৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র সফল পরীক্ষা: রাশিয়ার ভয়ংকর বার্তা বিশ্বকে

সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র সফল পরীক্ষা: রাশিয়ার ভয়ংকর বার্তা বিশ্বকে

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র সফল পরীক্ষা: রাশিয়ার ভয়ংকর বার্তা বিশ্বকে

সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র সফল পরীক্ষা: রাশিয়ার ভয়ংকর বার্তা বিশ্বকে
সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র সফল পরীক্ষা: রাশিয়ার ভয়ংকর বার্তা বিশ্বকে

রাশিয়ার নতুন ‘সারমাত’ পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র: ১৫টি হাইপারসনিক ওয়ারহেড নিয়ে বিশ্বে ত্রাস

ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেই পশ্চিমা বিশ্বকে বড় বার্তা দিল রাশিয়া। দেশটি তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভয়ংকর আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক মিসাইল বা ICBM ‘সারমাত’ এর সফল পরীক্ষা চালিয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র ৬০০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হেনেছে। প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন আগেই বলেছিলেন, এই অস্ত্র রাশিয়ার নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেবে।

 

সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা: কী ঘটেছে প্লেসেত্স্কে?

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা তাসের খবর অনুযায়ী, দেশটির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত প্লেসেত্স্ক মহাকাশ বন্দর থেকে ২০ এপ্রিল বিকেলে সারমাত ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এটি উৎক্ষেপণের পর আকাশে থাকা অবস্থায় পুরো সময় তার যেসব বৈশিষ্ট্য থাকার কথা সেই অনুযায়ী কাজ করেছে। ছয় হাজার কিলোমিটার দুরে কামচাটকা উপদ্বীপে গিয়ে সেটি সফলভাবে তার টার্গেটে আঘাত হেনেছে।”

রাশিয়া এই উৎক্ষেপণের বিভিন্ন দিক থেকে তোলা ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, বিকট শব্দ করে মাটির নিচের সাইলো থেকে বের হয়ে আসছে বিশাল সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র। তীব্র বেগে আগুন ও ধোঁয়া বের হচ্ছে ক্ষেপণাস্ত্রটির নিচের অংশ থেকে।

 

কেন ‘সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র’ বিশ্বের জন্য আতঙ্ক?

RS-28 Sarmat নামেও পরিচিত এই ক্ষেপণাস্ত্রকে ন্যাটো কোড নাম দিয়েছে ‘Satan-2’। নামেই এর ভয়াবহতা বোঝা যায়। ৫টি কারণে এই সারমাত ক্ষেপণাস্ত্রকে গেম চেঞ্জার বলা হচ্ছে:

  1. পাল্লা ও গতি: এর পাল্লা প্রায় ১৮,০০০ কিলোমিটার। অর্থাৎ মস্কো থেকে ছুড়লে যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের যেকোনো শহরে পৌঁছাতে পারবে। গতি শব্দের চেয়ে ২০ গুণ বেশি।
  2. হাইপারসনিক ওয়ারহেড: এটি ১০ থেকে ১৫টি স্বাধীনভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম বা MIRV ওয়ারহেড বহন করতে পারে। সাথে থাকতে পারে অ্যাভানগার্ড হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল, যা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম।
  3. ক্ষমতা: একটি সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র ৫০ মেগাটন TNT এর সমান বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। হিরোশিমায় ফেলা বোমার চেয়ে ২০০০ গুণ শক্তিশালী।
  4. অপ্রতিরোধ্য: এটি দক্ষিণ ও উত্তর মেরু দুদিক দিয়েই হামলা করতে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমকে এড়িয়ে যাওয়া এর জন্য সহজ।
  5. প্রতিস্থাপন: সোভিয়েত আমলের পুরনো R-36M ভোয়েভোদা ক্ষেপণাস্ত্রের জায়গা নেবে এই সারমাত।

 

পুতিনের হুঁশিয়ারি: কাকে বার্তা দিল রাশিয়া?

পরীক্ষার পর প্রেসিডেন্ট পুতিন বলেন, “এই অনন্য অস্ত্র আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধ সক্ষমতাকে শক্তিশালী করবে। যারা উন্মত্ত আগ্রাসী বক্তব্যের মাধ্যমে আমাদের দেশকে হুমকি দেওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের জন্য এটি চিন্তার খোরাক হবে।”

বিশ্লেষকরা মনে করেন, পুতিনের এই বার্তা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর উদ্দেশে। ইউক্রেনে পশ্চিমা অস্ত্র সরবরাহ এবং ফিনল্যান্ড-সুইডেনের ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার প্রেক্ষাপটে রাশিয়া বোঝাতে চাইছে, তাদের পরমাণু শক্তি এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র এর সফল পরীক্ষা সেই বার্তাকেই আরও জোরালো করল।

 

যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া কী?

পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা রাশিয়ার পরীক্ষার বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র বলেছেন, এই পরীক্ষা ‘রুটিন’ এবং যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদের জন্য কোনো হুমকি নয়। কারণ নিউ স্টার্ট চুক্তি অনুযায়ী রাশিয়া পরীক্ষার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছিল।

তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া যতই ‘রুটিন’ বলুক, ইউক্রেন যুদ্ধের এই সময়ে সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা স্পষ্টতই মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির কৌশল। ন্যাটো মহাসচিব বলেছেন, “রাশিয়ার পরমাণু অস্ত্রের মহড়া দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিপজ্জনক।”

 

বাংলাদেশের উপর কী প্রভাব পড়বে?

সরাসরি সামরিক প্রভাব না থাকলেও, বিশ্বে পরমাণু উত্তেজনা বাড়লে তার ধাক্কা বাংলাদেশেও লাগে।

  • অর্থনীতি: বড় যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেল, গ্যাস ও খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে যায়। ডলারের দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি খরচ বাড়বে।
  • কূটনীতি: রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্বে বাংলাদেশকে ভারসাম্যের কূটনীতি বজায় রাখতে হয়। রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের মতো প্রকল্পে রাশিয়া বড় অংশীদার।
  • প্রবাসী: ইউরোপ বা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়ালে সেখানকার বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও রেমিট্যান্স ঝুঁকিতে পড়বে।

তাই সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র এর মতো অস্ত্রের পরীক্ষা আমাদের জন্য দূরের ঘটনা হলেও, এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব উপেক্ষা করা যায় না।

 

 

আরও পড়ুন: লেবানন যুদ্ধ: স্কুলে হামলা যুদ্ধবিরতি নিয়ে ভয়ংকর সংশয়!নিয়ে নাবিহ বেরির বড় সংশয়

 

সারমাত বনাম মিনিটম্যান-3: কে এগিয়ে?

বৈশিষ্ট্য রাশিয়ার সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের মিনিটম্যান-3
পাল্লা ১৮,০০০ কিমি ১৩,০০০ কিমি
ওয়ারহেড ১০-১৫টি MIRV + হাইপারসনিক ৩টি MIRV
গতি ম্যাক ২০+ ম্যাক ২৩
কার্যকর ২০২৩ থেকে ১৯৭০ থেকে

কাগজে-কলমে সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র মিনিটম্যান-3 এর চেয়ে অনেক এগিয়ে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাইডেন্ট সাবমেরিন-ভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র এখনও রাশিয়ার জন্য বড় হুমকি।

 

ভবিষ্যতে কী হবে? নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা?

স্নায়ুযুদ্ধের পর আবারও বিশ্ব পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতার দিকে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। রাশিয়া সারমাত ছাড়াও কিনঝাল, জিরকন হাইপারসনিক মিসাইল তৈরি করেছে। পাল্টা জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও LGM-35A সেন্টিনেল ICBM তৈরি করছে। চীনও তাদের DF-41 মিসাইলের সংখ্যা বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিশ্বকে আরও অনিরাপদ করে তুলবে। সারমাত ক্ষেপণাস্ত্র এর সফল পরীক্ষা সেই আশঙ্কাকেই সত্যি করল। একটাই আশা, এই ভয়ংকর অস্ত্রগুলো যেন শুধু ‘ডিটারেন্স’ বা প্রতিরোধ হিসেবেই থাকে, কখনো ব্যবহার না হয়।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর