা আরও পিছিয়ে যায়। তাই শান্তি অধরা থাকাই স্বাভাবিক। অদ্ভুতভাবে নিজেকে নিরপেক্ষ শান্তিকামী হিসেবে তুলে ধরলেও, ট্রাম্প একই সঙ্গে সারা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালান। জরিপ বলছে, গত বছর মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় যুক্তরাষ্ট্র রেকর্ডসংখ্যক বিমান হামলা চালিয়েছে।

এক বছর আগে ক্ষমতায় ফিরেই তথাকথিত শান্তিপ্রিয় ট্রাম্প একের পর এক দেশে বোমা মেরেছেন। তিনি ইয়েমেনে বোমা ফেলেছেন। যুদ্ধের নিয়ম শিথিল করে অসতর্ক হামলায় বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। তিনি নাইজেরিয়ায় বোমা ফেলেছেন, যার ফল হয়েছে উল্টো। তিনি সোমালিয়া, ইরাক ও সিরিয়ায় বোমা মেরেছেন। তিনি ইরানেও বোমা হামলা চালিয়েছেন। সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় পারমাণবিক স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি তিনি মিথ্যা ও অতিরঞ্জিতভাবে তুলে ধরেছেন। এমনকি ন্যাটোভুক্ত মিত্র ডেনমার্কের সার্বভৌম ভূখণ্ড গ্রিনল্যান্ডে বোমা মারার সম্ভাবনাও তিনি নাকচ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

ট্রাম্পের মাথার ভেতরে আসলে কী চলছে। একটি নিরীহ ব্যাখ্যা হলো, যুদ্ধ ও শান্তির বিষয়ে তিনি নিজেই জানেন না তিনি কী করছেন। তার কোনো কৌশল নেই। কোনো স্পষ্ট ধারণা নেই। তিনি মুহূর্তের অনুভূতির ওপর ভর করে চলতে চলতেই নীতি বানান।

আরেকটি ব্যাখ্যা আরও অশুভ। সেটি বলছে, তিনি ঠিকই জানেন তিনি কী করছেন। সামনে আরও ভয়ংকর কিছু আসছে। আগের অনেক দ্বিতীয় মেয়াদের প্রেসিডেন্টের মতো, ট্রাম্প দেখছেন দেশের ভেতরে পথ ফুরিয়ে গেলে বিশ্বমঞ্চে ক্ষমতা ও অহংকার দেখানোর সুযোগ বেশি। তিনি রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের উত্তরাধিকার গড়ছেন।
ট্রাম্পের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনকভাবে অনিয়ন্ত্রিত আচরণ দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। ভেনেজুয়েলায় তথাকথিত ‘সাফল্য’ তাঁকে আরও বড় এবং আরও উন্মত্ত আগ্রাসনে উৎসাহিত করতে পারে।

ট্রাম্প নিজেকে মার্ক অ্যান্টনির মতো শক্তিশালী ও বীর ভাবেন। তিনি দম্ভের সঙ্গে হাঁটেন, নিজেকে জাহির করেন, যুদ্ধের ডাক দেন। কিন্তু মার্ক অ্যান্টনির মতো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রবোধ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা কৌশল তাঁর নেই।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর