রেজা শিকদার (কবি ও সম্পাদক)
হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদে বর্ষা মৌসুম এলেই জনজীবনে নেমে আসে দুর্ভোগ। অনেক এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নিচতলা কিংবা বিদ্যালয়ের মাঠ পানিতে তলিয়ে যায়, ফলে শিক্ষার্থীদের নৌকা ছাড়া বিদ্যালয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। কোথাও কোথাও বাড়ি থেকে বের হতেও নৌকা বা সাঁতারের ওপর নির্ভর করতে হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি হাওরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ও আঞ্চলিক উন্নয়নে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্ষার সময় বহু বিদ্যালয়ে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হয়। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন নৌকায় করে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করে, যা সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। প্রবল বৃষ্টি ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে নিরুৎসাহিত হন। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যায় এবং পাঠ্যক্রমে পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
শুধু শিক্ষাক্ষেত্র নয়, স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। হাওরাঞ্চলের অনেক গ্রামে এখনো টেকসই সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। কাঁচা, কাদাময় কিংবা ভাঙাচোরা রাস্তার কারণে জরুরি মুহূর্তে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষাকালে নৌকাই অনেক সময় একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। এতে দুর্ঘটনা ও চিকিৎসা বিলম্বের ঝুঁকি বাড়ে।
একাধিক এলাকাবাসী বলেন, “শিক্ষার উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু যে অঞ্চলের মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না, সেখানে শুধু বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। রাস্তা, সেতু, ঘাট ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য—দুটোই বাধাগ্রস্ত হবে।”
শিক্ষাবিদ ও উন্নয়ন বিশ্লেষকদের মতে, হাওরাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে বিশেষ পরিকল্পনার মাধ্যমে অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। উঁচু ভিত্তির বিদ্যালয় ভবন, সারাবছর চলাচলযোগ্য সড়ক, সেতু ও নৌ-যোগাযোগের নিরাপদ ব্যবস্থা গড়ে তুললে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যাতায়াত সহজ হবে এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও আরও কার্যকরভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
স্থানীয়দের দাবি, হাওরাঞ্চলের উন্নয়নকে শুধু মৌসুমি দুর্যোগ মোকাবিলার দৃষ্টিতে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হোক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ—এই তিন খাতকে সমন্বিতভাবে উন্নত না করলে হাওরাঞ্চলের মানুষের জীবনমানের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়।







