১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ১লা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

/

মুসলিম উম্মাহর উন্নয়ন কল্পে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার ভাষণ

মুসলিম উম্মাহর উন্নয়ন কল্পে ওআইসি শীর্ষ সম্মেলনে খালেদা জিয়ার ভাষণ

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ

শুরুতেই আমি পবিত্র দুই মসজিদের সেবক, মহামান্য বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজকে ধন্যবাদ জানাই পবিত্র নগরী মক্কা মুকাররমায় শীর্ষ ইসলামী সম্মেলন আয়োজনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করায়। এই সম্মেলন শুধু সময়োপযোগীই নয়, বরং তা উম্মাহর জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ।

আয়োজক দেশের সহযোগিতায় এই সম্মেলন আয়োজনে অক্লান্ত পরিশ্রম করায় আমি ওআইসির মহাসচিবকেও ধন্যবান জানাই। ‘নিউ ভিশন ফর দ্য মুসলিম ওয়ার্ল্ড : সলিডারিটি ইন অ্যাকশন’ শীর্ষক প্রতিবেদনের জন্য আমি তার প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানাতে চাই।

এতে ‘মক্কা ফোরাম অব মুসলিম স্কলার্স অ্যান্ড ইনটেলেকচুয়ালস’-এর একটি চমৎকার বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তুতি হিসেবে পবিত্র দুই মসজিদের সেবকের আমন্ত্রণে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

আমরা এখানে এমন এক সময়ে সমবেত হয়েছি যখন মুসলিম উম্মাহ একটি সংকটময় সময় পার করছে। আমরা এমন কতগুলো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি যেগুলো জরুরি ভিত্তিতে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। আজ ইসলামের ভাবমূর্তি হুমকির মুখে।

নবী মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতির জন্য যে শান্তির বার্তা বয়ে এনেছিলেন তা মুছে ফেলার অশুভ চক্রান্ত চলছে। ইসলামকে হেয় করতে বিশ্বব্যাপী একটি সুপরিকল্পিত প্রচারণা চলছে এবং সারা বিশ্বে তার প্রভাব অনুভব করা যাচ্ছে। উম্মাহ বিভিন্ন ধরনের বহিরাগত হুমকি এবং নেতিবাচক প্রচারণার শিকার হচ্ছে। ফলে মুসলমানের ভেতর হতাশা ও জড়তার অনুভূতি ক্রমেই প্রকট হচ্ছে।

এই পরিস্থিতির মোকাবেলা এখনই কার্যকর উপায়ে সম্মিলিতভাবে করতে হবে। এর দায়িত্ব আমরা যারা, নেতারা এখানে সমবেত হয়েছি আমাদের ওপরই বর্তায়। এখন সমসাময়িক বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে একটি কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে এই প্রায় অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে হবে। মুসলিম বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্ব হলো আন্তর্জাতিক সমাজে আমাদের ন্যায্য অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।

মাননীয় সভাপতি!

যে প্রশ্নটি প্রথমে আমাদের সামনে আনা প্রয়োজন তা হলো সংহতি।

আমরা সব সময় আবেগের সঙ্গে ইসলামী সংহতির কথা বলি, যা অতীতেও ছিল এবং আমি বিশ্বাস করি তা ধারাবাহিকভাবে দৃঢ়তার সঙ্গে আমাদের সবাইকে সংহত করেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তা বহু চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টিকে আছে। এখন সময় হলো সংহতির ওপর আমাদের বিশ্বাসকে পুনঃস্থাপন করা এবং কর্মতৎপরতায় তা প্রকাশ করা। অভিন্ন সংকট মোকাবেলায় আমাদের একটি অভিন্ন স্থান গ্রহণ করা জরুরি। এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণের সুযোগ নেই।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে—ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও জেরুজালেম ইস্যুতে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব হলো অতীতের মতো অভিন্ন সুরে আলোচনা অব্যাহত রাখা। জাতিসংঘের রেজল্যুশন, আরব পিস প্লান ও রোড ম্যাপের আলোকে ফিলিস্তিন সংকটের একটি যৌক্তিক সমাধানের পক্ষে আমাদের নীতিগত অবস্থান অব্যাহত রাখতে হবে। ফিলিস্তিন ইস্যুতে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যকে স্পষ্টভাবে তুল ধরতে হবে। এ বিষয়ে যেকোনো দ্বিধা আমাদের বিরোধীদেরই শক্তিশালী করবে।

মাননীয় সভাপতি!

ঐক্য ও সংহতি প্রকাশে আমাদের আশু দায়িত্ব হলো আমাদের বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা। এ ক্ষেত্রে আমাদের সংহতির সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ওআইসির প্রতি আরো কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত। এতে ওআইসি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আরো কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে। পাশাপাশি ওআইসির সব চুক্তিতে স্বাক্ষর ও অনুমোদন করতে হবে এবং ওআইসির গৃহীত পরিকল্পনা বাস্তবায়নে আমাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে হবে।

ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় করার আরেকটি উপায় হলো পারস্পরিক সহযোগিতা। মুসলিমদের সাহায্য করার মাধ্যমেই আমাদের ঐক্য ও সংহতি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়। বর্তমানে সহযোগিতার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো : সক্ষমতা বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন ও দুর্যোগকালীন ত্রাণ। এ বিষয়ে বেশ কিছু প্রস্তাব ও ধারণা এসেছে—প্রথমত, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য একটি ছাড়মূলক শক্তিশালী তহবিল গঠন করা। আমরা আশা করি, স্বল্পোন্নত সদস্য রাষ্ট্রগুলোর চাহিদা পূরণে এটি বহু দূর পর্যন্ত এগিয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, একটি ওআইসি জরুরি ত্রাণ তহবিল প্রতিষ্ঠা করা, যা দুর্যোগপূর্ণ এলাকার ত্রাণ ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক জাকাত তহবিল গঠন করা, যা মুসলিম বিশ্বের বেসরকারি খাতে নিযুক্ত ব্যক্তিদের দারিদ্র্য দূর করতে ব্যবহার করা হবে। ইসলামী সংহতি তহবিলকেও শক্তিশালী করতে হবে এবং এর কার্যক্রমের পরিধি আরো বিস্তৃত করতে হবে।

মাননীয় সভাপতি!

তৃতীয় যে বিষয়ে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন তা হলো সর্বক্ষেত্রে সহযোগিতা। আমাদের অবশ্যই অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে হবে। বহু বছর ধরে ওআইসির সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভেতর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে ওআইসি পরিকল্পনা পেশ করে আসছে, তবে তা বাস্তবায়নে অগ্রগতি খুব আশাব্যঞ্জক নয়। এ

ক্ষেত্রে একটি অর্থবহ অগ্রগতি প্রয়োজন। বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে।

আমরা বিশ্বাস করি, আমরা আন্তরিক হলে ২০১৫ সালের ভেতরে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্য মোট বাণিজ্যের ২০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। এ জন্য ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফিন্যান্স করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আর ইসলামিক করপোরেশন ফর ইনস্যুরেন্স অ্যান্ড এক্সপোর্ট ক্রেডিটের ব্যাপক ব্যবহার পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে। ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সম্পদভিত্তিক সম্প্রসারণও প্রয়োজন, বিশেষত বাণিজ্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে। আমি ওআইসিভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর ভেতর অগ্রাধিকারভিত্তিক বাণিজ্য ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় একটি কাঠামো চুক্তির ওপর জোর দিতে চাই। আমরা আশা করি, এই কাঠামো চুক্তির সফল বাস্তবায়ন ভবিষ্যতে ওআইসি দেশগুলোর মধ্যে একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গঠনের পথ সুগম করবে।

মাননীয় সভাপতি!

আমাদের অভিন্ন উদ্বেগের চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো সন্ত্রাসবাদ দমন। ইতিহাসের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে আমরা প্রতিনিয়ত নজিরবিহীন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মুখোমুখি হচ্ছি, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনকেও প্রভাবিত করছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে আজ মুসলিম ব্যক্তি ও রাষ্ট্রগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। মুসলমান ও মুসলিম দেশগুলোকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা চলছে। আমাদের মহান ধর্ম ইসলামকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে

সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে একাকার করার অপচেষ্টা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী সাধারণ মুসলমানরা কিছুসংখ্যক সন্ত্রাসীর কর্মকাণ্ডের কারণে ভুক্তভোগী হচ্ছে, যারা নিজেদের মুসলিম দাবি করে বা ইসলামের নামে কাজ করে। আমি এখানে স্পষ্টভাবে বলতে চাই, সন্ত্রাসীকে শুধু সন্ত্রাসী হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে তার বর্ণ, বিশ্বাস বা ধর্ম-নির্বিশেষে। আমরা সন্ত্রাসবাদকে তার সব রূপ ও প্রকাশে নিঃশর্তভাবে নিন্দা জানাই।

মাননীয় সভাপতি!

পঞ্চম যে বিষয়ে আমরা আলোকপাত করতে চাই তা হলো ইসলামফোবিয়ার উদ্বেগজনক বিস্তার, যা বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে। আমরা মনে করি, গণমাধ্যমে মুসলিম বা ইসলামী সন্ত্রাসী, জঙ্গি অথবা মৌলবাদীর মতো পরিভাষার প্রয়োগ অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠীর ভেতর মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছে। অমুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের প্রভাবশালী একটি অংশের দ্বারা পরিচালিত বিদ্বেষপূর্ণ অপপ্রচারে বিশ্বাস করে থাকে। প্রকৃত পক্ষে এটি পরোক্ষভাবে সেই অল্পসংখ্যক সন্ত্রাসীকেই সহায়তা করছে, যারা সাধারণ মুসলমানদের আবেগকে কাজে লাগায়। ইসলামবিদ্বেষ ও ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করতে এবং ইসলামের প্রকৃত চিত্র বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য একটি বহুভাষিক ওআইসি ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি।

মাননীয় সভাপতি!

একসময় মুসলিম উম্মাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের শীর্ষ অবস্থানে ছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আমাদের পশ্চাৎপদতা মুসলিম দেশগুলোর প্রান্তিকীকরণের একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষত উন্নয়নের ক্ষেত্রগুলোতে। আমরা যত বেশি শিক্ষিত হব, ততই শক্তিশালী হব। ওআইসি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় মানবসম্পদ ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনা রয়েছে। এগুলোকে সুসংগঠিতভাবে লালন করতে হবে, যাতে আমরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারি। এ ক্ষেত্রে আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে স্মরণ করতে চাই, যিনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সমৃদ্ধ মুসলিম উম্মাহর স্বপ্ন দেখেছিলেন। আজকের ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সেই স্বপ্নের বাস্তবরূপ। আজ আইইউটি ঈর্ষণীয় একাডেমিক অবস্থানে পৌঁছেছে।

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মুসলিম বিশ্ব নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। প্রতিবারই তারা নতুন উদ্যমে, দৃঢ় ঈমান নিয়ে এবং ইসলামের পতাকা সমুন্নত রেখে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আজকের চ্যালেঞ্জ সর্বগ্রাসী বলে মনে হতে পারে, কিন্তু ইসলামের চেতনাকে যথাযথভাবে আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারলে, আমরা অবশ্যই তা মোকাবেলা করে বৈশ্বিক সমাজে আমাদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে পারব।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর