
বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস ও মাঙ্কিপক্সের ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নতুন এক মহামারির পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে। কঙ্গো এবং উগান্ডায় নতুন করে ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা দেখা দেওয়ায় বিশ্বজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আন্তর্জাতিক স্তরে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনস্বাস্থ্য সতর্কতা বা ‘গ্লোবাল হেলথ ইমার্জেন্সি’ ঘোষণা করেছে। মূলত আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক এখন শুধু নির্দিষ্ট কোনো দেশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পুরো বিশ্বের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদর দফতর থেকে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। ডব্লিউএইচও-র মহাপরিচালক জানান, আফ্রিকায় ভাইরাসের এই নতুন স্ট্রেনটি অত্যন্ত মারাত্মক এবং এর সংক্রমণ ক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি।
কঙ্গো ও উগান্ডার বর্তমান পরিস্থিতি
গত কয়েক সপ্তাহে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (ডিআরসি) এবং প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় ইবোলা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। কঙ্গোর প্রত্যন্ত অঞ্চলের বনাঞ্চল থেকে শুরু হওয়া এই সংক্রমণ এখন উগান্ডার সীমান্তসংলগ্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও থাবা বসিয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে কঙ্গো ও উগান্ডার সীমান্ত এলাকায় কঠোর স্ক্রিনিং শুরু হয়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ভাইরাসের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বৈশ্বিক সতর্কতা কেন?
কোনো রোগ যখন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক মহামারির রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, তখনই কেবল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ধরনের জরুরি সতর্কতা জারি করে। ডব্লিউএইচও-র জরুরি কমিটির বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এবারের ইবোলা স্ট্রেনটির মিউটেশন বা রূপবদল ঘটেছে, যা অত্যন্ত দ্রুত মানুষের থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। মূলত এই কারণেই আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, বিমানবন্দর এবং স্থল বন্দরগুলোতে বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দিয়ে আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক এর বিষয়টি সারা বিশ্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছে।
ইবোলার নতুন স্ট্রেন ও এর লক্ষণসমূহ
চিকিৎসকদের মতে, ইবোলা একটি অত্যন্ত মারাত্মক রক্তক্ষরণকারী জ্বর। নতুন এই স্ট্রেনে আক্রান্ত হলে প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে তীব্র জ্বর, পেশিতে ব্যথা, প্রচণ্ড দুর্বলতা, গলা ব্যথা ও মাথাব্যথা দেখা দেয়। রোগটি বাড়ার সাথে সাথে আক্রান্ত ব্যক্তির বমি, ডায়রিয়া এবং অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ শুরু হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে যে, আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক সৃষ্টির পেছনে বড় কারণ হলো এই লক্ষণগুলো প্রকাশের আগেই আক্রান্ত ব্যক্তি অজান্তেই অন্য অনেকের মাঝে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
কীভাবে ছড়ায় এই মারাত্মক ভাইরাস?
ইবোলা কোনো বায়ুবাহিত রোগ নয়, তবে এটি অত্যন্ত সংক্রামক। আক্রান্ত ব্যক্তি বা বন্যপ্রাণীর (যেমন: বাদুড় বা বানর) রক্ত, লালা, ঘাম বা অন্যান্য শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে আসলে এই রোগ ছড়ায়। এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত পোশাক বা বিছানা থেকেও সুস্থ মানুষ সংক্রমিত হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কঙ্গো ও উগান্ডার গ্রামীণ ঐতিহ্য ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বিশেষ রীতিনীতির কারণে মৃতদেহ থেকে জীবিতদের মাঝে সংক্রমণ বেশি ছড়াচ্ছে, যা আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক কে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও বিমানবন্দরগুলোতে হাই অ্যালার্ট
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি সতর্কতার পর ইউরোপ, এশিয়া ও আমেরিকার অনেক দেশ আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোতে থার্মাল স্ক্যানার বসানো হয়েছে এবং কঙ্গো বা উগান্ডা ফেরত কোনো যাত্রীর মধ্যে জ্বর বা অন্যান্য উপসর্গ দেখা দিলে তাকে সাথে সাথে কোয়ারেন্টাইনে পাঠানো হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্পষ্ট করেছে যে, যদি এখনই বিমানবন্দরগুলোতে কড়াকড়ি করা না হয়, তবে আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক খুব দ্রুতই বৈশ্বিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
আরো পড়ুনঃ কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া
ভ্যাকসিন ও চিকিৎসা ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ
ইবোলার জন্য অতীতে কিছু ভ্যাকসিন তৈরি করা হলেও, নতুন এই পরিবর্তিত স্ট্রেনের বিরুদ্ধে সেগুলো কতটা কার্যকর, তা নিয়ে বৈজ্ঞানিক মহলে সংশয় রয়েছে। তাছাড়া আক্রান্ত দেশগুলোর ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ এবং আইসোলেশন সেন্টার স্থাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ডব্লিউএইচও উন্নত দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যাতে তারা দ্রুত মেডিকেল টিম এবং প্রয়োজনীয় তহবিল দিয়ে আফ্রিকার দেশগুলোর পাশে দাঁড়ায়, যাতে আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক ওখানেই থমকে দেওয়া যায়।
বাংলাদেশের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?
বাংলাদেশ সরাসরি আফ্রিকার এই দেশগুলোর সাথে সীমানা শেয়ার না করলেও, বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে কোনো দেশই ঝুঁকিমুক্ত নয়। বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তি মিশন বা ব্যবসার সূত্রে অনেক বাংলাদেশি নাগরিক কঙ্গোসহ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে নিয়মিত যাতায়াত করেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক শুরু হওয়ার পর বাংলাদেশেরও উচিত হবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ সকল প্রবেশপথে আফ্রিকার দেশগুলো থেকে আসা যাত্রীদের কঠোর স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মন্দার কালো মেঘ
যদি এই সংক্রমণ আফ্রিকার বাইরে অন্যান্য মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে আবারও বড় ধরনের লকডাউন বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিমান সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে কঙ্গো ও উগান্ডা রুটে তাদের ফ্লাইটের সংখ্যা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। সরবরাহ চেইন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে যাতে নতুন কোনো স্থবিরতা না আসে, সেজন্যই মূলত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আগেভাগেই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য এই বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।
চিকিৎসকদের বিশেষ বার্তা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী, এই ভাইরাস থেকে বাঁচতে হলে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা এবং আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা সবচেয়ে জরুরি। সাবান-পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া এবং মাংস ভালোভাবে সেদ্ধ করে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষকরা দিনরাত কাজ করছেন যাতে নতুন স্ট্রেনটির জন্য দ্রুত কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ বাজারে আনা যায়।
ইতিহাস সাক্ষী, যেকোনো মহামারির শুরুর দিকে অবহেলা করলে তার চড়া মূল্য দিতে হয় পুরো মানবজাতিকে। কঙ্গো ও উগান্ডার বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের আবারও সেই সতর্কবার্তাই দিচ্ছে। আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই জরুরি ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে এক কাতারে এনে দাঁড় করিয়েছে। সম্মিলিত বৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টা, সীমান্ত কড়াকড়ি এবং আক্রান্ত দেশগুলোকে সঠিক সময়ে সাহায্য করার মাধ্যমেই কেবল এই আসন্ন বড় বিপদ থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করা সম্ভব।







