২৬শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ১২ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

/

সংযমের শেষেই আনন্দের প্রাপ্তি

সংযমের শেষেই আনন্দের প্রাপ্তি

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় পশ্চিম আকাশে এক ফালি রুপালি চাঁদ দেখা দিতেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে আনন্দের বার্তা। যেন প্রতিটি ঘরে ঘরে বেজে ওঠে সেই চিরচেনা সুর—‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’। এক মাসের সংযম, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির সাধনার পর আজ এসেছে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন, পবিত্র ঈদুল ফিতর।

সারা দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য ঈদুল ফিতর কেবল একটি উৎসব নয়; এটি এক গভীর তাৎপর্যময় দিন। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মানুষ নিজের ভেতরের অশুদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করে, আত্মসংযমের শিক্ষা নেয় এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় নিজেকে শুদ্ধ করে তোলে। এই এক মাসের অনুশীলনের পর ঈদের দিনটি যেন এক পুরস্কারের মতো এসে ধরা দেয়—আনন্দ, কৃতজ্ঞতা ও আত্মতৃপ্তির এক অপূর্ব মেলবন্ধন।

রমজান মাসজুড়ে মানুষ যে সংযম ও ত্যাগের শিক্ষা অর্জন করে, ঈদুল ফিতর সেই শিক্ষাকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার আহ্বান জানায়। দিনের পর দিন রোজা রেখে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করার মধ্য দিয়ে একজন মানুষ উপলব্ধি করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের দুঃখ-কষ্ট। এই উপলব্ধি তাকে আরও মানবিক করে তোলে, অন্যের প্রতি সহমর্মী হতে শেখায়। ঈদের দিনে ফিতরা আদায়ের মাধ্যমে সমাজের প্রত্যেকটি মানুষের মাঝে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার যে বিধান রয়েছে, তা ইসলামের সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক উজ্জ্বল নিদর্শন।

ঈদের আগের কয়েকটি দিন জুড়ে দেশের বিভিন্ন বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চঘাটে ছিল উপচে পড়া ভিড়। নগর জীবনের ব্যস্ততা ছেড়ে মানুষ ছুটেছে গ্রামের বাড়িতে, প্রিয়জনদের কাছে। গরম, যানজট, দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা—সবকিছু সহ্য করে তারা ফিরে গেছে আপন ঠিকানায়। সেই ক্লান্তি আজ আর অনুভূত হচ্ছে না; বরং প্রিয়জনের মুখ দেখার আনন্দে সব কষ্ট যেন মিলিয়ে গেছে। বাড়ির উঠান, শৈশবের স্মৃতি, মা-বাবার স্নেহমাখা মুখ আর ভাইবোনের হাসি-ঠাট্টা—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম আবেগে ভরে উঠেছে মন।

রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত সর্বত্র এখন উৎসবের আমেজ। ঈদের আগের দিন রাত পর্যন্ত বাজারগুলোতে ছিল ক্রেতাদের ভিড়। কেউ কিনছেন নতুন পোশাক, কেউ আতর, টুপি, আবার কেউ বা সেমাই, চিনি ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী। ঘরে ঘরে চলছে রান্নার প্রস্তুতি—সেমাই, পোলাও, কোরমা, ফিরনি ইত্যাদি নানা মুখরোচক খাবার তৈরির ব্যস্ততা। গৃহিণীরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত, যেন অতিথি আপ্যায়নে কোনো ত্রুটি না থাকে।

এদিকে তরুণ-তরুণীদের মধ্যেও ঈদের আনন্দের রেশ স্পষ্ট। বিউটি পারলারগুলোতে ছিল দীর্ঘ লাইন, রাত গভীর হলেও থামেনি সাজগোজের ধুম। হাতে মেহেদির নকশা আঁকার আয়োজনও ছিল বেশ জমজমাট। নানান নকশায় সেজে উঠেছে হাত, যা উৎসবের আনন্দকে আরও রঙিন করে তুলেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বসেছে ঈদমেলা, যেখানে শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস চোখে পড়ার মতো। খেলনা, মিষ্টি, বিভিন্ন সামগ্রী আর আনন্দঘন পরিবেশ—সব মিলিয়ে যেন এক অন্যরকম জগৎ।

ঈদের দিনটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঈদের নামাজ। সকালে নতুন পোশাক পরে মুসল্লিরা ছুটে যান ঈদগাহ বা মসজিদে। জাতীয় ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রধান জামাত, যেখানে হাজার হাজার মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে সবাই একে অপরকে কোলাকুলি করে ‘ঈদ মোবারক’ জানান। এই মুহূর্তটি ভ্রাতৃত্ব ও সম্প্রীতির এক অপূর্ব প্রতীক হয়ে ওঠে।

অনেকেই ঈদের দিন কবরস্থানে যান প্রিয়জনদের কবর জিয়ারত করতে। সেখানে গিয়ে তারা দোয়া করেন, আল্লাহর কাছে তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করেন। জীবনের এই ক্ষণস্থায়ী বাস্তবতা মানুষকে আরও নম্র ও বিনয়ী করে তোলে। কবরস্থান থেকে ফিরে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা—সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দময়।

ঈদ মানেই শুধু নিজে আনন্দ করা নয়, বরং সেই আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। সমাজের দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কথা এই দিনে বিশেষভাবে মনে রাখা প্রয়োজন। ফিতরা ও যাকাতের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানোর যে শিক্ষা ইসলাম দেয়, তা একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে ঈদের আনন্দ পূর্ণতা পায়।

বর্তমান সময়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে অনেক মানুষের জীবনযাপন কঠিন হয়ে উঠেছে। তবুও ঈদের আনন্দে তার প্রভাব তেমনভাবে পড়েনি। মানুষ সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও চেষ্টা করছে প্রিয়জনদের মুখে হাসি ফোটাতে। এই প্রচেষ্টাই প্রমাণ করে যে, ঈদের আসল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন এবং একটি শান্তিপূর্ণ, সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাদের এই আহ্বান আমাদের সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে। ঈদের এই আনন্দঘন মুহূর্তে আমাদের উচিত সব ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে এগিয়ে চলা।

কবি কাজী নজরুল ইসলামের সেই অমর বাণী আজও আমাদের অনুপ্রাণিত করে—নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত আনন্দ। ঈদুল ফিতর আমাদের শেখায়, কেবল নিজের জন্য নয়, বরং অন্যের জন্যও বাঁচতে হবে। ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে একটি সুন্দর সমাজ।

সবশেষে বলা যায়, ঈদুল ফিতর কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি মানবিক মূল্যবোধের পুনর্জাগরণের এক মহান উপলক্ষ। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ত্যাগ, সংযম ও ভালোবাসার মাধ্যমে জীবনকে আরও সুন্দর করা সম্ভব। সবার জীবনে এই ঈদ বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও কল্যাণ। ঈদ হোক আনন্দের, ঈদ হোক মানবতার।
ঈদ মোবারক।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর