৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬: এক ধাক্কায় প্রবাসী আয় বাড়ল ২৫ শতাংশ, স্বস্তিতে ডলারের বাজার ও রিজার্ভ

রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬: এক ধাক্কায় প্রবাসী আয় বাড়ল ২৫ শতাংশ, স্বস্তিতে ডলারের বাজার ও রিজার্ভ

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬
রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬
রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এক বিশাল স্বস্তির খবর এসেছে। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের পাঠানো কষ্টার্জিত অর্থের ওপর ভর করে রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর গ্রাফে এক অভাবনীয় জোয়ার দেখা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রাতের সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি মে মাসের প্রথম ২০ দিনেই দেশে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসার পরিমাণ আগের মাসের একই সময়ের তুলনায় এক ধাক্কায় প্রায় ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো এই রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার ফলে দেশের ডলার বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলা অস্থিরতা অনেকটাই কেটে যাবে বলে আশা করছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা।

ঈদের আগে প্রবাসীদের উপহার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মেগা রিপোর্ট

সাধারণত প্রতি বছরই দুই প্রধান ধর্মীয় উৎসব তথা ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে প্রবাসীরা দেশে থাকা তাদের পরিবার-পরিজনের উৎসবের খরচ মেটাতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। তবে রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর মে মাসের এই গতি পূর্বের সব রেকর্ড ও পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে, মে মাসের ১ তারিখ থেকে ২০ তারিখ পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত, বিশেষায়িত এবং বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে দেশে যে পরিমাণ রেমিট্যান্স এসেছে, তা গত এপ্রিল মাসের প্রথম ২০ দিনের তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “কোরবানির পশু কেনা, ঈদের কেনাকাটা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে উৎসবের বাড়তি চাহিদার কারণে মে মাসের শুরু থেকেই রেমিট্যান্সের গতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তবে শেষ এক সপ্তাহে এই প্রবাহ কল্পনাতীতভাবে বেড়েছে।”

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক হাওয়া ও ডলার সংকট দূর হওয়ার আভাস

গত বেশ কিছু মাস ধরে দেশের ডলারের বাজার এবং আইএমএফ এর হিসাব পদ্ধতি অনুযায়ী বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত চাপ তৈরি হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন দায় পরিশোধের পর রিজার্ভের অবস্থান ধরে রাখা যেখানে চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে প্রবাসীদের এই ডলারের জোয়ার সাময়িক ধাক্কা সামলাতে বড় কুশনিং বা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে।

ব্যাংকিং চ্যানেলে পর্যাপ্ত ডলারের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় ঢাকার মতিঝিল ও কারওয়ান বাজারের খোলা বাজার বা কার্ব মার্কেটেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গত কয়েক দিনে খোলা বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে এবং ডলারের অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বা বাড়তি দাম কমতে শুরু করেছে। দেশের প্রথম সারির বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীরা  মনে করছেন, রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর এই ইতিবাচক ধারা যদি চলতি মে মাসের বাকি দিনগুলোতে এবং আগামী জুন মাসের মাঝামাঝি সময় (ঈদের ঠিক আগ পর্যন্ত) বজায় থাকে, তবে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেট রিজার্ভের পরিমাণ আবার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে ফিরে আসবে।

আরো পড়ুনঃ মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার

হুন্ডি প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি ও আড়াই শতাংশ প্রণোদনার সুফল

হঠাৎ করে বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্সের এই বড় উত্থানের পেছনে কেবল ঈদের চাহিদাই নয়, বরং বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু নীতিগত কড়াকড়ি এবং সরকারের বিশেষ তদারকি প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ উদ্যোগে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে অবৈধ হুন্ডি চক্র এবং ডিজিটাল উপায়ে অর্থ পাচারকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে কঠোর অভিযান চালানো হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া এবং ইউরোপের দেশগুলোতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লোগো ব্যবহার করে যারা অবৈধভাবে হুন্ডি ব্যবসা চালাচ্ছিল, তাদের বেশ কিছু এজেন্টের অ্যাকাউন্ট অবরুদ্ধ  করা হয়েছে।

