
জীবিকার তাগিদে বনে গিয়ে আবারও সুন্দরবনে বাঘের মুখে জেলে পড়ার এক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে। আজ দুপুরে সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি নদী সংলগ্ন গহীন অরণ্যে কাঁকড়া ধরার সময় এক জেলে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের আক্রমণের শিকার হন। বাঘটি ওই জেলেকে টেনে জঙ্গলের ভেতরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তার সঙ্গীদের অসীম সাহসিকতা ও তীব্র প্রতিরোধে শেষ পর্যন্ত বাঘটি শিকার ছেড়ে পালিয়ে যায়।
গুরুতর আহত ও মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে আসা হয়। পরে অবস্থার চরম অবনতি হওয়ায় আজ রাতে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (খুমেক) স্থানান্তর করা হয়েছে।
বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আহত জেলের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি বনের ওই নির্দিষ্ট নিষিদ্ধ জোনে সাধারণের প্রবেশে সাময়িক সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সুন্দরবনে বাঘের মুখে জেলে আক্রান্ত হওয়ার এই ঘটনায় স্থানীয় উপকূলীয় জেলে পল্লীগুলোতে নতুন করে বাঘের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
যেভাবে ঘটেছিল বাঘের সেই ভয়ংকর আক্রমণ
আজ সাতক্ষীরা রেঞ্জের চুনকুড়ি নদীর তীরের একটি সরু খালের মধ্যে নৌকা রেখে জেলের দলটি কাদার মধ্যে নেমে কাঁকড়া ধরছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত জেলের সহকর্মীরা জানান, দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে বনের ঘন গোলপাতা ও গেওয়া ঝোপের আড়াল থেকে হঠাৎ একটি বিশাল আকৃতির রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার জেলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাঘটি মুহূর্তের মধ্যে তার ঘাড়ে ও পিঠে কামড়ে ধরে বনের গভীরে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করে। একদম চোখের সামনে সহকর্মীকে সুন্দরবনে বাঘের মুখে জেলে হিসেবে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে দেখে বাকি সঙ্গীরা স্তব্ধ না হয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
সঙ্গীদের অসীম সাহসিকতা ও বাঘের সাথে লড়াই
নৌকায় থাকা অন্য জেলেরা জানান, বাঘ যখন তাদের সঙ্গীকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন তারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে নৌকার বৈঠা, লাঠি এবং কাঁকড়া ধরার লোহার শিক নিয়ে বাঘটির দিকে তেড়ে যান। তারা সবাই মিলে একসাথে চিৎকার করতে থাকেন এবং লাঠি দিয়ে গাছের শিকড় ও নৌকার গায়ে জোরে জোরে আঘাত করে বিকট শব্দ তৈরি করেন। জেলেদের এমন সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং সাহসিকতার মুখে বাঘটি কিছুটা ভড়কে যায়। একপর্যায়ে সঙ্গীরা লাঠি দিয়ে বাঘের মুখে আঘাত করলে বাঘটি ওই জেলেকে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় ছেড়ে দিয়ে গভীর জঙ্গলে লম্ফ দিয়ে পালিয়ে যায়। মূলত সঙ্গীদের এই তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের কারণেই আজ সুন্দরবনে বাঘের মুখে জেলে পড়ার পরও নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে প্রাণ রক্ষা পেয়েছে।
শ্যামনগর হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা ও খুলনা মেডিকেলে স্থানান্তর
বাঘটি পালিয়ে যাওয়ার পর সঙ্গীরা রক্তাক্ত ও অচেতন অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দ্রুত নৌকায় তোলেন। চুনকুড়ি নদী থেকে লোকালয়ে পৌঁছাতে তাদের কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বিকেল ৫টার দিকে তাকে শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা দ্রুত তার ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করেন এবং স্যালাইন ও প্রয়োজনীয় ইনজেকশন দেন। তবে চিকিৎসকেরা জানান, বাঘের কামড়ে জেলের ঘাড়, পিঠ এবং পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে তার রক্তচাপ আশঙ্কাজনক স্তরে নেমে গেছে। শ্যামনগরে আইসিইউ বা উন্নত সার্জারি ব্যবস্থা না থাকায় আজ রাতে তাকে জরুরি ভিত্তিতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
সুন্দরবনের চুনকুড়ি নদী এলাকায় বাঘের আনাগোনা বৃদ্ধি
লোকালয়ের নিকটবর্তী এই চুনকুড়ি নদী ও তার আশপাশের খাড়িগুলোতে ইদানীং বাঘের পায়ের ছাপ এবং গর্জন প্রায়ই শোনা যাচ্ছিল বলে স্থানীয় বাওয়ালী ও মৌয়ালরা জানিয়েছেন। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মের এই সময়ে বনের মিষ্টি পানির পুকুর বা খাড়িগুলোর আশেপাশে বাঘের বিচরণ বাড়ে। জেলেরা যখন নদীর পাড়ে কাঁকড়া ধরার জন্য মনোযোগ দেন, তখন বাঘ তাদের সহজ শিকার হিসেবে টার্গেট করে। আজকের ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, অসতর্ক অবস্থায় বনের খালের ভেতরে যাওয়া কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। সুন্দরবনে বাঘের মুখে জেলে আক্রান্ত হওয়ার খবরটি পাওয়ার পর থেকেই বন বিভাগের টহল দল ওই এলাকায় নজরদারি বাড়িয়েছে।
আরো পড়ুনঃ আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক
বৈধ পাস নিয়ে বিবৃতি ও বন বিভাগের বক্তব্য
সাতক্ষীরা রেঞ্জের বুড়িগোয়ালিনী বন স্টেশন কর্মকর্তা জানান, আহত জেলের দলটির সুন্দরবনে প্রবেশের বৈধ পাস বা পারমিট ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সুন্দরবনে বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়া জেলের চিকিৎসার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। বন বিভাগ সর্বদা জেলেদের বনের ভেতরে দলবদ্ধভাবে থাকার এবং বনে প্রবেশের সময় বিশেষ সতর্কতামূলক ঘণ্টা বা লাঠি সাথে রাখার পরামর্শ দিয়ে থাকে। বন কর্মকর্তা আরও বলেন, “সুন্দরবনে বাঘের মুখে জেলে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা বনের ভেতরের টহল দলগুলোকে নির্দেশ দিয়েছি যাতে চুনকুড়ি নদীর ওই অংশে অন্য কোনো জেলে নৌকা এই মুহূর্তে প্রবেশ না করে।”
উপকূলীয় জেলে পল্লীতে শোক ও আতঙ্কের ছায়া
মুন্সিগঞ্জ ও বুড়িগোয়ালিনী এলাকার জেলে পল্লীর বাসিন্দাদের আয়ের প্রধান উৎসই হলো সুন্দরবনের মাছ, কাঁকড়া ও মধু সংগ্রহ করা। পেটের তাগিদে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে বাঘ ও কুমিরের সাথে লড়াই করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। আজকের এই ঘটনার পর জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে এক ধরনের চাপা কান্না ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। স্থানীয় প্রবীণ জেলেরা জানান, বনের বাঘ যখন একবার মানুষের রক্তের স্বাদ পেয়ে যায় বা মানুষকে আক্রমণ করে, তখন সেই বাঘটি ওই নির্দিষ্ট এলাকায় আরও বেশি হিংস্র হয়ে ওঠে। ফলে আগামী দিনগুলোতে চুনকুড়ি নদী এলাকায় মাছ ও কাঁকড়া ধরতে যাওয়া চরম ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
সুন্দরবনের বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব ও স্থায়ী সমাধানের তাগিদ
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বাঘ ও মানুষের এই দ্বন্দ্ব বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। কখনো বাঘ লোকালয়ে চলে আসে, আবার কখনো জীবিকার তাগিদে বনে গিয়ে মানুষ বাঘের আক্রমণের শিকার হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলেদের আধুনিক ট্র্যাকিং ডিভাইস, বনের ভেতরে বাঘের গতিবিধি জানার জন্য রেডিও কলারের ব্যবহার বাড়ানো এবং জেলেদের বিশেষ বীমার আওতায় আনা জরুরি। আজ যদি সঙ্গীরা সাহসিকতার পরিচয় না দিতেন, তবে হয়তো এই জেলের মরদেহও উদ্ধার করা সম্ভব হতো না। সুন্দরবনে বাঘের মুখে জেলে নিখোঁজ বা নিহত হওয়ার তালিকায় আরও একটি নাম যুক্ত হতো।
উপকূলীয় পরিবারগুলোর নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণ দাবি
সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার সাধারণ মানুষের দাবি, প্রতিবার যখন সুন্দরবনে বাঘের মুখে জেলে বা অন্য কোনো শ্রমজীবী মানুষ আক্রমণের শিকার হন, তখন তাদের পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। চিকিৎসার পেছনেই তাদের শেষ সম্বলটুকু শেষ হয়ে যায়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছেন, আহত জেলেদের সম্পূর্ণ বিনামূল্যে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি বনের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারগুলোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী রেশন বা বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হোক। কারণ, যথাযথ আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে পেটের তাগিদে বারবার মানুষকে এভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনের গভীরে প্রবেশ করতেই হবে।
সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যতটা আকর্ষণীয়, এর ভেতরের জীবনসংগ্রাম ততটাই নিষ্ঠুর ও ভয়ংকর। চুনকুড়ি নদীতে বাঘের মুখ থেকে ফিরে আসা এই জেলের জীবন এখন খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকদের হাত এবং সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারদের রক্ষা করতে বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব নিরসনে সরকারকে আরও দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা আশা করি, আহত এই কঠোর পরিশ্রমী জেলে দ্রুত সুস্থ হয়ে তার পরিবারের মাঝে ফিরে আসবেন।







