
বাংলাদেশের অর্থনীতি ও কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনা জাগিয়ে এবার বিশাল পরিসরে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম। আমাদের মাটির সুমিষ্ট ও রসালো আম স্বাদে ও গন্ধে অনন্য হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে এর তুমুল চাহিদা রয়েছে। এমনকি বিশ্বখ্যাত থাইল্যান্ড বা পাকিস্তানের আমের চেয়েও গুণগত মানে আমাদের আম অনেক ভালো। তবে কেবল নীতিগত জটিলতা, আমলাতান্ত্রিক সনাতন নিয়ম এবং আকাশছোঁয়া বিমান ভাড়া বা উচ্চ ফ্রেইট চার্জ এর কারণে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আম রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছিল না। এই পরিস্থিতি দূর করতে এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ সহজ করতে এবার জরুরি ও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
আজ (বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬) রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) মিলনায়তনে রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত আম রপ্তানির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এই বিশেষ আশ্বাসের কথা জানিয়েছেন কৃষি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, সরকার উচ্চ ফ্রেইট চার্জ হ্রাস করাসহ আম রপ্তানির সব ধরনের আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা দূর করতে যাচ্ছে, যাতে আরও বড় পরিসরে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম—এই স্লোগানটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে পারে।
থাইল্যান্ড বা পাকিস্তানের চেয়েও সুস্বাদু বাংলাদেশের আম
বিশ্বের আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। ভৌগোলিক পরিবেশ এবং উর্বর মাটির কারণে এ দেশের হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি ও গোপালভোগের মতো জাতগুলোর স্বাদ আন্তর্জাতিক বাজারে প্রশংসিত। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা উল্লেখ করেন, স্বাদের দিক থেকে থাইল্যান্ড বা পাকিস্তানের আমের চেয়ে বাংলাদেশের আম অনেক এগিয়ে থাকলেও বিপণন কৌশলে তারা আমাদের চেয়ে এগিয়ে গেছে। সঠিক ডিস্ট্রিবিউশন চেইন না থাকায় এবং কার্গো বিমান ভাড়ার অসম প্রতিযোগিতার কারণে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। তবে এই সংকটের অবসান ঘটিয়ে এবার নতুন উদ্যমে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম। সরকারের নতুন নীতিমালার আওতায় আমের স্বাদ ও প্রাকৃতিক গুণ অক্ষুণ্ণ রেখেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার কাজ শুরু হয়েছে।
উচ্চ বিমান ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ
আম একটি দ্রুত পচনশীল ফল। তাই এটি বিদেশে পাঠাতে মূলত বিমান কার্গোর ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বর্তমান বাজারে বাংলাদেশের জন্য নির্ধারিত এয়ার কার্গো ভাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি, যা সাধারণ রপ্তানিকারকদের জন্য একটি বড় ধাক্কা। উচ্চ ফ্রেইট চার্জের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রী তার বক্তব্যে এই উচ্চ কার্গো ভাড়ার সমস্যাটিকে আম রপ্তানি খাতের অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি আশ্বাস দিয়ে বলেন, “আমরা বিমান মন্ত্রণালয়ের সাথে জরুরি ভিত্তিতে বৈঠক করছি। আমের মৌসুমে বিশেষ কার্গো ফাইটের ব্যবস্থা করা এবং ফ্রেইট চার্জে বিশেষ ভর্তুকি বা ছাড় দেওয়ার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।” এই ভাড়া কমে এলে আরও সাশ্রয়ী মূল্যে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম, যা আমাদের দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে।
নীতিগত ও আইনি জটিলতা নিরসনের উদ্যোগ
বাংলাদেশ কৃষিপণ্য উৎপাদনের জন্য বিশ্বের অন্যতম উপযোগী দেশ হলেও নীতিগত ও আইনি কিছু জটিলতার কারণে এই খাতটি এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। আম রপ্তানি করতে গিয়ে কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট, ফাইটোস্যানিটারি ছাড়পত্র এবং কাস্টমসের নানা জটিলতায় পড়তে হয় উদীয়মান উদ্যোক্তাদের। মন্ত্রী আমিন উর রশিদ জানান, এসব সনাতন লালফিতার দৌরাত্ম্য ও নীতিগত বাধা দূর করতে একটি ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেল গঠন করা হবে। এর ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঝামেলাহীনভাবে ছাড়পত্র মিলবে এবং নির্বিঘ্নে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম—এই প্রক্রিয়াটি গতিশীল হবে।
নিরাপদ খাদ্য ও আধুনিক প্যাকিং
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ফল রপ্তানির ক্ষেত্রে ‘নিরাপদ খাদ্য’ বা ফুড সেফটিকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন শুধু ফলের স্বাদ নয়, সেটি কতটা রাসায়নিক মুক্ত এবং কীভাবে প্যাকেজিং করা হয়েছে তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য অর্জনে দেশে একটি আধুনিক প্যাকিং ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, সঠিক মান নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ উৎপাদন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক বাজারে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির ব্যবহার এবং আধুনিক কুলিং ভ্যানের মাধ্যমে আমের স্থায়িত্ব বাড়িয়েই মূলত বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম।
বিজ্ঞানীদের প্রতি মন্ত্রীর বিশেষ আহ্বান
অনুষ্ঠানে দেশের কৃষি বিজ্ঞানীদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা দিয়েছেন মন্ত্রী আমিন উর রশিদ। তিনি বাংলাদেশের আদি ফলের স্বাদ ও আদি গুণগত মান সংরক্ষণের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী ফলের আকর্ষণীয় রং, স্থায়িত্ব ও সংরক্ষণক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। তবে তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে বলেন, “বাজার ধরার জন্য আম বা অন্য কোনো ফলের ওপর এমন কোনো জিনগত পরিবর্তন করা উচিত নয়, যাতে ফলের স্বাভাবিক ঐতিহ্যবাহী স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়।” কারণ, আমাদের আমের আসল শক্তিই হলো এর প্রাকৃতিক স্বাদ, যার ওপর ভর করেই মূলত বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম।
আরো পড়ুনঃ মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার
কৃষিখাতে সরকারি ভর্তুকি ও সহায়তা বৃদ্ধির ঘোষণা
আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কৃষিখাতে সরকারি সহায়তা ও ভর্তুকি দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে উল্লেখ করেন কৃষিমন্ত্রী। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশও তাদের কৃষিখাতে ব্যাপক ভর্তুকি দিয়ে থাকে যাতে তাদের দেশের পণ্য বিশ্ববাজারে কম দামে রাজত্ব করতে পারে। বাংলাদেশ সরকারও কৃষকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কৃষকদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, সহজ শর্তে ঋণ মওকুফ এবং সেচের জন্য খাল খননের মতো উদ্যোগ কৃষি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। আম চাষিদেরও এই সুবিধার আওতায় এনে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে, যেন কোনো আর্থিক সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম—এই জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত না হয়।
চীনে কাঁঠাল রপ্তানির তোড়জোড়
আম রপ্তানির এই বড় উদ্যোগের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে দেশের আরেকটি প্রধান ফল কাঁঠাল নিয়েও অত্যন্ত ইতিবাচক সুখবর দেওয়া হয়েছে। মন্ত্রী জানান, চীনে বড় পরিসরে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সে দেশের সরকার। আমের বাধাগুলো দূর করার পাশাপাশি কাঁঠাল রপ্তানির জন্যও রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। আম এবং কাঁঠালের এই যুগলবন্দী আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ফল রপ্তানির খাতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ফলে শুধু আমই নয়, সামগ্রিক ফল ও কৃষিপণ্য নিয়ে বিশ্বজয়ের যে স্বপ্ন, তা এখন বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে।
রপ্তানিকারক ও আম চাষিদের প্রতিক্রিয়া
সরকারের এই যুগান্তকারী ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও সাতক্ষীরার আম চাষি ও বাণিজ্যিক রপ্তানিকারকেরা। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই তারা ফ্রেইট চার্জ কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এক আম রপ্তানিকারক বলেন, “থাইল্যান্ড ও পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে তাদের দেশের ব্যবসায়ীরা যে ধরণের লজিস্টিক সাপোর্ট পায়, আমরা তা পেলে বিশ্ববাজারের বড় অংশ আমাদের দখলে চলে আসবে। সরকারের এই প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন হলে সত্যি সত্যিই আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারব যে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম।”
আমাদের দেশের প্রতিটি ফলের মধ্যে যে স্বাদ ও পুষ্টি লুকিয়ে আছে, তা বিশ্বের আর কোথাও মেলা ভার। কৃষি ও মৎস্য মন্ত্রীর আজকের এই সময়োপযোগী ঘোষণাটি দেশের আম চাষি ও ফল রপ্তানি খাতের জন্য এক নতুন আশার আলো। বিমান ভাড়া বা ফ্রেইট চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং নীতিগত বাধাগুলো দ্রুত অপসারণ করা সম্ভব হলে, থাইল্যান্ড বা পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ ফলের বাজারে শীর্ষস্থান দখল করতে পারবে। সঠিক তদারকি, কেমিক্যালমুক্ত নিরাপদ উৎপাদন এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার হাত ধরে শত বাধা পেরিয়ে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে দেশের আম—এটিই হোক ২০২৬ সালের এই মে মাসের আমের মৌসুমের সবচেয়ে বড় সাফল্য।







