২৬শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ১২ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

/

মার্কিন বাহিনীর অবস্থান জানাতে ইরানকে সহায়তা করছে রাশিয়া: ওয়াশিংটন পোস্ট

মার্কিন বাহিনীর অবস্থান জানাতে ইরানকে সহায়তা করছে রাশিয়া: ওয়াশিংটন পোস্ট

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

চলমান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন থাকা মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে রাশিয়া—এমন দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। গোয়েন্দা কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত তিনজন কর্মকর্তার বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ এই সংঘাতে পরোক্ষভাবে জড়িত কি না—এবারই প্রথম সে ধরনের ইঙ্গিত মিলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এ তথ্য সত্য হয়ে থাকে, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও জটিল ও আন্তর্জাতিক মাত্রায় বিস্তৃত করে তুলতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রাশিয়া ইরানকে বিভিন্ন ধরনের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, যুদ্ধবিমান এবং বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে বলে কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় ওই তিন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ তথ্য দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে মনে হচ্ছে এটি বিচ্ছিন্ন কোনো পদক্ষেপ নয়; বরং একটি সমন্বিত প্রচেষ্টা। তাঁর ভাষায়, “ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে পরিকল্পিতভাবে তথ্য আদান–প্রদান করা হচ্ছে, যা ইরানের সামরিক কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করতে পারে।”

এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে ওয়াশিংটনে অবস্থিত রাশিয়ার দূতাবাস কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে রাশিয়ার সরকার ইতিমধ্যে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে এবং সংঘাতকে ‘বিনা উসকানিতে সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে উল্লেখ করেছে। মস্কোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই সংঘাত দ্রুত থামানো না হলে তা পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

তবে ইরানকে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে রাশিয়ার সহায়তার মাত্রা ঠিক কতটা বিস্তৃত, তা এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মতে, যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ পার হওয়ার আগেই ইরানের সামরিক বাহিনী মার্কিন বাহিনীর অবস্থান শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভুলতা দেখাতে শুরু করেছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, বাহ্যিক কোনো গোয়েন্দা সহায়তা তাদের হাতে পৌঁছাতে পারে।

রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা নিয়ে গবেষণা করা কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশেষজ্ঞ দারা ম্যাসিকট বলেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় ইরান অত্যন্ত নির্ভুলভাবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। তাঁর মতে, ইরান আগাম সতর্কবার্তা প্রদানকারী ‘ওভার-দ্য-হরাইজন’ রাডারগুলোতে খুবই নির্দিষ্টভাবে হামলা চালাচ্ছে। এই ধরনের রাডার শত্রুপক্ষের দূরবর্তী বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করতে ব্যবহৃত হয়। ম্যাসিকট বলেন, “ইরান পরিকল্পিতভাবে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করছে। এই ধরনের হামলা চালাতে হলে সাধারণত খুব সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন হয়।”

চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে উভয় পক্ষেরই উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত রোববার কুয়েতে ইরানের ড্রোন হামলায় ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হন এবং আরও কয়েকজন আহত হন। এই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে বলে জানা গেছে।

এ পর্যন্ত ইরান মার্কিন সামরিক অবস্থান, দূতাবাস এবং কিছু বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে কয়েক হাজার আত্মঘাতী ড্রোন এবং কয়েক শত ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলার লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, নৌঘাঁটি, সামরিক গুদাম এবং ইরানের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা।

ইরানকে রাশিয়ার সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য না করলেও হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলেছেন, বর্তমানে ইরান সামরিকভাবে কঠিন পরিস্থিতির মুখে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সক্ষমতা প্রতিদিন কমছে এবং তাদের নৌবাহিনী ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে দেশটির অস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতাও উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

কেলি আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রক্সি গোষ্ঠীও আগের মতো শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছে না। এর ফলে আঞ্চলিক পর্যায়ে তাদের প্রভাব কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন মনে করছে।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। সাধারণত সংবেদনশীল গোয়েন্দা তথ্যের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রশাসন সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকে।

চলতি সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে রাশিয়া ও চীনের উদ্দেশে কোনো বার্তা দিতে চান কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, তাঁর দেওয়ার মতো বিশেষ কোনো বার্তা নেই। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা বড় কোনো প্রভাবক নয় বলেই যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত থেকে কিছু সম্ভাব্য সুবিধা দেখতে পারে রাশিয়া। এর মধ্যে অন্যতম হলো জ্বালানি বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়া, যা রাশিয়ার তেল রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হলে ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মনোযোগ কিছুটা সরে যেতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

রুশ সহায়তা সম্পর্কে অবগত দুই কর্মকর্তা জানান, ইরানের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও বেইজিং এখন পর্যন্ত ইরানকে সামরিক প্রতিরক্ষায় সরাসরি সহায়তা করছে—এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। যদিও চীন কূটনৈতিকভাবে সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে।

ওয়াশিংটনে অবস্থিত চীনের দূতাবাস এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে আন্তর্জাতিক মহলের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যদি বড় শক্তিগুলো সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং পুরো অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর