৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

মেঘালয়ে ভারী বর্ষণ: সুরমা-কুশিয়ারা ও খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধিতে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা

মেঘালয়ে ভারী বর্ষণ: সুরমা-কুশিয়ারা ও খোয়াই নদীর পানি বৃদ্ধিতে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা

 

সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা
সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা

ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে গত কয়েক দিনের টানা ভারী বৃষ্টির ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ফের বন্যার পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। উজানের পাহাড়ি ঢল হু হু করে নেমে আসায় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার নদ-নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশের প্রধান প্রধান নদী সুরমা, কুশিয়ারা ও খোয়াই নদীর পানি অনেক পয়েন্টে বিপৎসীমার একদম কাছাকাছি অবস্থান করছে। ফলে হাওর ও নিম্নাঞ্চলের মানুষের মধ্যে সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা নতুন করে তৈরি হয়েছে।

উজানের ঢল ও নদ-নদীর বর্তমান অবস্থা

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাত হওয়ায় সেই পানি পাহাড়ি ঢল হয়ে বাংলাদেশের নদ-নদীতে আছড়ে পড়ছে। সিলেটের কানাইঘাট পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি এবং ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমা স্পর্শ করার উপক্রম হয়েছে। এছাড়া হবিগঞ্জের খোয়াই নদীর পানিও দ্রুত বাড়ছে। সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা দেখা দেওয়ায় পাউবো (পাউবো) কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে বাঁধগুলোকে।

দ্রুত ফসল কাটার পরামর্শ কৃষি অধিদপ্তরের

বন্যার আশঙ্কায় সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওর অঞ্চলের কৃষকরা। মাঠে আধাপাকা বোরো ধান নিয়ে বিপাকে তারা। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে মাইকিং করে কৃষকদের দ্রুত ফসল কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যদি পানি আরও বাড়ে তবে নিম্নাঞ্চলের ধান তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই অন্তত ৮০ শতাংশ পেকেছে এমন ধান দ্রুত কেটে ঘরে তোলার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে।

জনমনে আতঙ্ক ও আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুতি

২০২২ সালের ভয়াবহ স্মৃতি এখনো সিলেটবাসীর মন থেকে মুছে যায়নি। তাই এবারের সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন ইতিমধ্যে বন্যাকবলিত হতে পারে এমন এলাকাগুলো চিহ্নিত করেছে। প্রতিটি উপজেলায় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (Control Room) খোলার পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত রাখা হচ্ছে।

জলাবদ্ধতা ও গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ

টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পানিতে সিলেটের নিম্নাঞ্চলের অনেক গ্রামীণ রাস্তাঘাট ইতিমধ্যে ডুবে গেছে। কোনো কোনো জায়গায় কালভার্ট উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে সাধারণ মানুষের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। ছোট ছোট হাওরগুলো পানিতে টইটুম্বর হয়ে যাওয়ায় মাছ চাষিরাও তাদের ঘের রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস

আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টা মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জি অঞ্চলে বৃষ্টির তীব্রতা আরও বাড়তে পারে। সেক্ষেত্রে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করা কেবল সময়ের ব্যাপার। সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা তাই কেবল অনুমান নয়, বরং একটি আসন্ন বাস্তবতায় রূপ নিতে যাচ্ছে।

আরো পড়ুনঃ যমজ দুই ভাইয়ের একসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্য

পাউবো’র সতর্কবার্তা ও বাঁধের ঝুঁকি

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, সুরমা ও কুশিয়ারার ডাইক বা নদীর বাঁধগুলোর বেশ কয়েকটি পয়েন্ট অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পানির চাপ বাড়লে এসব দুর্বল বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা আছে। স্থানীয় প্রশাসন থেকে স্বেচ্ছাসেবকদের সাথে নিয়ে ঝুকিপূর্ণ বাঁধগুলোতে বালুর বস্তা ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা মোকাবিলায় পাউবো সার্বক্ষণিক নজরদারি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রেখেছে।

গবাদি পশু ও পশুখাদ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা

বন্যার পানি হাওর ও চারণভূমি তলিয়ে দিলে গবাদি পশুর খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করবে। বিগত বন্যাগুলোর অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মানুষের আশ্রয়ের পাশাপাশি পশুখাদ্য জোগাড় করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। প্রাণীসম্পদ অধিদপ্তর থেকে কৃষকদের খড় ও শুকনো ঘাস উঁচুতে মাচা তৈরি করে সংরক্ষণ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কার মাঝে খামারিরা এখন থেকেই গবাদি পশুকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন।

সুপেয় পানির সংকট ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি

বন্যা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই টিউবওয়েল বা নলকূপের মাথা পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ফলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে বন্যাকবলিত হতে পারে এমন এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট এবং জরুরি স্যানিটেশন কিট মজুত রাখা হয়েছে। বন্যার নোংরা পানি থেকে ডায়রিয়া বা চর্মরোগের মতো পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে, তাই স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বিভ্রাট

ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সাব-স্টেশনগুলোতে পানি ঢুকে পড়লে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হতে পারে। বিদ্যুতের অভাবে মোবাইল টাওয়ারগুলো অকেজো হয়ে পড়লে দুর্গম অঞ্চলের মানুষের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সিলেটে বন্যা পরিস্থিতির শঙ্কা মোকাবিলায় বিদ্যুৎ বিভাগ ও টেলিকম অপারেটরদের বিশেষ টেকনিক্যাল টিম প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে, যাতে জরুরি যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল থাকে।

পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াতে নিষেধাজ্ঞা

সিলেটের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র যেমন জাফলং, বিছানাকান্দি এবং ভোলাগঞ্জের জিরো পয়েন্টগুলো সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় সেখানে ঢলের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। নিরাপত্তার খাতিরে এসব পর্যটন কেন্দ্রে পর্যটকদের ভ্রমণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারে স্থানীয় প্রশাসন। পাহাড়ি ঢলের স্রোত অত্যন্ত প্রবল হওয়ায় নদীর পাড়ে বা নৌকা ভ্রমণে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে।

 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির কোনো বিকল্প নেই। স্থানীয় প্রশাসন ও স্বেচ্ছাসেবক সংগঠনগুলোকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের বাসিন্দাদের গবাদি পশু ও শুকনো খাবার নিরাপদে রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। আমরা আশা করি, সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর