৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

মধুমাসের সওগাত: রাজশাহীর বাজারে মিলছে রসালো গোপালভোগ আম, জেনে নিন আজকের দাম

মধুমাসের সওগাত: রাজশাহীর বাজারে মিলছে রসালো গোপালভোগ আম, জেনে নিন আজকের দাম

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
মধুমাসের সওগাত
মধুমাসের সওগাত
মধুমাসের সওগাত

জ্যৈষ্ঠের তীব্র দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমের মধ্যেই বাঙালির জন্য এলো এক পশলা স্বস্তির খবর। স্থানীয় জেলা প্রশাসনের বেঁধে দেওয়া সময়সূচি বা অফিশিয়াল ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ অনুযায়ী আজ ২০ মে থেকে রাজশাহী ও নাটোরে আনুষ্ঠানিকভাবে গাছ থেকে নামানো শুরু হয়েছে ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু ‘গোপালভোগ’ আম। এর আগে গুটি আম নামানোর অনুমতি থাকলেও আজ থেকে মূলত জাত আমের আনুষ্ঠানিক বিপণন শুরু হলো। তবে মৌসুমের প্রথম দিন হওয়ায় বাজারগুলোতে আমের সরবরাহ কিছুটা কম। আর চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় প্রথম দিনেই পাইকারি বাজারে প্রতি মণ আম ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা পর্যন্ত চড়া মূল্যে বিক্রি হতে দেখা গেছে। মূলত এই রসালো ফলের আগমনে দেশজুড়ে শুরু হয়ে গেছে মধুমাসের সওগাত এর আসল আমেজ।

বাগান মালিক এবং আড়তদারেরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আমের ফলন ও সাইজ বেশ ভালো হয়েছে। তবে তীব্র গরমের কারণে আম দ্রুত পাকতে শুরু করায় চাষিরা কিছুটা দুশ্চিন্তায় থাকলেও প্রথম দিনের বাজার দর দেখে তারা বেশ খুশি।

জেলা প্রশাসনের ‘ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার’ ও প্রথম দিনের তোড়জোড়

রাজশাহীর আম মানেই এক আলাদা ব্র্যান্ড। বাজারে যাতে কোনোভাবেই অপরিপক্ব বা রাসায়নিকযুক্ত আম না আসে, সেজন্য প্রতি বছরের মতো এবারও জেলা প্রশাসন আম পাড়ার নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেছিল। সেই নির্দেশনা মেনে আজ ২০ মে থেকে বাগানগুলোতে শুরু হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। সকাল থেকেই রাজশাহীর পুঠিয়া, বাঘা, চারঘাট এবং নাটোরের বাগাতিপাড়া ও গুরুদাসপুরের আমবাগানগুলোতে চাষিদের ব্যস্ততা ছিল চোখে পড়ার মতো। গাছ থেকে যত্ন সহকারে আম পেড়ে ঝুড়ি ভর্তি করে তা নিয়ে যাওয়া হচ্ছে স্থানীয় আড়তগুলোতে। আম চাষিরা বলছেন, প্রশাসনের এই নিয়মের কারণে আমের গুণগত মান ঠিক থাকে এবং ক্রেতারাও শতভাগ নিশ্চিত হয়ে এই মধুমাসের সওগাত ঘরে তুলতে পারেন।

পাইকারি বাজারে গোপালভোগের দাম ও সরবরাহ চিত্র

আজ সকালে রাজশাহীর সর্ববৃহৎ আমের পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজার এবং নাটোরের স্টেশন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, মৌসুমের প্রথম দিন হওয়ায় আড়তগুলোতে আমের আমদানি তুলনামূলক কম। তবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পাইকারি ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি ছিল উপচে পড়া। প্রথম দিনে বাজারে আসা আমের সিংহভাগই ছিল জনপ্রিয় জাত ‘গোপালভোগ’। ভালো মানের ও বড় সাইজের গোপালভোগ আম প্রতি মণ (৪০ কেজি) ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আর মাঝারি সাইজের আম বিক্রি হচ্ছে ৩,৫০০ থেকে ৩,৭০০ টাকার মধ্যে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে আমের সরবরাহ পূর্ণমাত্রায় চলে আসবে এবং তখন দাম কিছুটা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে আসবে। তবে প্রথম চালানের এই প্রমিয়াম আম মূলত শৌখিন ক্রেতারা চড়া দামেই লুফে নিচ্ছেন, যা মূলত মধুমাসের সওগাত এর প্রতি মানুষের আকর্ষণের বহিঃপ্রকাশ।

