৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

কিশোর অপরাধ রুখতে নতুন উদ্যোগ: মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা ঝুঁকি কমাতে সরকারের বিশেষ কর্মসূচি

কিশোর অপরাধ রুখতে নতুন উদ্যোগ: মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা ঝুঁকি কমাতে সরকারের বিশেষ কর্মসূচি

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা

 

কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা
কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা

দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে এবং তাদের মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করতে সরকার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাং কালচার, সহিংসতা এবং আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়া কিশোর আত্মহত্যার হার কমাতে ‘জাতীয় কিশোর সুরক্ষা ও মানসিক বিকাশ কর্মসূচি’ চালু করা হয়েছে। এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য হলো কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তোলা।

কিশোর অপরাধ ও মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র

সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বেশিরভাগ কিশোর অপরাধের মূলে থাকে পারিবারিক কলহ, একাকীত্ব এবং সঠিক মানসিক নির্দেশনার অভাব। কিশোর বয়সে হরমোনজনিত পরিবর্তন এবং পারিপার্শ্বিক চাপের কারণে অনেক সময় তারা আবেগতাড়িত হয়ে ভুল পথে পা বাড়ায়। সরকারের নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কিশোরদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শ কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে।

আত্মহত্যা ঝুঁকি কমাতে কাউন্সেলিং সেবা

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। এর পেছনে সাইবার বুলিং, একাডেমিক চাপ এবং বিষণ্নতাকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নতুন কর্মসূচির অধীনে একটি ২৪/৭ টোল-ফ্রি হেল্পলাইন চালু করা হচ্ছে, যেখানে কিশোররা পরিচয় গোপন রেখে পেশাদার সাইকোলজিস্টদের সাথে কথা বলতে পারবে। কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা নিশ্চিতে এটি একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করবে।

কিশোর সংশোধন কেন্দ্রের আধুনিকায়ন

সরকার কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র বা সংশোধন কেন্দ্রগুলোকে জেলখানার পরিবর্তে ‘উন্মুক্ত শিখন কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছে। এখানে অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের শুধু শাস্তি নয়, বরং কারিগরি শিক্ষা এবং নিয়মিত থেরাপির মাধ্যমে সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। তাদের মানসিক ক্ষত নিরাময় করাই হবে এই কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য।

ডিজিটাল আসক্তি ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ

অনলাইন জগতে কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন নীতিমালায় সাইবার সিকিউরিটি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। স্কুল-কলেজগুলোতে নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করা হবে যাতে কিশোররা সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে কীভাবে তা মোকাবিলা করতে হয় এবং ইন্টারনেটের নিরাপদ ব্যবহার শিখতে পারে।

পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা

কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়। নতুন কর্মসূচিতে অভিভাবক এবং শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। সন্তানদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ এবং তাদের আচরণের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করার বিষয়ে অভিভাবকদের সচেতন করা হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে একজন করে ‘মেন্টাল হেলথ গাইড’ বা কাউন্সিলর নিয়োগের প্রস্তাব করা হয়েছে।

আরো পড়ুনঃ নিউজিল্যান্ডকে পাত্তাই দিলো না বাংলাদেশ: সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে দাপুটে জয়

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি

কিশোরদের অপরাধমূলক চিন্তা থেকে দূরে রাখতে সরকার প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠ সংস্কার এবং সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে। অলস মস্তিষ্ক এবং অতিরিক্ত মোবাইল আসক্তি কিশোরদের বিপথগামী করে। তাই পাড়ায় পাড়ায় নিয়মিত খেলাধুলা এবং সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আয়োজন করার মাধ্যমে তাদের শক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে।

ড্রাগ বা মাদকাসক্তি প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি

কিশোর অপরাধের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মাদক। নতুন কর্মসূচিতে স্কুল-কলেজ সংলগ্ন এলাকাগুলোকে ‘ড্রাগ ফ্রি জোন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। কিশোররা যাতে কোনোভাবেই মাদকের সংস্পর্শে আসতে না পারে, সেজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিশেষ টহল এবং ডোপ টেস্টের মতো কড়াকড়ি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

কমিউনিটি পুলিশিং ও স্থানীয় তদারকি

কিশোর গ্যাং কালচার রুখতে প্রতিটি এলাকায় ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি, শিক্ষক এবং মসজিদের ইমামদের নিয়ে একটি তদারকি কমিটি গঠন করা হবে। কোনো কিশোর যদি অস্বাভাবিক আচরণ করে বা অপরাধের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে শুরুতেই তাকে চিহ্নিত করে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনাই হবে এই কমিটির কাজ।

মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা ও সচেতনতামূলক প্রচার

সরকার টেলিভিশন, রেডিও এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নিয়মিত সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন বা শর্ট ফিল্ম প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে কিশোরদের কাছে অপরাধের কুফল এবং মানসিক স্বাস্থ্যের গুরুত্ব তুলে ধরা হবে। কিশোররা যেন তথাকথিত ‘গ্যাং কালচার’ বা নেতিবাচক হিরোইজম দ্বারা প্রভাবিত না হয়, সেজন্য ইতিবাচক রোল মডেলদের গল্প বেশি করে প্রচার করা হবে।

কর্মমুখী শিক্ষা ও ইন্টার্নশিপের সুযোগ

যেসব কিশোর পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়েছে বা কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশায় ভুগছে, তাদের জন্য বিশেষ কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সরকারের নতুন নীতিমালায় তাদের জন্য স্বল্পমেয়াদী ইন্টার্নশিপ বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজের সুযোগ তৈরি করা হবে, যাতে আর্থিক অভাব তাদের অপরাধের দিকে ঠেলে না দেয়।

স্থানীয় পর্যায়ে কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা সচেতনতা

গ্রাম থেকে শহর—সর্বস্তরে কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্থানীয় ক্লাব এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। অনেক সময় দেখা যায়, সঠিক তদারকির অভাবে কিশোররা গ্যাং কালচারের দিকে ধাবিত হয়। এই নতুন কর্মসূচির আওতায় পাড়ায় পাড়ায় সচেতনতামূলক সভা করা হবে, যেখানে অভিভাবকদের জানানো হবে কীভাবে তারা তাদের সন্তানদের ওপর নজর রাখবেন। কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা বিষয়ে এই তৃণমূল পর্যায়ের কাজগুলোই দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম।

কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা নিশ্চিতে আইনি সংস্কার

সরকার বিদ্যমান শিশু আইন সংশোধন করে কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা বলয়কে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এতে লঘু অপরাধের ক্ষেত্রে কিশোরদের সরাসরি হাজতে না পাঠিয়ে বাধ্যতামূলক সমাজসেবা বা সংশোধনমূলক কোর্সে পাঠানোর বিধান রাখা হচ্ছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো কিশোরদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত না করে তাদের চারিত্রিক পরিবর্তন আনা। আইনের সঠিক প্রয়োগ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটিয়েই কিশোর অপরাধ ও সুরক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

 

পরিশেষে, কিশোররা আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাদের ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনা এবং মানসিক অস্থিরতা দূর করা একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনের জন্য অপরিহার্য। সরকারের এই নতুন কর্মসূচি যদি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে দেশে কিশোর অপরাধের হার যেমন কমবে, তেমনি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলোও অনেকাংশে কমে আসবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর