
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বাংলাদেশ-কুয়েত মৈত্রী হলের ফিল্টারের পানি পান করে তিন শতাধিক ছাত্রীর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আজ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। হলের পানির ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার না করা, চরম অবহেলা এবং মানহীন ফিল্টার ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট দায়ে হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিন ম্যানেজারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই সাথে হলের সার্বিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। চাঞ্চল্যকর এই ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে হল প্রশাসনের জবাবদিহিতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, ছাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো ধরনের আপস করা হবে না। প্রাথমিক এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন জমা হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল ছাত্রীদের অসুস্থতার মিছিল
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত কয়েকদিন আগে থেকে। হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিনের পানি পানের পর বেশ কয়েকজন ছাত্রী পেট ব্যথা, বমি এবং ডায়রিয়ার উপসর্গ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টার ও পপুলার হাসপাতালে ভর্তি হতে শুরু করেন। গত দুই দিনে এই সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে ৩০০ ছাড়িয়ে যায়। একসঙ্গে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর অসুস্থ হয়ে পড়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্যাম্পাসে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। হল সংসদের সাবেক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে পানির ফিল্টার পরিবর্তন না করা এবং ট্যাংকের নোংরা পানি সরবরাহের কারণেই এই বিপর্যয় ঘটেছে। মূলত হল প্রশাসনের দীর্ঘদিনের তদারকির অভাবই এই ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা এর মূল কারণ।
তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদন ও অবহেলার প্রমাণ
শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জরুরি ভিত্তিতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা আজ সকালে হলের পানির মূল ট্যাংক এবং ডাইনিং-ক্যান্টিনের ওয়াটার ফিল্টারগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, হলের পানির ট্যাংকে মরা কবুতরের অবশিষ্টাংশ, শ্যাওলা এবং তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত কাদা জমে ছিল। এছাড়া ডাইনিং ও ক্যান্টিনে ব্যবহৃত ফিল্টারগুলো ছিল অত্যন্ত নিম্নমানের এবং সেগুলোর মেয়াদ বহু আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, এই চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি জানার পরও ডাইনিং ও ক্যান্টিন কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ নীরব ছিল। এই প্রাথমিক রিপোর্টের ভিত্তিতেই ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা এর প্রথম প্রশাসনিক অ্যাকশন নেওয়া হয়।
ডাইনিং ও ক্যান্টিন ম্যানেজারের সাময়িক বরখাস্ত
পানির ট্যাংক পরিষ্কারে অবহেলা এবং ছাত্রীদের জীবনের ঝুঁকি তৈরির প্রত্যক্ষ দায়ে আজ দুপুরে এক অফিস আদেশের মাধ্যমে হলের ডাইনিং ও ক্যান্টিন ম্যানেজারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। হলের প্রাধ্যক্ষ (প্রভোস্ট) অধ্যাপক ড. সুলতানা সাহানা এক বিবৃতিতে জানান, “শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা আমাদের কাছে সবার আগে। তদন্ত কমিটির প্রাথমিক রিপোর্টে ডাইনিং ও ক্যান্টিন ব্যবস্থাপকদের অবহেলার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। তাই তাদের তাৎক্ষণিকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।” একই সাথে হলের পুরো ডাইনিং ও ক্যান্টিন পরিচালনার জন্য নতুন একটি অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে শিক্ষার্থীরা বলছেন, কেবল ম্যানেজারকে বলির পাঁঠা বানিয়ে মূল দায় এড়ানো যাবে না, কারণ পুরো ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা এর পেছনে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বড় ঘাটতি ছিল।
আরো পড়ুনঃ ডিজিটাল লেনদেনে নতুন ইতিহাস
উপাচার্যের কড়া হুঁশিয়ারি ও ক্যাম্পাসজুড়ে ক্ষোভ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) এই ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি আজ এক জরুরি সভায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, হলের ছাত্রীদের খাবারের মান এবং পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যারা ব্যর্থ হবে, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। উপাচার্য বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো হলে এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” এদিকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে এবং হলের অভ্যন্তরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। ছাত্রনেতাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ থাকলেও ছাত্রীদের ন্যূনতম মৌলিক অধিকার ‘বিশুদ্ধ পানি’ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে এই ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আবাসন সংকটের এক করুণ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে।
অসুস্থ ছাত্রীদের বর্তমান শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা
হল প্রশাসন ও ঢাবি মেডিকেল সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, অসুস্থ ৩০০ ছাত্রীর মধ্যে বেশিরভাগকেই প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হলে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও প্রায় ২০-২৫ জন ছাত্রী শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, এটি মূলত ‘ওয়াটার বোর্ন ইনফেকশন’ বা পানি বাহিত তীব্র ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণের কারণে ঘটেছে। হলের পানি পুরোপুরি পরীক্ষা না করা পর্যন্ত ছাত্রীদের বাইরের কেনা মিনারেল ওয়াটার পান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। উপাচার্য নিজে অসুস্থ ছাত্রীদের খোঁজখবর নিতে মেডিকেল সেন্টারে যান এবং তাদের বিনামূল্যে ঔষধ ও উন্নত পথ্য সরবরাহের নির্দেশ দেন। এই চিকিৎসার পুরো ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বহন করছে বলে জানা গেছে।
নিরাপদ পানির দাবিতে ছাত্রীদের পাঁচ দফা আন্দোলন
ম্যানেজার বরখাস্তের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও ছাত্রীরা তাদের আন্দোলন পুরোপুরি প্রত্যাহার করেননি। তারা হল প্রাধ্যক্ষের কাছে পাঁচ দফা দাবি পেশ করেছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—হলের প্রতিটি ব্লকে বিশ্বমানের আধুনিক ওয়াটার পিউরিফায়ার স্থাপন করা, প্রতি তিন মাস পর পর ওয়াটার টেস্ট রিপোর্ট নোটিশ বোর্ডে টাঙানো, ক্যান্টিনের খাবারের মান উন্নত করা, হল প্রশাসনের নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা এবং অসুস্থ ছাত্রীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া। ছাত্রীদের একাংশের মতে, যদি এই দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হয়, তবে এই ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা এর মতো পরিস্থিতি অন্যান্য হলেও ঘটতে পারে।
অন্য হলগুলোতেও পানির ট্যাংক পরিদর্শনের নির্দেশ
কুয়েত মৈত্রী হলের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও ভয়াবহ ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় প্রশাসন। আজ বিকেলে এস্টেট অফিস থেকে একটি জরুরি সার্কুলার জারি করা হয়েছে। দেশের বর্তমান ২০২৬ সালের এই মে মাসের গরমের সময়ে ডায়রিয়া ও পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে, তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবকটি ছাত্র ও ছাত্রী হলের পানির ট্যাংক, রিজার্ভার এবং ফিল্টারগুলো আগামী তিন দিনের মধ্যে পরিষ্কার ও সংস্কার করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন স্পষ্ট করেছে যে, কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনার পুনরাবৃত্তি অন্য কোনো হলে ঘটলে সংশ্লিষ্ট হলের পুরো ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট টিমকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত ও স্থায়ী সমাধানের পথ
বন্যপ্রাণী ও পরিবেশবিদ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোর পানির পাম্প এবং পাইপলাইনগুলো বহু পুরনো। অনেক জায়গায় সুয়ারেজ লাইনের সাথে পানির লাইনের সংযোগ লিক হয়ে পানি দূষিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই কেবল ফিল্টার পরিবর্তন বা ম্যানেজার বরখাস্ত করে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল বিভাগের উচিত পুরো ক্যাম্পাসের পানির পাইপলাইন অডিট করা। আজ যদি সময়মতো ব্যবস্থা না নেওয়া হতো, তবে এই ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা আরও বড় কোনো মহামারির রূপ নিতে পারত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের একটি ছাত্রী হলে বিশুদ্ধ পানির অভাবে ৩০০ শিক্ষার্থী অসুস্থ হওয়া অত্যন্ত লজ্জাজনক ও দুঃখজনক। ডাইনিং ও ক্যান্টিন ম্যানেজারকে সাময়িক বরখাস্ত করা এই গুরুতোর সমস্যার কেবল একটি প্রাথমিক সমাধান মাত্র। এই অপ্রীতিকর ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সামান্য অবহেলাও কতটা বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আমরা আশা করি, চলমান পূর্ণাঙ্গ তদন্তের মাধ্যমে এই ঘটনার পেছনের আসল সত্য ও উদাসীনতা উদঘাটিত হবে এবং হল প্রশাসন ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে। একই সাথে, ভবিষ্যতে যেন এমন কোনো ঢাবির কুয়েত মৈত্রী হলের ঘটনা আর কখনোই না ঘটে, সেজন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য নিরাপদ আবাসন ও বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করা প্রশাসনের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত।