নাটোরের আম চাষিদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া

নাটোরের বাগাতিপাড়ার কয়েকজন বড় আম চাষি জানান, গত এপ্রিল মাসের তীব্র খরা ও অনাবৃষ্টির কারণে অনেক গুটি ঝরে পড়েছিল। তবে মে মাসের শুরুর দিকের বৃষ্টি আমের সাইজ বড় হতে দারুণ সাহায্য করেছে। প্রথম দিনেই ভালো দাম পাওয়ায় চাষিদের মুখে হাসির ঝিলিক দেখা গেছে। একজন আম চাষি বলেন, “আমরা ভয় পেয়েছিলাম এবার আমের সাইজ ছোট হবে কি না। কিন্তু আজকে গাছ থেকে নামানোর পর দেখছি আমের রং ও মিষ্টির মান চমৎকার হয়েছে। পাইকারি বাজারে ৪,০০০ টাকা মণ বিক্রি করতে পারাটা আমাদের জন্য বেশ লাভজনক।” ফলন কিছুটা কম হলেও চড়া বাজারমূল্যের কারণে লোকসান পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে মনে করছেন স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা। এই আমের হাত ধরেই গ্রামীণ অর্থনীতিতে আবার চাঙ্গাভাব ফিরে এসেছে।

কুরিয়ার সার্ভিসের বিশেষ প্রস্তুতি ও অনলাইন বুকিং

রাজশাহীর আম মানেই সারা দেশের মানুষের অপেক্ষা। তাই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আম নিরাপদে ও দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দিতে কুরিয়ার সার্ভিসগুলো নিয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সুন্দরবন, এসএ পরিবহন, ও করতোয়াসহ বিভিন্ন নামী-দামী কুরিয়ার কোম্পানিগুলো আমের হাট ও আড়তের পাশেই অস্থায়ী বুকিং কাউন্টার খুলেছে। পাশাপাশি ফেসবুক ভিত্তিক ই-কমার্স বা অনলাইন পেজগুলোর মাধ্যমে সরাসরি বাগান থেকে আম সরবরাহের ধুম পড়েছে। ঢাকার একজন চাকরিজীবী অনলাইনে আমের অর্ডার দিয়ে বলেন, “প্রতি বছর এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। আজ গোপালভোগ আম নামানোর প্রথম দিনেই অনলাইনে অর্ডার করেছি। আশা করছি দু-একদিনের মধ্যেই তা হাতে পাব।” এই অনলাইন বিপ্লবের কারণে ঘরের দরজায় বসেই মানুষ উপভোগ করতে পারছে মধুমাসের সওগাত।

আরো পড়ুনঃ মাদকবিরোধী অভিযানে গ্রেপ্তার

নিরাপদ আম নিশ্চিতকরণে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি

আমের বাজারে কার্বাইড বা ফরমালিনের মতো ক্ষতিকারক কেমিক্যালের ব্যবহার রোধ করতে এবারও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে প্রশাসন। রাজশাহী ও নাটোরের জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট বা ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রতিদিন বড় বড় আমের হাটগুলোতে টহল দিচ্ছে। হাটের প্রবেশমুখে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পুলিশি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে যাতে অপরিপক্ব আম ট্রাকে করে অন্য জেলায় পাচার না হতে পারে। প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, কেমিক্যাল দিয়ে জোর করে আম পাকানোর প্রমাণ মিললেই আড়ত সিলগালা এবং জরিমানা করা হবে। এই কড়া নজরদারির কারণে ক্রেতারা কোনো ভয় ছাড়াই শতভাগ খাঁটি ও ফ্রেশ আম কিনতে পারছেন।

আগামী দিনে বাজারে আসবে যেসব জাতের আম

ম্যাঙ্গো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী আজ ২০ মে থেকে গোপালভোগ নামানো শুরু হলেও এর পর পর অন্যান্য সুস্বাদু জাতগুলো ধাপে ধাপে বাজারে আসবে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, মে মাসের শেষের দিকে বাজারে আসবে লক্ষণভোগ বা লখনা এবং রানীপছন্দ। এরপর জুনের প্রথম সপ্তাহে আসবে আমের রাজা ‘হিমসাগর’ বা খিরসাপাত। জুনের মাঝামাঝি সময়ে আসবে ল্যাংড়া এবং শেষের দিকে আম্রপালি ও ফজলি। আর সবশেষে জুলাই মাসে নামবে আশ্বিনা ও বারোমাসি জাতের আম। কৃষিবিদদের মতে, এই দীর্ঘ মৌসুম জুড়ে আমপ্রেমীরা একের পর এক ভিন্ন স্বাদের আমের স্বাদ নিতে পারবেন, যার সূচনা হলো আজকের এই মধুমাসের সওগাত গোপালভোগের মাধ্যমে।

ভোক্তা ও খুচরা বিক্রেতাদের বক্তব্য

পাইকারি বাজারে আমের দাম চড়া হওয়ায় রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের খুচরা বাজারে গোপালভোগ আম প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ঢাকার কাওরান বাজারের এক খুচরা ফল ব্যবসায়ী বলেন, “প্রথম দিকে পাইকারিতেই আমের কেনা চড়া, তার ওপর পরিবহন খরচ ও লেবার খরচ মেলালে কেজিতে দাম একটু বেশিই পড়ে। তবে গোপালভোগের স্বাদ অন্যরকম হওয়ায় ক্রেতারা দাম নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না।” সাধারণ ভোক্তারা বলছেন, দাম একটু বেশি হলেও যদি ক্ষতিকারক রাসায়নিক মুক্ত আম পাওয়া যায়, তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। জ্যৈষ্ঠের এই তপ্ত দুপুরে আমের একেকটি কোয়া যেন তৃষ্ণার্ত বুকে প্রশান্তি এনে দেয়।

অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা

আম শুধুমাত্র একটি সুস্বাদু ফলই নয়, এটি রাজশাহী ও নাটোর অঞ্চলের প্রধান অর্থকরী ফসল। প্রতি বছর এই আমকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক লেনদেন হয়। ঝুড়ি তৈরি, পরিবহন খাত, প্যাকেজিং এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এই মৌসুমে লাখো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা মূলত গ্রামীণ অর্থনীতিতে এক অনন্য মধুমাসের সওগাত হিসেবে আবির্ভূত হয়। এছাড়াও এবার ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে রাজশাহীর আম রপ্তানির বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফ্রুট ব্যাগিং প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত প্রিমিয়াম কোয়ালিটির আম যখন বিদেশে পাঠানো হবে, তখন বিশ্ব দরবারে আমাদের এই মধুমাসের সওগাত দেশের ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল করবে। ফলন ও বিপণনের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আমের এই আন্তর্জাতিক বাজার দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখবে। ফলে, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের বিবেচনায় এই মধুমাসের সওগাত কেবল মানুষের রসনা তৃপ্তিই করছে না, বরং দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকেও দারুণভাবে চাঙ্গা করছে।

 

মৌসুমের প্রথম দিনে আমের সরবরাহ কিছুটা কম এবং দাম চড়া থাকলেও, আমের চমৎকার মান ও সুমিষ্ট স্বাদ ক্রেতাদের আকর্ষণ ধরে রেখেছে। প্রশাসনের কড়া নজরদারিতে কেমিক্যালমুক্ত নিরাপদ আম বাজারজাত করার এই প্রক্রিয়া সত্যিই প্রশংসনীয়। গোপালভোগ আম পাড়ার মধ্য দিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতিতে যে মধুমাসের সওগাত শুরু হলো, তা আগামী দুই থেকে তিন মাস ধরে পুরো অঞ্চলকে উৎসবমুখর রাখবে। তবে কেবল প্রথম দিনই নয়, পুরো মৌসুম জুড়ে যেন ক্রেতারা ন্যায্যমূল্যে ফল কিনতে পারেন, সেদিকেও নজর রাখা দরকার। পরিশেষে বলা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার পাশাপাশি আপামর বাঙালির রসনা তৃপ্তিতে এই মধুমাসের সওগাত বরাবরের মতোই এক অনন্য ভূমিকা পালন করবে। বছরের এই বিশেষ সময়টিতে নিরাপদ উপায়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে এই মধুমাসের সওগাত পৌঁছে যাক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর