৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা

 

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা

আমাদের সমাজে প্রতিনিয়ত ঘটে যাওয়া নানা অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। একটি সভ্য ও প্রগতিশীল সমাজের প্রধান শর্ত হলো সেখানে নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকবে। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে ঘরে-বাইরে, কর্মক্ষেত্রে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই সামাজিক ব্যাধি কেবল ভুক্তভোগী ব্যক্তি বা পরিবারকে ধ্বংস করছে না, বরং পুরো রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কেন ঘটছে, এর ভয়াবহতা কেমন এবং কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব, তা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করব।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কী এবং এর ধরন

সাধারণভাবে বলতে গেলে, নারী এবং শিশুদের ওপর শারীরিক, মানসিক, সামাজিক বা অর্থনৈতিকভাবে কোনো ধরনের অত্যাচার, শোষণ বা বৈষম্যমূলক আচরণ করা হলে তাকে নির্যাতন বলা হয়। আমাদের সমাজে বিভিন্ন রূপে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পায়। নিচে এর প্রধান কিছু ধরন আলোচনা করা হলো:

শারীরিক নির্যাতন: যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে মারধর করা, গৃহপরিচারিকা বা শিশুদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো এই তালিকার শীর্ষে রয়েছে।

যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণ: বর্তমান সময়ে সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যৌন সহিংসতা। শিশু থেকে শুরু করে যেকোনো বয়সের নারী এই নির্মমতার শিকার হচ্ছে।

মানসিক ও সাইবার নির্যাতন:  তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের হেনস্তা করা, আপত্তিকর ছবি বা তথ্য ছড়িয়ে ব্ল্যাকমেইল করার মতো নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে।

বাল্যবিয়ে ও পাচার: জোরপূর্বক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে দেওয়া এবং অর্থনৈতিক লোভে শিশু বা নারীদের বিদেশে পাচার করাও এক ধরনের চরম নির্যাতন।

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ার প্রধান কারণসমূহ

যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে হলে তার মূল কারণ জানা জরুরি। সমাজে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা হঠাৎ করেই বেড়ে যায়নি, এর পেছনে বেশ কিছু গভীর সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক কারণ রয়েছে।

বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও আইনের দীর্ঘসূত্রতা

অনেক সময় দেখা যায়, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটার পর অপরাধীরা প্রভাবশালী হওয়ায় পার পেয়ে যায়। আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব এবং মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে অপরাধীরা নতুন করে অপরাধ করতে ভয় পায় না। বিচারহীনতার এই পরিবেশ অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।

 নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়

বর্তমান সমাজে মানুষের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার চরম অভাব দেখা যাচ্ছে। পারিবারিক শিক্ষার অভাব, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং অপসংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাবের কারণে তরুণ ও যুবসমাজের একটি বড় অংশ অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে, যার ফলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

 সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কুসংস্কার

আমাদের সমাজ এখনো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে নারীকে অবলা বা পুরুষের অধীনস্থ ভাবা হয়। আবার শিশুদের কোনো নিজস্ব মতামত বা অধিকার নেই বলে মনে করা হয়। এই ধরনের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নির্যাতনের পথ প্রশস্ত করে।

সচেতনতার অভাব ও তথ্য গোপন করা

অনেক সময় লোকলজ্জা বা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা লুকিয়ে রাখে। আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার কারণে অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং পরবর্তীতে আরও বড় অপরাধ করার সুযোগ পায়।

বর্তমান প্রেক্ষাপট ও এর ভয়াবহ সামাজিক প্রভাব

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও নির্মম নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ঘরে নিজের আপনজনদের হাতেও নারী ও শিশুরা নিরাপদ থাকছে না। এই পরিস্থিতির প্রভাব সমাজের ওপর অত্যন্ত মারাত্মক:

“একটি শিশু যখন ছোটবেলায় কোনো ধরনের নির্যাতনের মধ্য দিয়ে বড় হয়, তখন তার মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ভবিষ্যতে সে নিজেও একজন অপরাধী বা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিতে পরিণত হতে পারে।”

একইভাবে, নির্যাতনের শিকার নারীরা সমাজে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন। অনেকে লোকলজ্জা ও মানসিক ট্রমা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। এটি একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

আরো পড়ুন:রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিস্থিতি

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকরী পদক্ষেপ

এই ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারকে একযোগে কাজ করতে হবে। নিচে কিছু অত্যন্ত কার্যকরী পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করা হলো:

দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক না কেন, তাকে রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে আশ্রয় দেওয়া বন্ধ করতে হবে। অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেখে যেন অন্য কেউ এই ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়।

পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার বিস্তার

প্রতিটি পরিবারে সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দিতে হবে। বিশেষ করে ছেলেদের ছোটবেলা থেকেই নারীদের সম্মান করার এবং শিশুদের প্রতি সদয় হওয়ার শিক্ষা দেওয়া উচিত। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে।

সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করা

যেহেতু বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা অনেক বেড়েছে, তাই সাইবার ক্রাইম ইউনিটকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো নারী বা শিশু হেনস্তার শিকার হলে যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তার সহজ উপায় তৈরি করতে হবে।

সরকারি ও বেসরকারি হেল্পলাইনের প্রচার

বাংলাদেশ সরকারের জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ হেল্পলাইন নম্বর ১০৯ এর কার্যকারিতা গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে হবে। যাতে যেকোনো নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটার সাথে সাথে বা ঘটার আশঙ্কা থাকলে ভুক্তভোগীরা তাৎক্ষণিক আইনি ও মানসিক সহায়তা পেতে পারে।

সমাজ গঠনে আমাদের ব্যক্তিগত দায়িত্ব

কেবল সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে বা আইনের ভরসায় বসে থাকলে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। আমাদের নাগরিক হিসেবে কিছু দায়িত্ব রয়েছে:

আপনার আশেপাশে কোনো নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে চুপ না থেকে প্রতিবাদ করুন।

ভুক্তভোগী পরিবারকে সামাজিকভাবে বয়কট না করে তাদের পাশে দাঁড়ান এবং আইনি লড়াইয়ে সাহস দিন।

কন্যা সন্তানদের বোঝা না ভেবে তাদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত এবং স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলুন।

অর্থনৈতিক পরনির্ভরশীলতা এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য

নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়া নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাড়ার অন্যতম একটি বড় কারণ। অনেক নারী পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পরও শুধু আর্থিক নিরাপত্তার অভাবে মুখ বুজে সব সহ্য করতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, কর্মক্ষেত্রে বা যাতায়াতের পথে নারীদের অবমূল্যায়ন এবং বিভিন্ন ধরনের হয়রানি তাদের মানসিক ও সামাজিকভাবে পঙ্গু করে ফেলে, যা পরোক্ষভাবে নির্যাতনের পথকে আরও সুগম করে।

মাদকাসক্তি ও জুয়ার সামাজিক অভিশাপ

বর্তমান সমাজে তরুণ ও যুবসমাজের মধ্যে মাদকাসক্তি এবং জুয়ার প্রবণতা মারাত্মকভাবে বেড়ে গেছে। পারিবারিক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ পারিবারিক নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোর পেছনে কোনো না কোনোভাবে মাদকাসক্তির সম্পর্ক রয়েছে। মাদকের টাকার জন্য স্ত্রীকে মারধর করা বা শিশুদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করা এখন নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের ভূমিকা

তৃণমূল পর্যায়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা প্রতিরোধে স্থানীয় সরকার এবং কমিউনিটি পুলিশিং ব্যবস্থা দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রতিটি ইউনিয়ন বা ওয়ার্ডে যদি নারী ও শিশু সুরক্ষা কমিটি সক্রিয় থাকে, তবে অনেক অপরাধ ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করা সম্ভব। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদি রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন, তবে এই ধরনের অপরাধ অনেকাংশে কমে আসবে।

গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম

টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং অনলাইন পোর্টালগুলোর মাধ্যমে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা কেবল প্রচার করাই যথেষ্ট নয়, বরং এর বিরুদ্ধে ব্যাপক সামাজিক জাগরণ তৈরি করতে হবে। নির্যাতনের নেতিবাচক প্রভাব এবং এর আইনি শাস্তি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্যচিত্র, নাটক বা বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তোলা সম্ভব। অপরাধীকে সামাজিকভাবে বয়কট করার মানসিকতা তৈরিতে গণমাধ্যম সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।

 

নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা একটি দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের ধারাকে কলঙ্কিত করে। আমরা যদি একটি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে চাই, তবে প্রতিটি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা আগে নিশ্চিত করতে হবে। এটি কোনো একক ব্যক্তির লড়াই নয়, এটি আমাদের সবার সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব। আসুন, আজ থেকেই সচেতন হই এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা মুক্ত একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তুলি।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর