৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

 

হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু
হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

দেশের বর্তমান স্বাস্থ্য পরিস্থিতিতে আবারও উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে একটি বেদনাদায়ক খবর। হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুরা এই সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে, যা জনমনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা না পাওয়া এবং টিকাদানের ঘাটতি এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ।

আজকের এই বিস্তারিত প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব হাম কী, এর লক্ষণগুলো কী কী, কেন শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ছে এবং এই মহামারি থেকে আমাদের সন্তানদের কীভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব।

হাম কী এবং এটি কীভাবে ছড়ায়?

হাম বা মিজেলস হলো একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি সাধারণত প্যারামিক্সোভাইরাস পরিবারের একটি ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। এই রোগটি মূলত শিশুদের শ্বাসনালিকে আক্রমণ করে।

বায়ুর মাধ্যমে সংক্রমণ: আক্রান্ত শিশুর হাঁচি, কাশি বা কথা বলার মাধ্যমে এই ভাইরাস বাতাসে ছড়ায়।

প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ: আক্রান্ত শিশুর লালা বা নাসিকার রসের সংস্পর্শে এলে সুস্থ শিশুও দ্রুত আক্রান্ত হতে পারে।

বাতাসে স্থায়িত্ব: একটি বন্ধ ঘরে আক্রান্ত শিশু হাঁচি বা কাশি দিলে, সেই ভাইরাস বাতাসে প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে।

বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা

সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কতা সংকেত। হাসপাতালগুলোতে দিন দিন আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, মারা যাওয়া শিশুদের বেশিরভাগেরই তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং পুষ্টিহীনতার সমস্যা ছিল।

টিকাদানের হার কমে যাওয়া এবং সচেতনতার অভাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করে হাসপাতালে না আনার ফলেই এই ৫টি শিশু মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হামের প্রধান লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ

হামের লক্ষণগুলো সাধারণত ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ১০ থেকে ১৪ দিন পর প্রকাশ পেতে শুরু করে। অভিভাবক হিসেবে আপনার শিশুর মধ্যে নিচের লক্ষণগুলো দেখা যাচ্ছে কিনা তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করুন:

প্রাথমিক লক্ষণ (প্রথম ৩-৪ দিন)

তীব্র জ্বর (১০০ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হতে পারে)।

অনবরত শুকনো কাশি এবং সর্দি।

চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং চোখ দিয়ে পানি পড়া।

আলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হওয়া বা ফটোফোবিয়া।

মুখের ভেতরের অংশে, বিশেষ করে গালের ভেতরের দিকে ছোট ছোট সাদাটে দাগ (কোপলিক স্পটস)।

দ্বিতীয় পর্যায় (র‍্যাশ বা ফুসকুড়ি ওঠা)

জ্বরের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশ দেখা দেয়।

এই র‍্যাশ সাধারণত প্রথমে কান ও মুখের চারপাশ থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীতে গলা, বুক, পিঠ এবং পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।

র‍্যাশ ওঠার পর জ্বর আরও তীব্র হতে পারে এবং শিশু ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়ে।

কেন হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে?

হাম নিজে যতটা না বিপজ্জনক, তার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক এর পরবর্তী জটিলতাগুলো। হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর পেছনেও এই মারাত্মক জটিলতাগুলোই দায়ী।

জরুরি তথ্য: সাধারণত অপুষ্টিতে ভোগা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকা শিশুরা হামের কারণে তীব্র স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ে।

প্রধান জটিলতাগুলো নিচে আলোচনা করা হলো

নিউমোনিয়া (ফুসফুসের সংক্রমণ): হামের কারণে শিশুদের ফুসফুস মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হতে পারে। তীব্র শ্বাসকষ্ট এবং ফুসফুসে পানি জমার কারণে অনেক শিশু মারা যায়।

মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস): এটি অত্যন্ত বিরল তবে মারাত্মক একটি জটিলতা। এর ফলে শিশুর খিঁচুনি হতে পারে এবং শিশু অচেতন হয়ে যেতে পারে।

তীব্র ডায়রিয়া এবং ডিহাইড্রেশন: হামের কারণে শিশুর পরিপাকতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে মারাত্মক ডায়রিয়া দেখা দেয়। শরীর থেকে পানি ও লবণ বের হয়ে শিশু দ্রুত শকে চলে যেতে পারে।

কানের সংক্রমণ: অনেক শিশুর কানের ভেতরে ইনফেকশন হয়, যা সঠিক সময়ে চিকিৎসা না করালে স্থায়ী বধিরতার কারণ হতে পারে।

একমাত্র উপায় টিকাদান

হাম একটি সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিলে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর মতো দুঃখজনক ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।

আরো পড়ুন :আড়াই ঘণ্টা পর পদ্মায় ডুবে যাওয়া বাস উদ্ধার

এমএমআর  বা হামের টিকা প্রদান

হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হলো টিকা। সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) আওতায় শিশুদের বিনামূল্যে এই টিকা দেওয়া হয়।

প্রথম ডোজ: শিশুর বয়স ৯ মাস পূর্ণ হলে প্রথম ডোজ দিতে হবে।

দ্বিতীয় ডোজ: শিশুর বয়স ১৫ মাস হলে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে।

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো

হামে আক্রান্ত শিশুদের অন্ধত্ব এবং মৃত্যুর ঝুঁকি কমাতে ভিটামিন ‘এ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আক্রান্ত শিশুকে নির্দিষ্ট মাত্রায় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে।

আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা

বাড়ির কোনো শিশুর হাম হলে তাকে অন্য শিশুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখতে হবে। তার ব্যবহৃত জামাকাপড়, থালাবাসন আলাদা করে ধুয়ে নিতে হবে।

কখন দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাবেন?

হামের সাধারণ উপসর্গগুলো ঘরোয়া চিকিৎসায় কমলেও কিছু লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে যেতে হবে। হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর মূল কারণ ছিল সঠিক সময়ে হাসপাতালে না নেওয়া।

শিশুর শ্বাসকষ্ট হলে বা বুক ভেতরের দিকে দেবে গেলে।

শিশু অতিরিক্ত দুর্বল হয়ে পড়লে এবং কিছুই খেতে না পারলে।

যদি শিশুর খিঁচুনি হয় বা সে অচেতন হয়ে পড়ে।

তীব্র ডায়রিয়া এবং বমি হলে।

জ্বর যদি ১০৩ বা ১০৪ ডিগ্রির নিচে না নামে এবং শিশু অনবরত কান্নাকা্টি করে।

সামাজিক সচেতনতা এবং আমাদের দায়িত্ব

হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজ থেকে এই রোগটি এখনও সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। এই রোগ প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো অপরিহার্য।

আপনার এলাকার কোনো শিশু টিকাদান থেকে বাদ পড়েছে কিনা তা খেয়াল রাখুন।

কোনো শিশুর শরীরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তার পরিবারকে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিন।

লোকজ বিশ্বাস বা কবিরাজি চিকিৎসার পেছনে সময় নষ্ট না করে বৈজ্ঞানিক চিকিৎসাকে প্রাধান্য দিন।

দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও জরুরি সতর্কতা

বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশুদের মধ্যে সংক্রামক রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে টিকাদান কর্মসূচির সীমাবদ্ধতা এবং অসচেতনতার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠছে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর খবরটি আমাদের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর মতো দুঃখজনক ঘটনা ঘটছে। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে প্রতিটি পরিবারকে সচেতন হতে হবে এবং শিশুদের সুরক্ষায় টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি আর না ঘটে

 

 

শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যুর মতো ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সচেতনতা, সঠিক সময়ে টিকাদান এবং দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের মাধ্যমেই আমরা আমাদের শিশুদের এই প্রাণঘাতী রোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারি। আপনার শিশুর টিকাদানের কার্ডটি আজই পরীক্ষা করুন এবং কোনো ডোজ বাদ পড়ে থাকলে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন। সুস্থ শিশু, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর