ছোলা–চিনিতে স্বস্তি, ভোজ্যতেলে শঙ্কা
ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে রোজা শুরু হওয়ার কথা। রোজার পণ্যের বেচাকেনার মৌসুম ঘনিয়ে এলেও বাজারে সব পণ্যের আমদানি সমানতালে বাড়েনি। ছোলা, মসুর ডাল ও চিনির আমদানি রোজার চাহিদার তুলনায় ভালো থাকলেও ভোজ্যতেল ও মটর ডালের আমদানি তুলনামূলক কম এখনো। এ পর্যন্ত খেজুরও এসেছে রোজার চাহিদার প্রায় এক–তৃতীয়াংশ।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাওয়া গত আড়াই মাসের (১ নভেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি) নিত্যপণ্য আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এ সময়ের মধ্যে সমুদ্র ও স্থলবন্দর দিয়ে যেসব পণ্য খালাস হয়েছে, তার বাইরে আমদানির পাইপলাইনেও রোজার পণ্য রয়েছে।
আমদানিকারকেরা বলছেন, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনে রোজার পণ্যের আমদানি আরও বাড়বে। এতে সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা অনেকটাই কেটে যেতে পারে। তবে শেষ মুহূর্তে বেশি আমদানি হলে পণ্য কারখানায় নেওয়া, প্রক্রিয়াজাত করা এবং বাজারে সরবরাহে চাপ বাড়বে। কারণ, রোজার আগে ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন যান চলাচল বন্ধ থাকবে। তার আগে নির্বাচনী প্রচারণাও চলবে। এ সময়ে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে বাজারে পণ্যের সংকট তৈরির শঙ্কা রয়েছে।
জানতে চাইলে শীর্ষ পর্যায়ের ভোগ্যপণ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, রোজার পণ্যের ঘাটতি হওয়ার কোনো শঙ্কা নেই। তবে আমদানি করা পণ্য কারখানায় নেওয়া এবং কারখানা থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য বাজারজাতের কার্যক্রম যাতে কোনোভাবে ব্যাহত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা দরকার। এটি নিশ্চিত করা গেলে বাজারে রোজার পণ্যের সরবরাহ ঠিক থাকবে।
নিত্যপণ্যের সরবরাহশৃঙ্খল ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি ও মজুত বিবেচনায় রেখে চাহিদা ও সরবরাহে সামঞ্জস্য আছে কি না, তা সরকারকে নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে।
মোস্তাফিজুর রহমান, সম্মাননীয় ফেলো, সিপিডি
কোন পণ্যের আমদানি কতটা
রোজায় ভোজ্যতেলের ব্যবহার স্বাভাবিকের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়ে। ট্যারিফ কমিশনের হিসাবে, রোজায় ভোজ্যতেলের চাহিদা থাকে প্রায় তিন লাখ টন। গত আড়াই মাসে প্রধান দুই ভোজ্যেতেল সয়াবিন ও পাম তেল আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৩৮ হাজার টন। গত রোজার আগের একই সময়ের তুলনায় আমদানি কমেছে ৫৬ হাজার টন।
তবে অপরিশোধিত তেল আমদানির পাশাপাশি সয়াবিন বীজ আমদানি করেও দেশে তেল উৎপাদন করে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান। অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম তেলের আমদানি গত বছরের রোজার সময়ের চেয়ে কিছুটা কমলেও সয়াবিন বীজের আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার টন। এতে বাড়তি ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন সয়াবিন তেল পাওয়া যাবে।
ভোজ্যতেলের শীর্ষ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান টি কে গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মোহাম্মদ মুস্তাফা হায়দার বলেন, এখনো ভোজ্যতেলের চাহিদা তুলনামূলক কম। আমদানি কিছুটা কম হলেও রোজায় বড় কোনো সংকট হবে না। কারণ, রোজার আগে তেল নিয়ে আরও জাহাজ বন্দরে ভিড়বে।
ভোজ্যতেলের মতো মটর ডালের আমদানিও কমেছে। গত আড়াই মাসে মটর ডাল আমদানি হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার টন, যা গতবারের একই সময়ের তুলনায় ১ লাখ ৬৮ হাজার টন কম।
অন্যদিকে রোজায় ছোলার চাহিদা থাকে প্রায় এক লাখ টন। গত নভেম্বর থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত রোজা সামনে রেখে দেশে ছোলা আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টন। গত রোজার আগের একই সময়ের তুলনায় আমদানি বেড়েছে প্রায় এক লাখ টন। স্বাভাবিক চাহিদা বাদ দিলেও ছোলার সরবরাহ বেশ স্বস্তিদায়ক।
মসুর ডালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। গত আড়াই মাসে ১ লাখ ৪৬ হাজার টন মসুর ডাল আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক লাখ টন বেশি।
চিনির চাহিদা রোজায় প্রায় তিন লাখ টন বলে ধারণা করা হয়। রোজা সামনে রেখে গত প্রায় তিন মাসে চিনি আমদানি হয়েছে পাঁচ লাখ টন। গত বছরের তুলনায় আমদানি বেড়েছে ২ লাখ ২৭ হাজার টন।
রোজার পণ্যের ঘাটতি হওয়ার কোনো শঙ্কা নেই। তবে আমদানি পণ্য কারখানায় নেওয়া এবং কারখানা থেকে প্রক্রিয়াজাত পণ্য বাজারজাতের কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সেটি নিশ্চিত করা দরকার।
মোস্তফা কামাল, চেয়ারম্যান, এমজিআই
রোজায় খেজুরের চাহিদা ৬০ হাজার টন। নভেম্বর থেকে গত ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত চাহিদার এক– তৃতীয়াংশ বা প্রায় ২১ হাজার টন খেজুর আমদানি হয়েছে। খেজুর প্রক্রিয়াজাত করতে হয় না। ফলে রোজার আগে শেষ মুহূর্তে আমদানি হলেও দ্রুত বাজারজাতের সুযোগ আছে।
জানতে চাইলে খাতুনগঞ্জের খেজুর আমদানিকারক ফারুক ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার ফারুক আহমেদ বলেন, রোজার আগে খেজুরের শুল্ক কমতে পারে—এমন আশায় আমদানির অপেক্ষায় ছিলেন ব্যবসায়ীরা। গত ডিসেম্বরে শুল্ক কমানোর পর আমদানি শুরু হয়েছে, যা রোজার আগেই বাজারজাত হবে। বিশ্ববাজারেও খেজুরের দাম স্থিতিশীল রয়েছে। ফলে খেজুর নিয়ে সংকট হওয়ার শঙ্কা খুব কম।
রোজায় ভোগ্যপণ্যের বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, রোজার আগে নির্বাচন ও প্রচারণা থাকায় নিত্যপণ্যের সরবরাহশৃঙ্খল ঠিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি ও মজুত বিবেচনায় রেখে চাহিদা ও সরবরাহের সামঞ্জস্য আছে কি না, তা সরকারকে নিয়মিত পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজনে এখন থেকেই নজরদারি ও তদারকি জোরদার করা দরকার, যাতে বাজারে পণ্যের অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ তৈরি না হয়।







