
দেশের উচ্চশিক্ষা স্তরে প্রবেশ করতে গিয়ে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী যে চরম ভোগান্তির শিকার হন, তার অবসানে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা আলাদা ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের সময়, অর্থ ও শারীরিক শ্রমের যে অপচয় ঘটে, তা রোধ করতে ‘এক দেশ, এক পরীক্ষা’ মডেল বাস্তবায়নের আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ—এই শিরোনামটি এখন দেশের কোটি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দীর্ঘদিনের ভর্তি ভোগান্তি ও বর্তমান প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে বর্তমানে অর্ধশতাধিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার তারিখ আলাদা হওয়ায় শিক্ষার্থীদের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে রাজশাহী কিংবা খুলনা—এভাবে সারা দেশ চষে বেড়াতে হয়। বাসের টিকিট না পাওয়া, থাকার জায়গার অভাব এবং মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি এই ভোগান্তিকে আরও চরমে নিয়ে যায়। এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হিসেবেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ এখন একক পরীক্ষার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছে।
‘ন্যাশনাল টেস্টিং অথরিটি’ গঠনের প্রস্তাব
ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনার জন্য একটি স্থায়ী কাঠামো বা ‘ন্যাশনাল টেস্টিং অথরিটি’ গঠনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এই সংস্থাটি জাতীয় পর্যায়ে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা গ্রহণ করবে। এর ফলে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আলাদা করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রশ্ন ছাপানো বা পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন হবে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ যে পথে হাঁটছে, তার মূল ভিত্তি হবে এই কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ।
জিএসটি বা গুচ্ছ পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ও উত্তরণ
ইতিমধ্যে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়া শুরু হলেও বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো (যেমন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাবি, রাবি ও চবি) এই প্রক্রিয়ার বাইরে ছিল। ফলে গুচ্ছ পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি পুরোপুরি কমেনি। এবারের আলোচনায় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও একই ছাতার নিচে আনার চেষ্টা চলছে। শিক্ষাবিদদের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ তখনই সফল হবে, যখন দেশের সকল উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই একক ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে।
শিক্ষার্থীদের আর্থিক সাশ্রয় ও মানসিক প্রশান্তি
ভর্তি পরীক্ষার সিজন মানেই কোচিং ফি, যাতায়াত খরচ এবং প্রতিটি ইউনিটের আলাদা আলাদা আবেদন ফি পরিশোধের চাপে অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের নাভিশ্বাস ওঠে। একটি মাত্র পরীক্ষা হলে শিক্ষার্থীদের মাত্র একবারই আবেদন ফি দিতে হবে এবং একবারের যাতায়াতে পরীক্ষা সম্পন্ন হবে। এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বহুগুণ কমিয়ে দেবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে গ্রাম ও মফস্বলের মেধাবী শিক্ষার্থীরা বড় শহরের শিক্ষার্থীদের সাথে সমান সুযোগে প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবে।
শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি
একক পরীক্ষার বিষয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও ইউজিসি নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে কীভাবে একটি কেন্দ্রীয় মেধা তালিকা তৈরি করা যায়, তা নিয়ে কাজ করছে কারিগরি কমিটি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ এখন বড় বাধাগুলো কাটিয়ে উঠতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করছে।
আরো পড়ুনঃ সোশ্যাল মিডিয়ায় নতুন ফিচার
আর্ন্তজাতিক মডেলের অনুসরণ
বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বা ভারতের মতো একক পরীক্ষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় ভর্তি নিশ্চিত করা হয়। বাংলাদেশও সেই মডেলে এগোতে চায়। এতে করে পরীক্ষার মান যেমন বাড়ে, তেমনি মেধার সঠিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ সিদ্ধান্তটি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী সংস্কার হিসেবে বিবেচিত হবে।
মেধা তালিকা ও চয়েস পদ্ধতি
নতুন এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা একটি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর তাদের প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে একটি জাতীয় মেধা তালিকা তৈরি করা হবে। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা তাদের পছন্দমতো বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় বাছাই করতে পারবে। এতে করে বারবার পরীক্ষা দেওয়ার ঝামেলা থাকবে না এবং প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন শূন্য থাকার সমস্যাও অনেকটা দূর হবে। মূলত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ এই কারিগরি দিকগুলো নিয়ে আইটি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন।
প্রশ্নপত্রের মান ও জালিয়াতি রোধ
একক পরীক্ষা হলে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক সহজ হবে। যখন একাধিক দিনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা হয়, তখন প্রশ্ন ফাঁসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় পরীক্ষা হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ এই উদ্যোগে স্বচ্ছতা আনাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া
সারাদেশের অভিভাবকরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, “আমাদের সন্তানদের মেধা যাচাইয়ের নামে যে হয়রানি করা হয়, তা বন্ধ হওয়া দরকার।” সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন প্লাটফর্মে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ এই আলোচনাটি ব্যাপক জনপ্রিয় হয়েছে।
সম্ভাব্য বাস্তবায়নের সময়সীমা
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই এই পদ্ধতি চালু করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে তার আগে আইনগত এবং নীতিগত কিছু বিষয় চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। ইউজিসি জানিয়েছে, তারা খুব দ্রুতই চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশ করবে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে ইউজিসির পদক্ষেপ এই যাত্রা এখন চূড়ান্ত মোড়ে দাঁড়িয়ে।
শিক্ষার্থীদের চোখের জল আর অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটিয়ে একটি সুন্দর ও আধুনিক ভর্তি পদ্ধতি উপহার দেওয়া এখন সময়ের দাবি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ভোগান্তি কমাতে বড় সিদ্ধান্তের পথে ইউজিসির এই উদ্যোগ কেবল একটি পরীক্ষাই নয়, এটি স্মার্ট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। আমরা আশা করি, সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় এটি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে।







