
গত কয়েক বছরের ভয়াবহ বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সিলেট অঞ্চলকে প্লাবনের হাত থেকে রক্ষা করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে সিলেটের বিভিন্ন নদী রক্ষা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের তদারকি ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়েছে। মূলত সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় এখন মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান, যার প্রমাণ মিললো আজ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের আকস্মিক মাঠ পরিদর্শনে।
আজ সকালে প্রতিনিধি দলটি সিলেটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ‘বাসিয়া নদী পুনর্খনন ও তীর সংরক্ষণ প্রকল্প’ এর কাজের বাস্তব অগ্রগতি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই নদী খননের মূল কাজ শতভাগ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাসিয়া নদী প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা ও পরিদর্শন
সিলেট অঞ্চলের পানি নিষ্কাশন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাসিয়া নদী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে নদীটি নাব্যতা হারিয়েছিল, যার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতো। পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি দল আজ প্রকল্পের বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখেন এবং কাজের গতি নিয়ে পর্যালোচনা করেন। কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় সফল করতে হলে বাসিয়া নদীর খনন কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করতে হবে। কোনো ধরনের গাফিলতি বা অজুহাত বরদাশত করা হবে না।
বর্ষার আগেই কাজ শেষের কড়া আলটিমেটাম
সাধারণত মে ও জুন মাসের দিকে সিলেট অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিনরাত কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাউবোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হলো বর্ষা শুরু হওয়ার আগেই নদীর তলদেশের মাটি খনন সম্পন্ন করা।” মূলত সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় এর অংশ হিসেবেই এই কড়া আলটিমেটাম দেওয়া হয়েছে, যাতে আগামী বর্ষায় অতিরিক্ত পানির চাপ নদীটি সহজেই সহ্য করতে পারে।
প্লাবন এড়াতে তীর সংরক্ষণ কাজের গুরুত্ব
নদী খননের পাশাপাশি বাসিয়া নদীর দুই তীরের ভাঙন রোধে তীর সংরক্ষণ বা বাঁধ নির্মাণের কাজও সমান তালে চলছে। যেসব এলাকা ভাঙনপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত, সেখানে জিওব্যাগ ফেলা এবং সিসি ব্লক বসানোর কাজ দ্রুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীর তীর শক্ত না হলে খনন করে লাভ হবে না। প্রশাসনও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে। সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় এর তালিকায় তীর সংরক্ষণ কাজকে অন্যতম অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
আরো পড়ুনঃ নারীদের যাতায়াতে নতুন দিগন্ত
উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বিশেষ নির্দেশনা
আজকের পরিদর্শনে আসা প্রতিনিধি দলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়াতে এবং প্রয়োজনে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা শিফটে কাজ চালানোর তাগিদ দেন। কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন, সিলেটের মানুষের জানমাল রক্ষা আমাদের দায়িত্ব। আর তাই সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় এর এই মিশনকে সফল করতে মাঠ পর্যায়ে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
বিগত বন্যার শিক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা
বিগত বছরগুলোতে সিলেটের বন্যা পরিস্থিতি দেশের অন্যতম বড় দুর্যোগে রূপ নিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই এবার আগেভাগেই নদী পুনর্খননের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সুরমা, কুশিয়ারা ও বাসিয়ার মতো নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে আনাই বন্যা প্রতিরোধের একমাত্র উপায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার সরকারের পক্ষ থেকে সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় যেভাবে শুরু হয়েছে, তা সঠিক সময়ে শেষ হলে সিলেটবাসী আগামী মৌসুমে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবেন।
স্থানীয় জনগণের প্রতিক্রিয়া ও স্বস্তি
নদী খনন কাজ দ্রুত শেষ করার এই প্রশাসনিক কড়াকড়িতে স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। বাসিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা জানান, প্রতি বছর বন্যার ভয়ে তারা আতঙ্কে থাকেন। এবার যদি বর্ষার আগেই নদী খনন সম্পন্ন হয়, তবে প্লাবনের হাত থেকে ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি রক্ষা পাবে। সরকারের এই তৎপরতা এবং সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় দেখে তারা আশার আলো দেখছেন।
কৃষি ও মৎস্য খাতের সুরক্ষা
সিলেটের হাওরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি ও মৎস্য চাষ। আগাম বন্যা হলে বোরো ধান এবং মাছের খামারের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বাসিয়া নদী পুনর্খনন সফল হলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক থাকবে এবং আকস্মিক বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা কমে আসবে। মূলত গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতেই সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ গতি দেওয়া হচ্ছে।
নিয়মিত মনিটরিং ও জবাবদিহিতা
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, কাজের গুণগত মান বজায় রাখতে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে। এই দল সপ্তাহে অন্তত দুই দিন কাজের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে। কাজে কোনো ত্রুটি বা ধীরগতি পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সারসংক্ষেপে বলা যায়, সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে প্রশাসন শতভাগ কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সম্পূর্ণ রুখে দেওয়া সম্ভব না হলেও সঠিক প্রস্তুতি ও নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব। বাসিয়া নদী খনন প্রকল্পের এই দ্রুত বাস্তবায়ন সিলেটের সামগ্রিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার জন্য একটি মাইলফলক হতে যাচ্ছে। সিলেটে বন্যা রুখতে তোড়জোড় এর এই ধারা আগামী দিনগুলোতেও বজায় থাকবে এবং সিলেটবাসী একটি নিরাপদ ও বন্যা মুক্ত মৌসুম পার করতে পারবেন—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।







