
রাজধানী ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড রোধে কঠোর অবস্থানে নেমেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ । আজ সকাল থেকে একযোগে শুরু হয়েছে বিশেষ চিরুনি অভিযান। মূলত কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ এখন অত্যন্ত সক্রিয়, যার প্রাথমিক ফলশ্রুতিতে মিরপুর, উত্তরা ও খিলগাঁও এলাকা থেকে অন্তত ১৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।
অভিযানের প্রেক্ষাপট ও জরুরি নির্দেশনা
গতকাল রাতে রাজধানীর উত্তরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের দুই গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এই সংঘর্ষে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে একজন কিশোর নিহত হওয়ার পর টনক নড়ে প্রশাসনের। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ডিএমপি কমিশনারের নির্দেশে আজ ভোর থেকেই মাঠে নামে পুলিশ। কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ নামার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে যেমন স্বস্তি ফিরেছে, তেমনি অপরাধীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
উত্তরা ও মিরপুর এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান
আজকের অভিযানের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল উত্তরা এবং মিরপুর এলাকা। গতরাতের হত্যাকাণ্ডের রেশ ধরে উত্তরার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় হানা দেয় পুলিশ। অভিযানে সন্দেহভাজন বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে যাদের বিরুদ্ধে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে। একই সাথে মিরপুরের বিভিন্ন গলি ও খেলার মাঠে অযথা আড্ডা দেওয়া কিশোরদের সতর্ক করা হচ্ছে। কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ মোতায়েন থাকায় আজ এলাকার চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
খিলগাঁও ও দক্ষিণ সিটিতে পুলিশের তৎপরতা
শুধু উত্তর সিটি নয়, দক্ষিণ সিটির খিলগাঁও ও বনশ্রী এলাকাতেও আজ পুলিশের বিশেষ টিম টহল দিয়েছে। স্কুল-কলেজ চলাকালীন সময়ে এবং সন্ধ্যার পর অলিগলিতে মোটরবাইক নিয়ে মহড়া দেওয়া কিশোরদের তল্লাশি করা হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ নামার মূল উদ্দেশ্য হলো কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা। খিলগাঁও থেকে আটককৃতদের বিরুদ্ধে আগেও ছোটখাটো ছিনতাইয়ের অভিযোগ ছিল বলে জানা গেছে।
সাত দিনের বিশেষ কর্মসূচি
ডিএমপি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই অভিযান কেবল আজকের জন্য সীমাবদ্ধ নয়। আগামী এক সপ্তাহ ধরে রাজধানীর প্রতিটি অলিগলিতে এই বিশেষ তৎপরতা অব্যাহত থাকবে। পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ এই পুরো সপ্তাহ জুড়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করবে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের “কালচার” বেশি প্রচলিত, সেখানে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
আরো পড়ুনঃ মেট্রোরেলে এবার কমলাপুর যাওয়ার অপেক্ষা
অভিভাবক ও সচেতন মহলের প্রতিক্রিয়া
পুলিশের এই কঠোর অবস্থানকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সাধারণ অভিভাবকরা। তারা মনে করছেন, সন্তানদের সঠিক পথে রাখতে এই ধরনের প্রশাসনিক চাপের প্রয়োজন রয়েছে। তবে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি দূর করা সম্ভব নয় বলেও অনেকে মন্তব্য করেছেন। তবুও কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ নামার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে অপরাধ প্রবণতা অনেকটা কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডিএমপির বিশেষ বার্তা
পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ নাগরিকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে যে, কোনো এলাকায় কিশোরদের সন্দেহজনক জটলা দেখলে যেন অবিলম্বে নিকটস্থ থানাকে জানানো হয়। পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। মূলত কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ সর্বদা সাধারণ মানুষের সহযোগিতা কামনা করছে।
গডফাদারদের তালিকা প্রণয়ন ও ধরপাকড়
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, কিশোর গ্যাংয়ের এই সদস্যদের পেছনে স্থানীয় কিছু তথাকথিত ‘বড় ভাই’ বা রাজনৈতিক প্রশ্রয়দাতা কাজ করছে। ডিএমপি জানিয়েছে, কেবল কিশোরদের আটক করেই ক্ষান্ত হবে না প্রশাসন, বরং তাদের যারা ইন্ধন দিচ্ছে সেই গডফাদারদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ নামার পাশাপাশি এই নেপথ্য কারিগরদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও টিকটক গ্রুপে নজরদারি
কিশোর গ্যাংগুলো বর্তমানে ফেসবুক, টিকটক এবং মেসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে তাদের গ্যাং কালচার ছড়িয়ে দিচ্ছে এবং তুচ্ছ ঘটনায় সংঘর্ষের পরিকল্পনা করছে। ডিএমপির সাইবার ইউনিট এখন এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। অপরাধমূলক গ্রুপগুলোর ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট অনুসরণ করে অনেককে শনাক্ত করা হচ্ছে, যা মূলত কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ এর গোয়েন্দা কার্যক্রমেরই অংশ।
স্কুল-কলেজ ফাঁকি দেওয়া কিশোরদের ওপর কড়াকড়ি
অভিযান চলাকালীন সময়ে দেখা গেছে, অনেক কিশোর স্কুল চলাকালীন সময়ে পার্কে বা আড়ালে আড্ডা দিচ্ছে। পুলিশ এখন থেকে ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাইরে অযথা ঘোরাঘুরি করতে দেখলে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সমন্বয় করে কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ এই বিশেষ তদারকি চালিয়ে যাবে যাতে শিক্ষার্থীরা অপরাধে জড়িয়ে না পড়ে।
মাদক ও দেশীয় অস্ত্রের উদ্ধার অভিযান
আটককৃত ১৫ জনের মধ্যে কয়েকজনের কাছ থেকে ফেন্সিডিল এবং দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের দাবি, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা প্রায়ই মাদকের টাকা জোগাতে ছিনতাই ও এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। এই অভিযানের মাধ্যমে রাজধানীর চিহ্নিত ‘ক্রাইম জোন’গুলো থেকে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক নির্মূল করাও পুলিশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
কাউন্সিলিং ও সংশোধনাগারের ব্যবস্থা
ডিএমপি কমিশনার স্পষ্ট করেছেন যে, যাদের বিরুদ্ধে বড় কোনো অপরাধের প্রমাণ মিলবে না, তাদের প্রথমবার সতর্ক করে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে যারা গুরুতর অপরাধে জড়িত, তাদের সাধারণ কারাগারের বদলে সংশোধনাগারে পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মূলত দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের লক্ষ্যে কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ সমাজসেবা অধিদপ্তরের সাথে একযোগে কাজ করছে।
রাজধানীকে নিরাপদ রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মকে অপরাধ জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে আনতে ডিএমপির এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। উত্তরার সেই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর কিশোর গ্যাং নির্মূলে রাজপথে পুলিশ যেভাবে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অব্যাহত থাকলে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য কমে আসবে। আগামী কয়েকদিনের অভিযানে আরও বড় সাফল্যের প্রত্যাশা করছে প্রশাসন।