একই সাথে, প্রবাসীদের বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি আড়াই শতাংশ (২.৫%) নগদ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি দেশের বেশ কিছু শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের ওপর নিজস্ব তহবিল থেকে বাড়তি প্রিমিয়াম বা আকর্ষণীয় এক্সচেঞ্জ রেট অফার করছে। ফলে প্রবাসীরা এখন অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হুন্ডির পথ পরিহার করে শতভাগ নিরাপদ ও দ্রুততম সময়ে দেশের ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠাতে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন।

বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর গতি বৃদ্ধির মূল কারণ

ব্যাংকিং খাতের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, প্রবাসী আয়ের এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা হঠাৎ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। মূলত প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রক্রিয়া আগের চেয়ে অনেক বেশি সহজ ও ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। নতুন প্রজন্মের প্রবাসীরা ব্যাংকে না গিয়ে সরাসরি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে মুহূর্তেই রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন। প্রযুক্তির এই সহজলভ্যতা এবং সরকারের নীতিগত সহায়তা রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে, যা দেশের ডলার সংকটের স্থায়ী সমাধানে পথ দেখাচ্ছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে চাঙ্গাভাব ও আসন্ন বাজেটে স্বস্তি

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষকদের মতে, মে ও জুন মাসের এই রেমিট্যান্সের জোয়ার সরাসরি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কোরবানির পশুর হাটগুলোতে নগদ টাকার সরবরাহ বাড়বে, যা দেশের পশুপালন খামারি ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের মুখে হাসি ফোটাবে।

পাশাপাশি, আগামী জুন মাসে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করতে যাচ্ছে সরকার। বাজেটের ঠিক আগ মুহূর্তে বৈদেশিক খাতের এই বড় সাফল্য এবং রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর এই চোখধাঁধানো পারফরম্যান্স অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের অনেকখানি চাপমুক্ত রাখবে। এটি দেশের আমদানি বিল পরিশোধ এবং মূল্যস্ফীতি  নিয়ন্ত্রণে সরকারকে নতুন করে কৌশল সাজাতে সাহায্য করবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। প্রবাসীদের এই অবদানকে সম্মান জানিয়ে ব্যাংকিং সেবা আরও সহজ করার দাবি জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর ইতিবাচক প্রভাব

দেশের বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার এই বড় সরবরাহের কারণে শুধু যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুবিধা পাচ্ছে তা নয়, বরং দেশের তফসিলি ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও বড় ধরনের তারল্য সংকট থেকে মুক্তি পাচ্ছে। প্রবাসীদের এই ব্যাপক সাড়ার কারণে দেশের রেমিট্যান্স হাউজগুলো এখন দিনরাত নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ কর্তারা মনে করছেন, মে মাসের এই ধারা অব্যাহত থাকলে রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬ দেশের ইতিহাসে ব্যাংকিং চ্যানেলে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের একটি নতুন মাইলফলক স্পর্শ করবে, যা সামগ্রিক আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যকে আরও গতিশীল করবে।

অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ও আমাদের প্রত্যাশা

পরিশেষে বলা যায়, প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ কেবল উৎসবের খরচেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ঈদের এই বিশেষ সময়ে রেমিট্যান্স বাংলাদেশ ২০২৬-এর যে ঐতিহাসিক চিত্র আমরা দেখলাম, তা ধরে রাখতে হলে প্রবাসীদের জন্য রেমিট্যান্সের বিপরীতে প্রণোদনা আরও বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একই সাথে ব্যাংকিং খাতের সেবার মান আরও উন্নত করতে হবে, যাতে প্রবাসীরা সবসময়ই বৈধ পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হন। তাহলেই দেশের রিজার্ভ ও ডলারের বাজারে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর