৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

ব্যাংকিং খাতের সংকট

ব্যাংকিং খাতের সংকট

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
ব্যাংকিং খাতের সংকট

 

ব্যাংকিং খাতের সংকট
ব্যাংকিং খাতের সংকট

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগের বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতের সংকট। একটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো তার ব্যাংকিং ব্যবস্থা। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে নানাবিধ অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক কারণে এই খাতটি গভীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তারল্য সংকট থেকে শুরু করে খেলাপি ঋণের পাহাড়—সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থার জায়গায় একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতের বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা মূলত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংকগুলোর সমন্বয়ে গঠিত। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, বেশ কিছু ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা কমে গেছে এবং প্রভিশন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ব্যাংকিং খাতের সংকট এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে অনেক ব্যাংক এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে।

সংকটের মূল কারণসমূহ

ব্যাংকিং খাতের এই অস্থিরতার পেছনে কোনো একটি একক কারণ নেই, বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল। নিচে প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো

লাগামহীন খেলাপি ঋণ

ব্যাংকিং খাতের প্রধান ক্ষত হলো খেলাপি ঋণ। বড় বড় শিল্প গ্রুপ যখন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা সময়মতো ফেরত দেয় না, তখন ব্যাংকের নগদ অর্থের প্রবাহ কমে যায়। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে তা পুনঃতফসিল করার সংস্কৃতি এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে।

তারল্য সংকট

গ্রাহকদের আস্থাহীনতা এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ব্যাংকগুলোতে আমানত প্রবাহ কমে গেছে। অন্যদিকে, ডলার সংকটের কারণে আমদানিকারকদের এলসি সেটলমেন্ট করতে গিয়ে ব্যাংকগুলোকে প্রচুর টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে বাজারে নগদ টাকার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

সুশাসনের অভাব

ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে অনেক সময় দেখা যায় একই পরিবারের একাধিক সদস্যের আধিপত্য। এর ফলে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় থাকে না। পেশাদারত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা রাজনৈতিক পরিচয় যখন বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখনই ব্যাংকিং খাতের সংকট প্রকট হয়।

ডলার সংকট ও বহিঃবিভাগীয় চাপ

বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়ায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান অনেক কমে গেছে। এর ফলে ব্যাংকগুলোকে বাড়তি দামে ডলার কিনতে হচ্ছে, যা তাদের লাভজনকতা কমিয়ে দিচ্ছে।

আরো পড়ুন :স্বর্ণের দাম আবার বেড়েছে

অর্থনীতির ওপর সংকটের প্রভাব

ব্যাংকিং খাতের এই অস্থিতিশীলতা কেবল ব্যাংকগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরো অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে

বিনিয়োগ হ্রাস: ব্যাংকগুলোর কাছে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। এর ফলে শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ কমছে।

মূল্যস্ফীতি: যখন ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে চলে, তখন বাজারে মুদ্রার সরবরাহ বেড়ে যায়, যা পরোক্ষভাবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ: আমানতকারীদের মনে ভয় কাজ করছে যে তাদের সঞ্চিত অর্থ সঠিক সময়ে ফেরত পাবেন কি না। এই আস্থাহীনতা অর্থনীতির জন্য চরম বিপদজনক।

সংকট উত্তরণে করণীয় পদক্ষেপ

এই সংকট থেকে উত্তরণ রাতারাতি সম্ভব নয়, তবে সঠিক নীতিমালা ও কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোরতা
ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর নিয়ম অনুসরণ করা প্রয়োজন যেন কেউ আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন
বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করতে দিতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে ব্যাংকিং নীতিমালা প্রণয়ন ও তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। কোনো ব্যাংক নিয়ম ভাঙলে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।

ব্যাংক একীভূতকরণ (মার্জার)
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী ব্যাংকের সাথে একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে এটি হতে হবে অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় এবং আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে।

 ডিজিটাল ব্যাংকিং ও স্বচ্ছতা
আর্থিক লেনদেনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে দুর্নীতি কমানো সম্ভব। প্রতিটি ঋণের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন যা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে।

ঋণ অবলোপন ও প্রকৃত হিসাবের আড়াল

ব্যাংকগুলো তাদের ব্যালেন্স শিট পরিষ্কার দেখাতে অনেক সময় মন্দ ঋণ বা খেলাপি ঋণ অবলোপন  করে। এতে কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কম মনে হলেও বাস্তবে তা ব্যাংকের মূলধনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই লুকোচুরির কারণে সংকটের প্রকৃত গভীরতা সাধারণ মানুষের আড়ালে থেকে যায়।

 ব্যাংক খাতের ওপর ঋণের অতি-নির্ভরতা

সরকার যখন তার বাজেট ঘাটতি মেটাতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে বড় অংকের ঋণ নেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ কমে যায়। একে ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ বলা হয়। এর ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয় এবং ব্যাংকিং খাতে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়।

অনিয়ম ও অর্থ পাচার

ব্যাংকিং খাতের সংকটের অন্যতম একটি অন্ধকার দিক হলো ঋণের নামে টাকা নিয়ে তা বিদেশে পাচার করে দেওয়া। ওভার ইনভয়েসিং বা আমদানির নামে অতিরিক্ত মূল্য দেখিয়ে ব্যাংকের ডলার বিদেশে সরিয়ে নেওয়ার ফলে দেশের রিজার্ভ ও ব্যাংক উভয়ই সংকটে পড়ে।

গ্রাহক সেবার মান হ্রাস

আর্থিক অনটনের কারণে অনেক ব্যাংক এখন দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে পারছে না। ফলে ব্যাংকিং সেবার মান কমছে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়নেও ভাটা পড়ছে। এতে আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে গ্রাহকরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

আমানতের ওপর সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি

মূল্যস্ফীতির চেয়ে আমানতের সুদের হার কম হওয়ায় মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। মানুষ এখন জমানো টাকা তুলে জমি বা স্বর্ণে বিনিয়োগ করছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ব্যাংকের নগদ তারল্যের ওপর।

 আন্তর্জাতিক রেটিং ও আস্থার সংকট

দেশের ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থাগুলো যখন ক্রেডিট রেটিং কমিয়ে দেয়, তখন বিদেশি ব্যাংকগুলো আমাদের স্থানীয় ব্যাংকগুলোর সাথে লেনদেন করতে ভয় পায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে গ্যারান্টি খরচ অনেক বেড়ে যায়।

আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান 

ব্যাংকিং খাতে সংকটের অন্যতম কারণ হলো আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান বা স্প্রেড সঠিক মাত্রায় না থাকা। যখন আমানতের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে উচ্চ সুদ দিতে হয় কিন্তু খেলাপি ঋণের কারণে আয় কমে যায়, তখন ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা সংকুচিত হয়। এই অসামঞ্জস্যতা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাংকের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দেয়।

 মূলধন পর্যাপ্ততার ঘাটতি 

ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য প্রতিটি ব্যাংকের নির্দিষ্ট পরিমাণ মূলধন সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। তবে বর্তমানে অনেক সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। এই মূলধন ঘাটতির ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ব্যাংকগুলোর গ্রহণযোগ্যতা কমে যায় এবং আমানতকারীদের মনে আস্থার সংকট আরও প্রকট হয়।

তথ্যের অস্বচ্ছতা ও উইন্ডো ড্রেসিং

অনেক সময় ব্যাংকগুলো তাদের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা আড়াল করার জন্য ‘উইন্ডো ড্রেসিং’ বা কৃত্রিমভাবে হিসাবের ঘষামাজা করে। এতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ বা লোকসানের চিত্র গোপন রাখা হয়। এই ধরনের অস্বচ্ছতা সংকটকে ভেতর থেকে আরও ঘনীভূত করে, যা হঠাৎ করে বড় ধরনের ধসের ঝুঁকি তৈরি করে।

 

অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও নিরীক্ষার দুর্বলতা

ব্যাংকগুলোর ভেতরে জালিয়াতি বা অনিয়ম ঠেকানোর জন্য যে ধরনের শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ অডিট বা নিরীক্ষা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, অনেক ক্ষেত্রেই তার অভাব পরিলক্ষিত হয়। ব্যাংকের নিজস্ব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটায় ব্যাংকিং খাতের সংকট আরও তীব্রতর হচ্ছে। যখন অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, তখন সাধারণ আমানতকারীদের অর্থ ঝুঁকির মুখে পড়ে।

 প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ ও সাইবার ঝুঁকি

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের প্রসারের সাথে সাথে সাইবার হামলার ঝুঁকিও অনেক বেড়ে গেছে। অনেক ব্যাংকের আইটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক মানের না হওয়ায় হ্যাকিং বা অনলাইন জালিয়াতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের আশঙ্কা থাকে। এ ধরনের ঝুঁকি ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং গ্রাহক আস্থার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের  প্রতি অবহেলা

ব্যাংকগুলো অনেক সময় বড় বড় শিল্প গ্রুপকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী থাকে, কিন্তু অর্থনীতির মূল ভিত্তি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনীহা দেখায়। বড় ঋণগ্রহীতাদের একটি অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে ঋণখেলাপি হওয়ায় ব্যাংকগুলোর তারল্য আটকে যাচ্ছে। অথচ এসএমই খাতে ঋণ প্রবাহ সচল থাকলে তা যেমন অর্থনীতিকে গতিশীল করত, তেমনি ব্যাংকের ঝুঁকিও অনেকটা কম থাকত।

বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার ও টাকার অবমূল্যায়ন

বিশ্ববাজারে ডলারের উচ্চমূল্য এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে টাকার মানের ক্রমাগত অবনতি ব্যাংকিং খাতের সংকট-কে সরাসরি প্রভাবিত করছে। আমদানিকারকরা যখন এলসি  সেটলমেন্ট করতে যান, তখন ব্যাংকগুলোকে বাড়তি মূল্যে ডলার সরবরাহ করতে হয়। এর ফলে ব্যাংকের নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়ে এবং সামগ্রিক তারল্য ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা দেখা দেয়।

পরিচালনা পর্ষদের পেশাদারিত্বের অভাব

অনেক ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদে দীর্ঘ সময় ধরে একই ব্যক্তি বা পরিবারের আধিপত্য বজায় থাকে। এর ফলে ব্যাংকের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে পেশাদারত্বের চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়। যখন যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের পরিবর্তে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত পরিচয়ে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।

আমানতকারীদের আস্থাহীনতা ও অর্থ উত্তোলন

ব্যাংকিং খাতের নানা অনিয়মের খবর যখন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তখন সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বা প্যানিক সৃষ্টি হয়। এর ফলে অনেকে ব্যাংক থেকে তাদের জমানো টাকা তুলে নিতে শুরু করেন। এই গণ-উত্তোলন পরিস্থিতি কোনো ব্যাংকের জন্য সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে, যা পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে ধসের কিনারে নিয়ে যেতে পারে।

ব্যাংকগুলোর প্রশাসনিক ব্যয় ও বিলাসিতা

অনেক সময় দেখা যায় ব্যাংকগুলো সংকটে থাকা সত্ত্বেও তাদের প্রশাসনিক ও পরিচালন ব্যয় কমাতে পারে না। বিলাসবহুল অফিস সাজসজ্জা, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ব্যাংকের নিট মুনাফাকে সংকুচিত করে। ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ব্যয় সংকোচন নীতি এবং মিতব্যয়িতা অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।

 কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ ভূমিকার চাপ

যখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তীব্র তারল্য সংকটে পড়ে, তখন তারা শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ধরণা দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বিশেষ তারল্য সহায়তার মাধ্যমে ক্রমাগত দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখে, তবে বাজারে মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে। এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার ব্যাংকিং খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাকে ঢেকে রাখে কিন্তু স্থায়ী কোনো সমাধান দেয় না।

খেলাপি ঋণ আদায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বা আদালত

বর্তমান অর্থঋণ আদালতগুলোতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি মারপ্যাঁচে পাওনা আদায় প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। সংকটের এই গভীরতা কমাতে বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যেতে পারে, যা শুধুমাত্র বড় অংকের খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করবে। আইনের এই দ্রুত বাস্তবায়ন ঋণখেলাপিদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করবে এবং আদায় প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।

ব্যাংক একীভূতকরণ ও আমানতকারীদের ঝুঁকি

বর্তমান ব্যাংকিং খাতের সংকট থেকে উত্তরণের অন্যতম উপায় হিসেবে সরকার ব্যাংক একীভূতকরণ বা মার্জার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে দুর্বল ব্যাংককে সবল ব্যাংকের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ আমানতকারীরা অনেক সময় আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। যদি এই প্রক্রিয়া স্বচ্ছতার সাথে সম্পন্ন না হয়, তবে আমানত তুলে নেওয়ার প্রবণতা বেড়ে গিয়ে ব্যাংকিং খাতের সংকট আরও তীব্র হতে পারে। তাই ব্যাংক একীভূতকরণের সময় গ্রাহকদের অর্থের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের অনাস্থা

শুধুমাত্র সাধারণ মানুষ নয়, বড় বড় সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যাংকে রাখতে ভয় পাচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান সংকটে থাকা ব্যাংকগুলো থেকে তাদের আমানত সরিয়ে শক্তিশালী ব্যাংকগুলোতে জমা দিচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকে অর্থের পাহাড় জমছে, আর বাকি ব্যাংকগুলো ভয়াবহ ব্যাংকিং খাতের সংকট মোকাবিলা করছে। এই ভারসাম্যহীনতা দূর করতে পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থার পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন।

খেলাপি ঋণের প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি

যখন কোনো ব্যাংক খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে ব্যর্থ হয়, তখন সেই ব্যাংকের মূলধন ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। বাংলাদেশের অনেক ব্যাংক এখন বড় অংকের প্রভিশন ঘাটতিতে রয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের সংকট-কে সরাসরি প্রতিফলিত করে। এই মূলধন ঘাটতি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে এলসি খোলা বা গ্যারান্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে থাকবে।

 

 

পরিশেষে বলা যায়, ব্যাংকিং খাতের সংকট নিরসন করা এখন সময়ের দাবি। যদি সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এটি দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। সরকার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই কেবল সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসনই পারে আমাদের ব্যাংকিং খাতকে আবার শক্তিশালী অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর