ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তাওহীদ বা আল্লাহ তাআলার একত্বে নিখুঁত বিশ্বাস। এই বিশ্বাসই একজন মানুষের ঈমানের মেরুদণ্ড, যার ওপর নির্ভর করে তার দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতা বা ব্যর্থতা। কোরআন যেমন বারবার শিরকের ভয়াবহতা স্মরণ করিয়ে দেয়, তেমনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাদিসসমূহে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তাওহীদের গুরুত্ব ও শিরকের পরিণতি তুলে ধরেছেন। সাহাবায়ে কিরামের সঙ্গে তাঁর সংলাপেও আমরা সেই মৌলিক আকিদার সুস্পষ্ট প্রতিফলন দেখতে পাই।
তেমনই একটি হৃদয়স্পর্শী ও গভীর অর্থবহ আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ (রা) বর্ণিত এই হাদিসটি-
عَنْ عَبْدِ اللهِ قَالَ النَّبِيُّ كَلِمَةً وَقُلْتُ أُخْرَى قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم مَنْ مَاتَ وَهْوَ يَدْعُوْ مِنْ دُوْنِ اللهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ وَقُلْتُ أَنَا مَنْ مَاتَ وَهْوَ لَا يَدْعُوْ لِلهِ نِدًّا دَخَلَ الْجَنَّةَ.
আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কথা বললেন, আর আমি একটি বললাম। নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে তাঁর সমকক্ষ হিসেবে আহবান করা অবস্থায় মারা যায়, সে জাহান্নামে যাবে। আর আমি বললাম, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সমকক্ষ হিসেবে আহবান না করা অবস্থায় মারা যায়? (তিনি বললেন) সে জান্নাতে যাবে।
(সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৪৯৭)
হাদিসের ব্যাখ্যা
এই হাদিসে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জান্নাত ও জাহান্নামের চূড়ান্ত মানদণ্ড হিসেবে তাওহীদ ও শিরককে অত্যন্ত সংক্ষেপে অথচ সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে ডাকে, তার কাছে প্রার্থনা করে বা তাকে চূড়ান্ত ভরসা ও উপাস্যের মর্যাদা দেয়, এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে; তার পরিণতি হবে জাহান্নাম। এখানে “আল্লাহর সমকক্ষ হিসেবে আহবান করা” বলতে শুধু মূর্তি পূজা বোঝানো হয়নি; বরং দোয়া, সাহায্য প্রার্থনা, ভয়, আশা, নিরঙ্কুশ আনুগত্য; এসব ক্ষেত্রে আল্লাহর অধিকার অন্য কারও কাছে সোপর্দ করাকেই বোঝানো হয়েছে।
অন্যদিকে আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) যখন প্রশ্ন করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে কাউকে সমকক্ষ না করে মৃত্যুবরণ করে, তার পরিণতি কী? তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করে বলেন: সে জান্নাতে যাবে।
এর দ্বারা বোঝানো হয়, তাওহীদ শুধু একটি বিশ্বাসগত ঘোষণা নয়; বরং এটি এমন এক ভিত্তি, যার ওপর আল্লাহ তাআলা বান্দার সব আমল মূল্যায়ন করেন। কোনো বান্দার গুনাহ থাকতে পারে, দুর্বলতা থাকতে পারে; কিন্তু যদি সে শিরকমুক্ত ঈমান নিয়ে দুনিয়া ত্যাগ করে, তবে আল্লাহর রহমতের দরজা তার জন্য উন্মুক্ত থাকে।
এই হাদিস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আখিরাতের মুক্তির পথ জটিল কোনো দর্শন নয়; বরং এক আল্লাহর প্রতি নিখাদ বিশ্বাস, তাঁর ওপর নির্ভরতা এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা। যুগে যুগে নবীগণ এ বার্তাই নিয়ে এসেছেন যে, “আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই”। এই বার্তার চিরন্তন সত্যটিই সংক্ষিপ্ত অথচ অমোঘ ভাষায় হাদিসটিতে বিবৃত হয়েছে ।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক







