৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড

রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড

 

রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড
রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড

বাংলাদেশি প্রবাসীদের কঠোর পরিশ্রম এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার অনন্য এক প্রতিফলন দেখা গেছে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যখন নানা বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, ঠিক তখনই প্রবাসীরা দেশে বৈধ পথে রেকর্ড পরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন। ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে আসা এই বিপুল পরিমাণ অর্থের ফলে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।

এই ঐতিহাসিক অর্জন কেবল দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকেই শক্তিশালী করেনি, বরং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক অভূতপূর্ব সুবাতাস বয়ে এনেছে। দেশের চলমান উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল রাখতে এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এই অর্জনের গুরুত্ব অপরিসীম।

রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়ার মূল কারণসমূহ

হঠাৎ করে বৈধ পথে প্রবাসীদের অর্থ পাঠানোর এই জোয়ার আসার পেছনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ কাজ করেছে। নিচে প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:

ব্যাংকিং চ্যানেলে আকর্ষণীয় প্রণোদনা

সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর জন্য যে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে, তা প্রবাসীদের দারুণভাবে উৎসাহিত করেছে। নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক রেমিট্যান্সের ওপর অতিরিক্ত বোনাস বা বিশেষ সুবিধা প্রদান করায় প্রবাসীরা হুন্ডির মতো অবৈধ পথ পরিহার করে ব্যাংকিং খাতকে বেছে নিচ্ছেন।

প্রযুক্তির সহজলভ্য ব্যবহার ও ডিজিটাল ব্যাংকিং

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস  এবং ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর সহজলভ্যতা প্রবাসীদের জন্য অর্থ পাঠানো অনেক সহজ করে দিয়েছে। এখন বিশ্বের যেকোনো প্রান্ত থেকে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবারের কাছে টাকা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়ার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।

অবৈধ হুন্ডি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি

সরকার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে অবৈধ হুন্ডি ব্যবসার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ঝুঁকি এবং আইনি জটিলতা সম্পর্কে প্রবাসীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে নিরাপদ ও নিশ্চিত উপায়ে অর্থ পাঠাতে তারা বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করছেন, যা শেষ পর্যন্ত রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড সৃষ্টিতে ভূমিকা রেখেছে।

প্রবাসীদের দেশপ্রেম ও সচেতনতা বৃদ্ধি

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার এই সময়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে প্রবাসীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। তারা অনুধাবন করতে পেরেছেন যে, তাদের পাঠানো কষ্টার্জিত অর্থ বৈধ পথে দেশে আসলে তা দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখে। এই গভীর দেশপ্রেমের ফলেই আজ রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়া সম্ভব হয়েছে।

রিজার্ভের ওপর স্বস্তির নিঃশ্বাস

গত কয়েক বছর ধরে ডলারের তীব্র সংকটের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছিল। আমদানি ব্যয় মেটাতে গিয়ে রিজার্ভ তলানিতে ঠেকেছিল। তবে বর্তমানে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হওয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ আবার শক্তিশালী অবস্থানে ফিরে এসেছে। এটি দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে অত্যন্ত সহায়ক হবে।

আরো পড়ুন :রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিস্থিতি

গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল

রেমিট্যান্সের সিংহভাগ অর্থ দেশের গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী পরিবারের কাছে পৌঁছায়। এই বিপুল অর্থ পাওয়ার ফলে গ্রামীণ জনগণের ক্রয়ক্ষমতা অনেক বেড়ে গেছে। তারা ঘরবাড়ি নির্মাণ, সন্তানের শিক্ষা, উন্নত চিকিৎসা এবং স্থানীয় ছোট ছোট ব্যবসায় এই অর্থ বিনিয়োগ করছেন। ফলে সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা অনেক বেশি সচল হয়েছে, যার পেছনে মূল অবদান রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড।

 এই ধারা বজায় রাখতে আমাদের করণীয়

রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড হওয়া যেমন আনন্দের, তেমনই এই ধারাকে ভবিষ্যতেও টিকিয়ে রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রবাসীদের এই অবদানকে চিরস্থায়ী করতে এবং রেমিট্যান্সের প্রবাহ আরও বাড়াতে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ওপর জোর দেওয়া

বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন, তবে তাদের বেশিরভাগই অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। ফলে তারা অন্যান্য দেশের দক্ষ শ্রমিকদের তুলনায় অনেক কম বেতন পান। আমরা যদি আমাদের যুবসমাজকে আধুনিক প্রযুক্তি, ড্রাইভিং, নার্সিং, কারিগরি ও আইটি খাতে দক্ষ করে বিদেশে পাঠাতে পারি, তবে আমাদের আয় বহুগুণ বেড়ে যাবে। দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে পারলে আগামীতে প্রতি বছরই রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড দেখা যাবে।

প্রবাসী বান্ধব সেবার মান উন্নয়ন

বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও হাইকমিশনগুলোতে প্রবাসীদের সেবার মান আরও বাড়াতে হবে। পাসপোর্ট নবায়ন, আইনি সহায়তা এবং যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে প্রবাসীরা যেন দ্রুত ও সহজ সেবা পান, তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। প্রবাসীরা যখন অনুভব করবেন যে দেশ তাদের পাশে আছে, তখন তারা আরও বেশি উৎসাহিত হয়ে বৈধ পথে অর্থ পাঠাবেন এবং রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড অক্ষুণ্ণ রাখবেন।

বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করা

প্রবাসীরা যেন তাদের কষ্টার্জিত টাকা দেশে এসে কোনো নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করতে পারেন, তার জন্য সহজ শর্তে বিশেষ বন্ড বা প্রবাসী বিনিয়োগ স্কিম চালু করা প্রয়োজন। শেয়ার বাজার, আবাসন খাত কিংবা শিল্প কারখানায় প্রবাসীদের জন্য বিশেষ কোটা বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলে তারা টাকা জমিয়ে না রেখে বা অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় না করে দেশের মূল অর্থনীতিতে যুক্ত করবেন।

ফ্রিল্যান্সিং ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতের নীরব বিপ্লব

বিদেশে সশরীরে কর্মরত প্রবাসীদের পাশাপাশি দেশের ভেতরে থাকা তরুণ প্রজন্মও এখন ঘরে বসে আন্তর্জাতিক বাজারে সেবা দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। আইটি ও ফ্রিল্যান্সিং খাত থেকে আসা এই আয় দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে যুক্ত হওয়ায় তা রেমিট্যান্সের মূল প্রবাহকে আরও শক্তিশালী করেছে। এই ডিজিটাল প্রবাসী আয় সামগ্রিক অর্থনীতিতে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়তে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

উৎসবে অতিরিক্ত অর্থ পাঠানোর প্রবণতা

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় উৎসবের আগে প্রবাসীদের মধ্যে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি টাকা পাঠানোর প্রবণতা দেখা গেছে। উৎসবের মরসুমে পরিবারের বাড়তি খরচ মেটাতে এবং আত্মীয়-স্বজনদের সাহায্য করতে প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ অর্থ পাঠিয়েছেন। নির্দিষ্ট সময়ের এই অর্থ প্রবাহের গতি বৃদ্ধি পাওয়ায় তা রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড স্পর্শ করতে দারুণভাবে সাহায্য করেছে।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায় এই রেকর্ডের ভূমিকা

রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড কেবল ব্যাংকের ভল্টেই জমা থাকে না, এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির মূল ভিত্তিগুলোকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়।

আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ে ইতিবাচক প্রভাব: বৈদেশিক মুদ্রার পর্যাপ্ততার কারণে বৈশ্বিক রেটিং সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সক্ষমতার সূচক বৃদ্ধি পায়, যা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক।

বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা হ্রাস: দেশের নিজস্ব রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে মেগা প্রকল্প বা উন্নয়নমূলক কাজের জন্য চড়া সুদে বিদেশি ঋণ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকখানি কমে আসে।

মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: বাজারে ডলারের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে আমদানিকৃত পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়, যা পরোক্ষভাবে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে।

প্রবাসীদের কল্যাণে আরও কিছু দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তাবনা

ভবিষ্যতেও যেন আমরা রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড ধরে রাখতে পারি, সেজন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:

প্রবাসী পেনশন স্কিমের সহজীকরণ

সরকার প্রবাসীদের জন্য যে বিশেষ পেনশন স্কিম চালু করেছে, তার প্রচার-প্রসার প্রবাসীদের মধ্যে আরও ব্যাপকভাবে করতে হবে। প্রবাসীরা যখন নিশ্চিত হবেন যে তাদের পাঠানো অর্থ দেশের মাটিতে নিরাপদ এবং তা তাদের ভবিষ্যৎ ও বৃদ্ধ বয়সের নিরাপত্তা দেবে, তখন তারা জমানো সব অর্থ বৈধ পথেই দেশে পাঠাবেন।

বিমানবন্দরগুলোতে প্রবাসীদের হয়রানি বন্ধ করা

যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশে টাকা পাঠিয়ে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়ছেন, দেশের বিমানবন্দরগুলোতে যেন তারা কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানির শিকার না হন। তাদের জন্য বিশেষ লাউঞ্জ, দ্রুত ইমিগ্রেশন সুবিধা এবং ভিআইপি মর্যাদা নিশ্চিত করা উচিত, যাতে তারা দেশে ফিরেই সম্মানিত বোধ করেন।

 

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় প্রবাসীদের ভূমিকা সবসময়ই সোনালী অক্ষরে লেখা থাকবে। যেকোনো সংকটের মুহূর্তে প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতিকে টেনে তুলেছেন। বর্তমান সময়ে রেমিট্যান্সে নতুন রেকর্ড গড়ার মাধ্যমে তারা আবারও প্রমাণ করলেন যে, তারাই দেশের অর্থনীতির আসল চালিকাশক্তি।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর