২৫শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ১১ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

/

স্মার্ট অভিভাবকেরা কেন শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করেন

স্মার্ট অভিভাবকেরা কেন শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করেন

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

কোনো কোনো অভিভাবক মনে করেন, শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করা ঝামেলার। তাঁরা ভাবেন, শিশু যখন বড় হবে, তখন সঙ্গে নেওয়া যাবে; এখন ওর এসবের কোনো স্মৃতি থাকবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শৈশবের স্মৃতিই মানুষের জীবনে সবচেয়ে সংবেদনশীল ও গভীর ছাপ ফেলে। শিশু হয়তো জায়গার নাম, হোটেলের নাম বা ভ্রমণের তারিখ মনে রাখবে না; কিন্তু মনে রাখবে অনুভূতিগুলো। ভ্রমণ তাই শুধু বেড়ানো নয়; এটি শিশুর মানসিক বিকাশ, সামাজিক বোঝাপড়া ও বাস্তব জীবনের প্রস্তুতির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। চলুন জেনে নিই কেন শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করা উচিত।

১. পারিবারিক ভ্রমণ স্মৃতি তৈরি করার সেরা উপায়

ধরা যাক, একটি পরিবার শিশুকে নিয়ে কক্সবাজার, সিলেট বা বিদেশে ঘুরতে গেল। শিশুটি হয়তো জায়গার নাম মনে রাখবে না, কিন্তু মনে থাকবে বাবার কাঁধে চড়ে নতুন দৃশ্য দেখার কথা, মা–বাবার সঙ্গে বিশেষ কোনো খাবার খাওয়ার কথা, কোনো এক বিশেষ মুহূর্তের কথা, যেটা আপনি ভুলে গেলেও শিশুর মনে থেকে যায়। অনেক অভিভাবকই শিশুদের ঘুরতে নিয়ে যাওয়াকে ততটা গুরুত্ব দেন না।

অথচ ভ্রমণ হলো অভিজ্ঞতা উপহার দেওয়ার মতো, যার মূল্য সময়ের সঙ্গে আরও বাড়ে। ভ্রমণ মানে শুধু ঘোরাঘুরি নয়; এটি সন্তানের সঙ্গে গভীর বন্ধন গড়ে তোলে এবং ভবিষ্যতের জন্য স্মৃতি তৈরি করে।

২. পরিস্থিতি সামলাতে শেখা

লম্বা ফ্লাইট হোক বা দীর্ঘ বাসযাত্রা, শিশুদের সঙ্গে ভ্রমণ কখনোই সহজ কাজ নয়। পথে কী খাওয়াবেন, কীভাবে তাদের ব্যস্ত রাখবেন, ব্যাকপ্যাকে কতটা জিনিস নেবেন, ভ্রমণের সময় পটি ট্রেনিং কীভাবে সামলাবেন—এসব ভাবনাই অনেক সময় চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে কেউ কেউ বলেন, ‘এখন না, ওরা একটু বড় হলে ভ্রমণে নিয়ে যাব।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রথমবারটাই সবচেয়ে কঠিন। কারণ, তখন আপনি জানেন না কী কাজ করবে এবং কী করবে না। একবার সেই অজানা ভয় কাটিয়ে উঠতে পারলেই ধীরে ধীরে আপনি শিখে ফেলেন, কোথায় ধৈর্য ধরতে হয়, কোথায় পরিকল্পনা বদলাতে হয়, আর কখন শুধু পরিস্থিতিটিকে মেনে নিতে হয়। শুরুতে শিশুরা বিরক্ত হয়, কান্নাকাটি করে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তারাও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখে।

শিশুদের সঙ্গে ভ্রমণ মানে নিখুঁত সফর নয়। এটি মূলত একধরনের পরিস্থিতি সামলানোর পাঠ। এই অভিজ্ঞতাগুলোই ধীরে ধীরে আপনাকে আরও সচেতন, আত্মবিশ্বাসী ও বাস্তববাদী অভিভাবক হিসেবে গড়ে তোলে।

শিশুদের সঙ্গে ভ্রমণ কখনোই সহজ কাজ নয়

৩. বাস্তব জীবনের প্রস্তুতি

ভ্রমণের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, ভ্রমণে মা-বাবা কিংবা সন্তান—কেউই কাউকে কিছু শেখায় না, সবাই একসঙ্গে শেখে পৃথিবী সম্পর্কে। ছোটবেলা থেকেই সন্তানেরা বাস্তব পৃথিবীর পাঠ পায়। ভিন্ন জায়গায় মানুষ কেমন আচরণ করে, জনসমক্ষে কীভাবে নম্র ও নিরাপদ থাকতে হয়, অপরিচিত পরিবেশে কীভাবে নিজেকে সামলাতে হয়।


এসব শিক্ষা কোনো বই বা কোচিংয়ে পাওয়া যায় না। আমরা প্রায়ই শিশুদের ঘরে আটকে রাখতে চাই নিরাপত্তার কথা ভেবে। কিন্তু ভ্রমণ তাদের শেখায় দায়িত্ববোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। ভ্রমণের সময় তারা জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্য লিখে রাখে, ছবি আঁকে, হাজারো প্রশ্ন করে। কে কার সঙ্গে কীভাবে কথা বলছে, তা খেয়াল করে, নিজে নিজে ব্যাকপ্যাক গোছায়, তা শিখে নেয়।

এসব কেউ আলাদাভাবে শেখায় না, পরিবেশই তাদের শিক্ষক হয়ে ওঠে। ছোট শিশুদের সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করাটা তাই শুধু বেড়ানো নয়; এটি বাস্তব জীবনের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

মালপত্র গোছানোর সময় শিশুকে নিজের জিনিস বেছে নিতে দিলে তার কৌতূহল বাড়ে

৪. ভ্রমণ শিশুদের শেখায় সহমর্মিতা ও বোঝাপড়া

ভ্রমণের সময় শিশুরা নিজ চোখে দেখে, পৃথিবীর জীবনযাপন একরকম নয়। কোনো জায়গার মানুষ দরিদ্র, কোনো জায়গার মানুষ ধনী; কেউ কেউ মিথ্যা বলছে বা প্রতারণা করছে, আবার কোথাও কেউ কেউ খুব সহমর্মী। ভ্রমণের সময় তারা দেখে বিভিন্ন অঞ্চলের জীবিকা ও দৈনন্দিন অভ্যাসও ভিন্ন। কোনো ছোট শহরে সবাই একে অপরকে চেনে, কথা বলে, আবার কোথাও মানুষ নিয়মমাফিক বা যান্ত্রিক জীবন যাপন করে।

শিশুরা এটাও দেখে যে কোথাও ভাত-ডালই বেঁচে থাকার অবলম্বন, আবার কোথাও পিৎজা, নানরুটি বা অন্য খাবার খায় বেশি। এসব বাস্তব দৃশ্য দেখে শিশুরা শেখে, ভিন্ন পরিবেশে মানুষের অভ্যাস, কাজ ও আনন্দের ধরনও আলাদা হয়। ভিন্নতাই পৃথিবীকে বৈচিত্র্যময় করে তোলে। ভিন্নতা মানে খারাপ নয়; ভিন্নতা মানে আলাদা, কিন্তু এর মূল্যবান বাস্তবতা রয়েছে। ভ্রমণ শিশুদের চোখে পৃথিবীর সত্যিকারের ছবি তুলে ধরে।

ভ্রমণের মাধ্যমে শিশুকে পরিচয় করানো হয় নতুন সংস্কৃতি, নতুন স্বাদ এবং নানা অভিজ্ঞতার।

৫. ভ্রমণ শিশুদের নতুন খাবার খেতে শেখায়

শিশুরা শেখে ভিন্ন স্বাদ বা নতুন খাবার মানেই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারা আরও খোলামেলা ও সাহসী হয় নতুন অভিজ্ঞতার জন্য। এভাবেই শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ মানে শুধু ঘুরে বেড়ানো নয়; এর মাধ্যমে শিশুকে পরিচয় করানো হয় নতুন সংস্কৃতি, নতুন স্বাদ এবং নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে। সে কারণেই শিশুদের নিয়ে ভ্রমণে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

যাঁর যাঁর সামর্থ্য অনুযায়ী শিশুদের সঙ্গে ভ্রমণে বের হওয়াই স্মার্ট অভিভাবকের একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। কারণ, শিশুদের ভেতরে খোলামেলা মন ও নম্রতা গড়ে তোলা সহজ কাজ নয়, কিন্তু ভ্রমণ সেই কাজ সহজ করে তোলে।

৬. আত্মবিশ্বাসী ও কৌতূহলী করে

ভ্রমণ শিশুদের আত্মবিশ্বাসী, কৌতূহলী ও স্বনির্ভর হতে শেখায়। নতুন কোনো জায়গা দেখা, ভিন্ন পরিবেশে চলাফেরা করা, বাস বা ট্রেনে ওঠার মতো ছোট ছোট অভিজ্ঞতা শিশুকে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে এবং অজানা বিষয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শেখায়। বিমানবন্দর বা বাসের টিকিট কাটার লাইনে অপেক্ষার মতো ঘটনা শিশুকে ধৈর্যশীল হতে সাহায্য করে।

ভ্রমণ শিশুদের আত্মবিশ্বাসী, কৌতূহলী ও স্বনির্ভর হতে শেখায়

শিশু বাইরে ঘুরতে বের হলে রাস্তায় যানজট, ভিড় বা নতুন পরিবেশের সঙ্গে পরিচিত হয়—এসব তার অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। এসব পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া শিশুর মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায়।

তাই অভিভাবকেরা ভ্রমণের আগে শিশুকে ভ্রমণস্থানের ছবি দেখাতে পারেন, সেই জায়গা সম্পর্কে ছোট গল্প বলতে পারেন। মালপত্র গোছানোর সময় শিশুকে নিজের জিনিস বেছে নিতে দিলে তার কৌতূহল বাড়ে এবং নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর