৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় সিদ্ধান্ত: ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে ডলারের দামে নতুন সমন্বয়, কী প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে?

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বড় সিদ্ধান্ত: ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে ডলারের দামে নতুন সমন্বয়, কী প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে?

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
ডলারের দামে নতুন সমন্বয়
ডলারের দামে নতুন সমন্বয়
ডলারের দামে নতুন সমন্বয়

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং ডলারের বিনিময় হারকে বাজারমুখী করতে এক বড় পদক্ষেপ নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আজ থেকে কার্যকর করা হয়েছে ‘ক্রলিং পেগ’ পদ্ধতি। এই নতুন ব্যবস্থার আওতায় ডলারের দামে নতুন সমন্বয় করা হয়েছে, যেখানে ডলারের মধ্যবর্তী দর  নির্ধারণ করা হয়েছে ১১৭ টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সাহসী সিদ্ধান্তের ফলে ডলারের বিনিময় হার এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তবসম্মত পর্যায়ে চলে এসেছে।

ক্রলিং পেগ পদ্ধতি ও ডলারের দামে নতুন সমন্বয়

দীর্ঘদিন ধরে ডলারের বিনিময় হার নিয়ে বাজারে যে অস্থিরতা চলছিল, তা নিরসনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের  পরামর্শ অনুযায়ী ক্রলিং পেগ পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এই পদ্ধতিতে ডলারের দামে নতুন সমন্বয় করার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সীমা বা ‘কোরিডোর’ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ডলারের দাম হুট করে অনেক বেড়ে বা কমে যাবে না, বরং একটি নিয়ন্ত্রিত সীমার মধ্যে ওঠানামা করবে।

কেন এই সময় ডলারের দামে নতুন সমন্বয় প্রয়োজন ছিল?

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবং খোলা বাজারের সঙ্গে ব্যাংকিং চ্যানেলের ডলারের দামের ব্যবধান কমিয়ে আনা ছিল প্রধান লক্ষ্য। আগের নির্ধারিত ১১০ টাকার দরের কারণে প্রবাসীরা বৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠাতে নিরুৎসাহিত হচ্ছিলেন। আজ ডলারের দামে নতুন সমন্বয় করার ফলে ব্যাংকিং চ্যানেল এবং কার্ব মার্কেটের মধ্যে পার্থক্য অনেকটা কমে আসবে, যা হুন্ডি ব্যবসা রোধে সহায়ক হবে।

আমদানিকারকদের ওপর প্রভাব

এই সিদ্ধান্তের ফলে আমদানিকারকদের জন্য এলসি  খোলার খরচ কিছুটা বাড়বে। আগে যেখানে ১১০-১১২ টাকায় ডলার পাওয়া যেত, এখন সেখানে ১১৭ টাকা বা তার সামান্য বেশি খরচ করতে হবে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, ডলারের দামে নতুন সমন্বয় করার ফলে বাজারে ডলারের সরবরাহ বাড়বে। এতে ডলারের তীব্র সংকটের কারণে যে এলসি খোলা বন্ধ ছিল, সেই সমস্যার সমাধান হবে।

প্রবাসীদের জন্য খুশির খবর ও রেমিট্যান্স প্রবাহ

প্রবাসীদের জন্য এই খবরটি অত্যন্ত ইতিবাচক। আগে অফিশিয়াল রেট কম থাকায় অনেকেই অবৈধ পথে টাকা পাঠাতেন। এখন ডলারের দামে নতুন সমন্বয় করার ফলে প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলেই বেশি টাকা পাবেন। এর সঙ্গে সরকারের দেওয়া ২.৫% প্রণোদনা যোগ হলে প্রবাসীদের জন্য বিনিময় হার হবে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। আশা করা হচ্ছে, আগামী মাসগুলোতে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা যাবে।

আরো পড়ুনঃ বিআইডিএ-র ডিজিটাল বিপ্লব

রপ্তানি আয়ে গতি আসবে

রপ্তানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরে ডলারের রেট বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। ডলারের দামে নতুন সমন্বয় করার ফলে রপ্তানিকারকরা তাদের আয়ের বিপরীতে আগের চেয়ে বেশি টাকা পাবেন। এটি দেশের রপ্তানি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করবে এবং বিদেশের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান শক্তিশালী করবে।

মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ

ডলারের দাম বাড়লে সাধারণত আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়ে যায়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে মূল্যস্ফীতির উদ্বেগ তৈরি করে। জ্বালানি তেল, ভোজ্য তেল এবং কাঁচামাল আমদানির খরচ বাড়লে বাজারে এর প্রভাব পড়তে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, ডলারের দামে নতুন সমন্বয় বাজারকে স্থিতিশীল করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ করে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যবর্তী দর নির্ধারণের কৌশল

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ১১৭ টাকাকে ডলারের মধ্যবর্তী দর হিসেবে ধরে এখন থেকে লেনদেন হবে। ব্যাংকগুলো এই দরের আশেপাশে সামান্য ব্যবধানে ডলার কেনাবেচা করতে পারবে। ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে ডলারের দামে নতুন সমন্বয় কেবল একটি শুরু; ভবিষ্যতে বাজারের চাহিদা ও জোগানের ওপর ভিত্তি করে এই দর সময়ে সময়ে পর্যালোচনা করা হবে।

আইএমএফ-এর শর্ত ও রিজার্ভ পরিস্থিতি

আইএমএফ-এর ঋণের কিস্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার একটি শর্ত ছিল। আজ ডলারের দামে নতুন সমন্বয় করার ফলে সেই শর্তের পথে বড় অগ্রগতি হলো। এতে করে বৈদেশিক ঋণের প্রবাহ সহজতর হবে এবং গ্রস রিজার্ভের পতন ঠেকানো সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট ও ডলার

ডলারের বাজারে অস্থিরতার কারণে অনেক ব্যাংকে ডলারের তীব্র সংকট ছিল। অনেক ব্যাংক নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে ডলার কিনত। এখন ডলারের দামে নতুন সমন্বয় হওয়ায় ব্যাংকগুলো স্বচ্ছতার সঙ্গে লেনদেন করতে পারবে। এতে ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে।

হুন্ডি ব্যবসার বিরুদ্ধে কড়া বার্তা

বাজারে ডলারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে যারা হুন্ডি ব্যবসা করছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের ফলে তারা বড় ধাক্কা খাবে। কারণ অফিশিয়াল রেট এখন বাজারের দরের কাছাকাছি। আজ ডলারের দামে নতুন সমন্বয় প্রবাসীদের বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করবে এবং অবৈধ অর্থ পাচার রোধে বড় ভূমিকা রাখবে।

 

সব মিলিয়ে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেওয়া এই পদক্ষেপটি অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। যদিও স্বল্পমেয়াদে আমদানিতে কিছুটা খরচ বাড়তে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ডলারের দামে নতুন সমন্বয় ছিল অপরিহার্য। যদি রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়ে, তবে দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতি দ্রুত উন্নতি করবে এবং ডলারের বাজারে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফিরবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর