৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ: মধ্যরাতে উত্তাল ক্যাম্পাস, আটক ৩

জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ: মধ্যরাতে উত্তাল ক্যাম্পাস, আটক ৩

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ
জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ
জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে পড়েছে। সম্প্রতি বহিরাগত এক যুবক কর্তৃক এক নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গতকাল রাতে ক্যাম্পাস ও সংলগ্ন ইসলামনগর গেট এলাকায় পৃথক তিনটি ঘটনায় ছাত্রীদের হেনস্তা এবং আপত্তিকরভাবে ভিডিও ধারণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ সামনে আসার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রতিবাদে গতকাল রাত ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে একটি বিশাল ও তীব্র বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনজনকে আটক করেছে।

ক্যাম্পাসের ভেতরের এবং সংলগ্ন এলাকার এই একের পর এক ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মধ্যরাতে শত শত শিক্ষার্থীর স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।

ঘটনার সূত্রপাত ও পৃথক ৩টি অভিযোগের বিবরণ

শিক্ষার্থী ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে রাতের মধ্যে তিনটি পৃথক হেনস্তার ঘটনা ঘটে। প্রথম ঘটনাটি ঘটে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান আবাসিক এলাকার সংলগ্ন ইসলামনগর গেট এলাকায়। সেখানে এক ছাত্রী হেঁটে যাওয়ার সময় কয়েকজন বহিরাগত যুবক তাকে উদ্দেশ্য করে আপত্তিকর মন্তব্য করে এবং হেনস্তা করার চেষ্টা করে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাম্পাস এলাকার ভেতরে অন্য এক ছাত্রীর আপত্তিকরভাবে ভিডিও ধারণ করার অভিযোগ ওঠে কিছু যুবকের বিরুদ্ধে। তৃতীয় ঘটনায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অ্যাকাডেমিক ভবনের অদূরে আরেক ছাত্রী হেনস্তার শিকার হন। জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ এভাবে এক রাতের মধ্যেই পরপর আসায় ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়।

ভিডিও ধারণের অভিযোগ ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ

গতকাল রাতের ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ছড়ায় ছাত্রীদের আপত্তিকর ভিডিও ধারণের বিষয়টি। ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থীর সহপাঠীরা জানান, ক্যাম্পাসের অন্ধকারাচ্ছন্ন ও কম আলো থাকা এলাকাগুলোকে পুঁজি করে কিছু বখাটে যুবক ছাত্রীদের পিছু নেয় এবং তাদের অনুমতি ছাড়াই মুঠোফোনে আপত্তিকর ভিডিও ধারণ করে। শিক্ষার্থীরা বিষয়টি বুঝতে পেরে তাৎক্ষণিকভাবে প্রক্টরিয়াল টিমকে জানালেও শুরুতে আশানুরূপ পদক্ষেপ না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। মূলত প্রশাসনের এই ধীরগতির কারণেই জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ নিয়ে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হন।

আরো পড়ুনঃ আফ্রিকায় ইবোলার নতুন আতঙ্ক

মধ্যরাতে উত্তাল ক্যাম্পাস ও শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিল

রাত ঠিক ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল থেকে সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপাচার্য বা উপাচার্যের বাসভবনের দিকে এবং প্রধান সড়কগুলোতে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে বের হন। “ক্যাম্পাসে বোনদের নিরাপত্তা কই?”, “প্রশাসনের অবহেলা আর কত?”, “বহিরাগত মুক্ত ক্যাম্পাস চাই”—এমন নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে মধ্যরাতের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীরা জানান, কিছুদিন আগেই এক বহিরাগত দ্বারা ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে, যার বিচার এখনও পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। তার ওপর আবার জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ প্রমাণ করে যে ক্যাম্পাস এখন ছাত্রীদের জন্য আর নিরাপদ চারণভূমি নেই।

ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ কর্তৃক ৩ জন আটক

শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ এবং উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মুখে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ক্যাম্পাস ও ইসলামনগর গেট এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম এবং সাভার থানা পুলিশের যৌথ অভিযানে সন্দেহভাজন এলাকাগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়। ঘটনাস্থল এবং এর আশপাশ থেকে ছাত্রীদের হেনস্তা ও ভিডিও ধারণের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে আটক করে পুলিশ। আশুলিয়া ও সাভার জোনের পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আটককৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং তাদের মোবাইল ফোন তল্লাশি করে আপত্তিকর ভিডিওর সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তবে জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ এর সুনির্দিষ্ট বিচার না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন স্থগিত করবেন না বলে জানিয়েছেন।

প্রক্টরিয়াল বডির বক্তব্য ও প্রশাসনের আশ্বাস

উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর জানান, “আমরা ঘটনাগুলো জানার পর থেকেই তৎপর ছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখা এবং পুলিশ প্রশাসনকে সাথে নিয়ে আমরা তিনজনকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদার করতে আমরা বদ্ধপরিকর।” তবে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রশাসনের এই আশ্বাসে পুরোপুরি আশ্বস্ত হতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের দাবি, প্রতিবারই ঘটনার পর আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না, যার ফলেই জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ নিয়মিত সংবাদের শিরোনাম হচ্ছে।

বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ ও নিরাপত্তা ঘাটতি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে বহিরাগতদের অবাধ প্রবেশ। বিশেষ করে ইসলামনগর, আমবাগান ও ডেইরি ফার্ম গেট দিয়ে প্রতিদিন হাজারো বহিরাগত ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। এদের মধ্যে অনেকেরই কোনো বৈধ পরিচয় থাকে না। সন্ধ্যার পর ক্যাম্পাসের বোটানিক্যাল গার্ডেন, সুইমিং পুল এলাকা এবং বিভিন্ন লেকের পাড়ে বখাটেদের আড্ডা জমে ওঠে। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, পর্যাপ্ত সিসিটিভি ক্যামেরা ও ল্যাম্পপোস্টে আলোর ব্যবস্থা না থাকায় অপরাধীরা সহজেই পার পেয়ে যায়, আর এর খেসারত দিতে হচ্ছে ছাত্রীদের। জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ বন্ধ করতে হলে সবার আগে ক্যাম্পাসকে সম্পূর্ণ বহিরাগত মুক্ত করার দাবি তুলেছেন আন্দোলনকারীরা।

শিক্ষার্থীদের ৩ দফা দাবি

আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে প্রশাসনের কাছে প্রধান ৩টি দাবি পেশ করেছেন। দাবিগুলো হলো:

গতকাল রাতের ঘটনার সাথে জড়িত আটককৃতদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং আজীবন বহিষ্কার নিশ্চিত করা।

  • ক্যাম্পাসের প্রতিটি অন্ধকার পয়েন্টে অবিলম্বে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা।

 

  • পরিচয়পত্র ছাড়া ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা এবং প্রক্টরিয়াল টিমের টহল জোরদার করা।

 

  • শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই দাবিগুলো দৃশ্যমানভাবে পূরণ না হলে তারা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জনসহ আরও কঠোর কর্মসূচিতে যাবেন।

 

একটি স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারা অত্যন্ত লজ্জাজনক। ধর্ষণচেষ্টার রেশ কাটতে না কাটতেই জাবিতে একের পর এক ছাত্রী হেনস্তার অভিযোগ এটাই প্রমাণ করে যে, অপরাধীরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তোয়াক্কা করছে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ঐতিহ্য রক্ষা করতে এবং ছাত্রীদের একটি নিরাপদ ও ভীতিহীন শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে প্রশাসনের উচিত হবে এবার আর কোনো ওজর-আপত্তি না দেখিয়ে কঠোর ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর