৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি

অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি

 

অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি
অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি

বর্তমান বিশ্বে ইন্টারনেটের ব্যবহার আমাদের জীবনযাত্রাকে অনেক সহজ করে দিলেও এর পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডিজিটাল ঝুঁকি। বিশেষ করে বাংলাদেশে গত কয়েক বছরে ইন্টারনেটের প্রসার যত দ্রুত হয়েছে, সাইবার অপরাধের মাত্রাও তত বেশি বেড়েছে। বর্তমানে অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক একাউন্ট খালি করা থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হ্যাকিং—প্রতারণার কৌশলগুলো দিন দিন আরও সূক্ষ্ম ও ভয়ংকর হয়ে উঠছে।

আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব অনলাইন প্রতারণার ধরন, কেন এটি বাড়ছে এবং কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখা যায়।

অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধির কারণসমূহ

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে প্রতারকরা ঘরে বসেই লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে পারে। বাংলাদেশে অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে

 সচেতনতার অভাব: অনেক ব্যবহারকারী এখনো জানেন না কোন লিঙ্কটি নিরাপদ আর কোনটি নয়। লিঙ্কে ক্লিক করার আগে যাচাই না করার প্রবণতাই প্রতারকদের প্রধান হাতিয়ার।

প্রযুক্তির অপব্যবহার: এআই  এবং ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন অন্যের কণ্ঠ বা চেহারা হুবহু নকল করা সম্ভব হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে সহজেই বিভ্রান্ত করছে।

আর্থিক লেনদেনে অসতর্কতা: ওটিপি বা পিন কোড শেয়ার করার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় অনেকেই বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

আইনি সীমাবদ্ধতা: সাইবার অপরাধীরা অনেক সময় দেশের বাইরে থেকে কাজ করে, ফলে তাদের শনাক্ত করা এবং আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রতারণার প্রচলিত কিছু ধরন

প্রতারকরা মানুষকে ফাঁদে ফেলতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি হলো:

 ফিশিং 

প্রতারকরা ব্যাংক বা নামি কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে ভুয়া ইমেইল বা মেসেজ পাঠায়। সেখানে একটি লিঙ্ক থাকে যা দেখতে আসল ওয়েবসাইটের মতো। ব্যবহারকারী সেখানে তথ্য দিলেই তার পাসওয়ার্ড বা কার্ডের তথ্য চুরি হয়ে যায়।

 সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল

ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামে ফেক আইডি খুলে বন্ধুত্ব করা এবং পরবর্তীতে ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল করা বর্তমান সময়ের একটি বড় সমস্যা।

 ভুয়া ই-কমার্স সাইট

অনেক সময় ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইটে লোভনীয় ডিসকাউন্টে পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর সেই পেজ গায়েব হয়ে যায় অথবা অত্যন্ত নিম্নমানের পণ্য পাঠানো হয়।

বিনিয়োগের টোপ

“ঘরে বসে লাখ টাকা আয় করুন”—এমন চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে মানুষকে বিটকয়েন বা বিভিন্ন ভুয়া অ্যাপে টাকা বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করা হয়। শুরুতে কিছু লভ্যাংশ দিলেও পরে বিশাল অংকের টাকা নিয়ে তারা উধাও হয়ে যায়।

আর্থিক খাতে অনলাইন প্রতারণা ও ঝুঁকি

মোবাইল ব্যাংকিং এবং অনলাইন ব্যাংকিং সহজ হওয়ায় এখন অপরাধীদের লক্ষ্য থাকে মানুষের সঞ্চিত অর্থ। বিশেষ করে বিকাশ, নগদ বা রকেটের গ্রাহকদের টার্গেট করে বলা হয় যে তাদের একাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে বা তারা পুরস্কার জিতেছেন। এরপর কৌশলে তাদের কাছ থেকে ওটিপি জেনে নিয়ে একাউন্টের সব টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। ডিজিটাল অর্থনীতিতে অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি রোধ করতে হলে আমাদের ব্যক্তিগত পিন এবং ওটিপি শেয়ার করার ক্ষেত্রে কঠোর হতে হবে।

আরো পড়ুন:দেশের ক্রীড়াঙ্গনের খবর

কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?

ডিজিটাল দুনিয়ায় শতভাগ নিরাপদ থাকা কঠিন, তবে কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকি অনেক কমে যায়

দ্বি-স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা :আপনার ইমেইল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একাউন্টে অবশ্যই টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখুন।

সন্দেহজনক লিঙ্কে ক্লিক না করা: মেসেঞ্জার বা ইমেইলে আসা কোনো অপরিচিত লিঙ্কে ক্লিক করবেন না, এমনকি সেটি যদি কোনো পরিচিত মানুষের কাছ থেকে আসে তাহলেও যাচাই করে নিন।

শক্তিশালী পাসওয়ার্ড: সব একাউন্টে একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করবেন না। পাসওয়ার্ডে অক্ষর, সংখ্যা এবং চিহ্নের মিশ্রণ রাখুন।

অফিশিয়াল অ্যাপ ব্যবহার: ব্যাংকিং বা কেনাকাটার জন্য সর্বদা অফিশিয়াল ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ব্যবহার করুন।

ব্যক্তিগত তথ্য গোপন রাখা: সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ফোন নম্বর, ঠিকানা বা ব্যক্তিগত ছবি শেয়ার করার ক্ষেত্রে সচেতন হোন।

প্রতারিত হলে করণীয়

যদি আপনি কোনোভাবে অনলাইন প্রতারণার শিকার হন, তবে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন

 প্রমাণ সংরক্ষণ: প্রতারকের সাথে কথোপকথনের স্ক্রিনশট, পেমেন্ট স্লিপ এবং ফোন নম্বর সংরক্ষণ করুন।

দ্রুত রিপোর্ট করা: সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা মোবাইল ব্যাংকিং কর্তৃপক্ষকে তাৎক্ষণিকভাবে জানান যাতে তারা আপনার একাউন্ট সাময়িকভাবে বন্ধ করতে পারে।

 জিডি করা: নিকটস্থ থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করুন।

সাইবার হেল্পডেস্ক: বাংলাদেশ পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ডিভিশনের সাহায্য নিতে পারেন। তাদের ফেসবুক পেজ বা হটলাইনে যোগাযোগ করে পরামর্শ নিন।

ফ্রিল্যান্সিং এবং চাকরির নামে প্রতারণা

বর্তমান সময়ে বেকারত্বকে পুঁজি করে একদল প্রতারক চক্র সক্রিয় হয়েছে। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আকর্ষণীয় বেতনের পার্ট-টাইম চাকরির বিজ্ঞাপন দেয়। শুরুতে ছোট ছোট কিছু কাজের বিপরীতে টাকা দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে, পরবর্তীতে বড় অংকের ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’ বা ‘প্রসেসিং ফি’ নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। ডাটা এন্ট্রি বা ইউটিউব ভিডিও লাইক করার মতো সহজ কাজের প্রলোভন এখন অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ।

রোমান্স স্ক্যাম বা প্রেমের ফাঁদ

অনেক সময় প্রতারকরা বিপরীত লিঙ্গের পরিচয় দিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সম্পর্ক গড়ে তোলে। এরপর কোনো জরুরি বিপদ, যেমন—অসুস্থতা বা বিদেশে আটকা পড়ার দোহাই দিয়ে বিপুল পরিমাণ টাকা দাবি করে। একে ‘রোমান্স স্ক্যাম’ বলা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপরিচিত কারো সাথে আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।

স্মার্টফোন ও পিসি হ্যাকিংয়ের ঝুঁকি

অনেক ব্যবহারকারী প্রিমিয়াম সফটওয়্যার বিনামূল্যে পাওয়ার আশায় বিভিন্ন ওয়েবসাইট থেকে ‘ক্র্যাক’ ফাইল ডাউনলোড করেন। এসব ফাইলের সাথে ম্যালওয়্যার বা র‍্যানসামওয়্যার যুক্ত থাকে, যা আপনার ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরির মাধ্যমে বড় ধরনের ব্ল্যাকমেইল বা আর্থিক ক্ষতির পথ তৈরি করে।

পাবলিক ওয়াই-ফাই ব্যবহারের বিপদ

রেস্টুরেন্ট, বিমানবন্দর বা শপিং মলে ফ্রি ওয়াই-ফাই ব্যবহার করার সময় অনলাইন ব্যাংকিং বা গুরুত্বপূর্ণ লগইন এড়িয়ে চলা উচিত। হ্যাকাররা অনেক সময় ‘ফেক হটস্পট’ তৈরি করে রাখে, যার মাধ্যমে আপনার ফোনের সমস্ত ট্রাফিক তারা পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

ডিজিটাল লিটারেসি বা কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

সরকার এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাকে তৃণমূল পর্যায়ে ডিজিটাল শিক্ষার প্রসারে কাজ করতে হবে। গ্রামীণ পর্যায়ে স্মার্টফোন ব্যবহারকারী বাড়লেও ইন্টারনেটের নিরাপত্তা সম্পর্কে তাদের ধারণা সীমিত। নিয়মিত সেমিনার এবং প্রচারণার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে পারলে অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

একটি বিশেষ সতর্কতা বক্স (নিবন্ধের শেষে যোগ করতে পারেন)

মনে রাখুন

১. কোনো লটারি জেতার মেসেজ পেলে আগে যাচাই করুন।

২. অপরিচিত কাউকে ভিডিও কলে নিজের চেহারা দেখানোর আগে ভাবুন।

৩. ফোনের ক্যামেরা এবং মাইক ব্যবহারের পারমিশন দেওয়ার সময় সতর্ক থাকুন।

৪. ব্যাংক কার্ডের সিভিভি নম্বর কারো সাথে শেয়ার করবেন না।

 

 ভুয়া লটারি এবং পুরস্কারের লোভ

অনেক সময় ব্যবহারকারীদের ইমেইল বা মেসেঞ্জারে জানানো হয় যে তারা আন্তর্জাতিক কোনো নামি প্রতিষ্ঠান থেকে বিশাল অংকের লটারি বা দামী উপহার জিতেছেন। এই উপহার পাঠানোর নাম করে কাস্টমস ফি বা শিপিং চার্জ বাবদ অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি পাওয়ার এটি একটি দীর্ঘদিনের পুরনো কিন্তু কার্যকর কৌশল।

মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য চুরি

প্লে-স্টোর বা বিভিন্ন আনঅফিসিয়াল সাইটে এমন কিছু অ্যাপ থাকে যা মোবাইলে ইনস্টল করার সাথে সাথে আপনার কন্টাক্ট লিস্ট, গ্যালারি এবং মেসেজের অ্যাক্সেস নিয়ে নেয়। পরে এসব ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করা হয়। বিশেষ করে বিভিন্ন লোন অ্যাপ বর্তমানে এই ধরণের প্রতারণার জন্য বেশি দায়ী।

কিউআর কোড  স্ক্যাম

বর্তমান সময়ে কেনাকাটায় কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করার জনপ্রিয়তা বাড়ছে। প্রতারকরা অনেক সময় আসল কোডের ওপর তাদের নিজস্ব ভুয়া কোড বসিয়ে রাখে। আপনি যখন টাকা পাঠানোর জন্য স্ক্যান করেন, সেই টাকা বিক্রেতার কাছে না গিয়ে সরাসরি প্রতারকের একাউন্টে চলে যায়।

 

তথ্যপ্রযুক্তির যুগে আমরা ইন্টারনেট থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে পারব না। তবে অনলাইন প্রতারণা বৃদ্ধি পাওয়ার এই সময়ে আমাদের প্রধান হাতিয়ার হতে হবে সচেতনতা। মনে রাখবেন, কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠান কখনোই আপনার কাছে ফোন করে পিন বা ওটিপি চাইবে না। লোভনীয় অফার বা ভয়ের মুখে পড়ে নিজের ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করবেন না। আপনার একটু সচেতনতাই পারে আপনাকে এবং আপনার পরিবারকে ডিজিটাল অপরাধীদের হাত থেকে রক্ষা করতে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর