৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা: কেজিতে বাড়ল ৮ টাকা পর্যন্ত

বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা: কেজিতে বাড়ল ৮ টাকা পর্যন্ত

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা
বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা
বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা

দেশের আসন্ন জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ ঘোষণার আর মাত্র অল্প কয়েকদিন বাকি। আর এই মোক্ষম সুযোগটিকেই কাজে লাগাতে শুরু করেছে একদল অসাধু আমদানিকারক ও মিল মালিক। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাতে আজ সকাল থেকে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে চিনির দাম কেজিতে ৫ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। হঠাৎ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় এই পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ ক্রেতারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করছেন এবং বাজার তদারকি জোরদার করার দাবি জানাচ্ছেন। মূলত বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা পড়ার কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের পকেট কাটার নতুন এক মচ্ছব শুরু হয়েছে বাজারে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, মিল পর্যায় থেকে চিনির সরবরাহ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে পাইকারি বাজারে। তবে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর মতে, এটি সম্পূর্ণ একটি কৃত্রিম সংকট এবং বাজেটকে সামনে রেখে অতিরিক্ত মুনাফা লোটার অপকৌশল।

কারওয়ান বাজার ও মৌলভীবাজারের বর্তমান চিত্র

আজ সকালে রাজধানীর অন্যতম প্রধান পাইকারি বাজার কারওয়ান বাজার এবং পুরান ঢাকার মৌলভীবাজার ঘুরে দেখা গেছে, গতকাল যে চিনি খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি ১২৫ থেকে ১২৮ টাকায় বিক্রি হতো, আজ তা একলাফে ১৩৫ থেকে ১৩৬ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। আর পাইকারি বাজারে প্রতি বস্তা (৫০ কেজি) চিনিতে এক রাতেই বেড়েছে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা। পাইকারি ব্যবসায়ীরা দাবি করছেন, মিল গেট থেকে তাদের বেশি দামে চিনি কিনতে হচ্ছে, তাই তারা নিরুপায়। তবে খুচরা বিক্রেতা ও সাধারণ ভোক্তারা স্পষ্ট বলছেন, বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা এতটাই শক্ত রূপ নিয়েছে যে, প্রশাসনের কোনো নিয়ন্ত্রণই কাজ করছে না।

আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাত কতটা যৌক্তিক?

আমদানিকারক ও বড় বড় রিফাইনারি মিলগুলোর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত চিনির দাম টন প্রতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ডলার সংকটের কারণে এলসি  খুলতে বাড়তি খরচ হচ্ছে। কিন্তু বাজার বিশ্লেষকেরা এই যুক্তিকে পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন। তাদের মতে, বর্তমানে বাজারে যে চিনি বিক্রি হচ্ছে, তা অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগে কম দামে আমদানি করা হয়েছিল। ফলে নতুন করে আন্তর্জাতিক বাজারের অজুহাতে রাতারাতি দাম বাড়ানোর কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি নেই। মূলত বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা বসিয়ে আগের মজুদ করা পণ্য থেকে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

সাধারণ ক্রেতাদের তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা

কারওয়ান বাজারে নিত্যসওদা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বাজারে এমন কোনো জিনিস নেই যার দাম বাড়ছে না। চাল, ডাল, তেলের পর এখন আবার চিনির দাম বাড়ানো হলো। বাজেট ঘোষণার আগেই যদি এই অবস্থা হয়, তবে বাজেটের পর আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।” সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, প্রতি বছরই মে-জুন মাসের দিকে কোনো না কোনো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে এই ধরণের নোংরা খেলা খেলা হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি, এবং বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা উপকূল থেকে রাজধানী পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

মিল মালিকদের সরবরাহ ঘাটতির আড়ালের রহস্য

মৌলভীবাজারের কয়েকজন পাইকারি ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় ৩-৪টি সুগার রিফাইনারি মিল গত তিন দিন ধরে চিনি সরবরাহের গতি কমিয়ে দিয়েছে। তারা ডিও স্লিপ ছাড়ছে না, যার কারণে বাজারে চিনির কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত চিনি মজুদ থাকা সত্ত্বেও মিলগুলো বাজারে সরবরাহ না বাড়িয়ে দাম বাড়ার জন্য অপেক্ষা করছিল। এই পরিকল্পিত সরবরাহ ঘাটতির কারণেই মূলত বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা সফল হয়েছে এবং পাইকারি পর্যায়ে ডিও কেনাবেচায় জুয়া খেলা শুরু হয়েছে।

জাতীয় বাজেটের সুযোগ নিচ্ছে অসাধু চক্র

বাংলাদেশে প্রতি বছর জুন মাসে জাতীয় বাজেট পেশ করা হয়। অসাধু ব্যবসায়ী চক্র খুব ভালো করেই জানে যে, বাজেটে কোনো পণ্যের শুল্ক বাড়তে পারে এমন গুঞ্জন ছড়াতে পারলেই দাম বাড়ানো সহজ হয়। এবারও চিনির ওপর আমদানি শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধির একটি ভুয়া গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছে। এই সুযোগে মিল পর্যায় থেকে শুরু করে বড় আড়তদারেরা সিন্ডিকেট করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের ওপর এই মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে হলে এই মুহূর্তে বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা গুঁড়িয়ে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা।

আরো পড়ুনঃ ডলার বুস্টিংয়ের নামে প্রতারণার ফাঁদ

জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান ও সীমাবদ্ধতা

চিনির দাম হঠাৎ বৃদ্ধির খবর পেয়ে আজ দুপুরে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর  কারওয়ান বাজারে একটি বিশেষ সতর্কতামূলক অভিযান চালায়। অভিযানকালে বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ক্রয়-বিক্রয়ের রসিদ (মেমো) দেখাতে না পারায় জরিমানা করা হয়। তবে ভোক্তারা বলছেন, কেবল খুচরা বাজারে ৫০০ বা ১০০০ টাকা জরিমানা করে এই মহামারি ঠেকানো সম্ভব নয়। যতক্ষণ না দাম বৃদ্ধির মূল উৎস অর্থাৎ বড় বড় মিল গেট এবং কর্পোরেট সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্ত করা যাবে না।

বাজার তদারকি জোরদার করার দাবি ও ক্যাবের সুপারিশ

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর পক্ষ থেকে সরকারকে অবিলম্বে চিনির বাজারে টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। ক্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, “আমাদের বাজার মনিটরিং ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ব্যবসায়ীরা যখন খুশি দাম বাড়ায়, আর কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই সাধারণ মানুষের পকেট কাটে।” তারা সুপারিশ করেছেন যে, শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের প্রতিটি জেলার মিল ও পাইকারি আড়তে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে এই বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপরেও বিস্তৃত হতে পারে।

বিকল্প ব্যবস্থা ও সরকারি চিনিকলগুলোর অকার্যকারিতা

এক সময় বাংলাদেশের সরকারি চিনিকলগুলো দেশের চাহিদার একটি বড় অংশ পূরণ করত। কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আধুনিকায়নের অভাবে সরকারি কলগুলো এখন প্রায় মৃতপ্রায়। ফলে দেশের চিনি খাতের প্রায় ৯০ শতাংশই এখন গুটিকয়েক বেসরকারি কর্পোরেট গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই একচেটিয়া বাজার ব্যবস্থার  কারণেই যখন-তখন বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা বসানো সম্ভব হচ্ছে। সরকারি কলগুলোকে পুনরায় সচল করা এবং টিসিবির  মাধ্যমে চিনি আমদানি বাড়িয়ে খোলা বাজারে বিক্রি বৃদ্ধি করাই এই সিন্ডিকেট ভাঙার একমাত্র স্থায়ী সমাধান।

 

নিত্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট বা অসাধু চক্রের এই দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যখন শেষ সীমায় পৌঁছে যায়, তখন এই ধরণের অন্যায্য মূল্যবৃদ্ধি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। আন্তর্জাতিক বাজারের দোহাই দিয়ে বাজেটের আগেই চিনির বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা বসানোর এই চেষ্টা রুখতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং প্রতিযোগিতা কমিশনকে অবিলম্বে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। অপরাধীদের গুদাম সিলগালা করা এবং লাইসেন্স বাতিল করার মতো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে দেশের সাধারণ জনগণের কষ্টের কোনো শেষ থাকবে না।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর