৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে

দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে,

 

দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে,
দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে

আমাদের সমাজের সবচেয়ে কোমলমতী এবং অবুঝ অংশ হলো শিশুরা। একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে সেই দেশের শিশুরা কেমন পরিবেশে বেড়ে উঠছে তার ওপর। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, বর্তমানে দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। খবরের কাগজ খুললেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখ রাখলেই প্রতিনিয়ত চোখে পড়ে শিশুদের ওপর নানাবিধ নির্মমতার চিত্র। এটি কেবল কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। এই আর্টিকেলে আমরা আলোচনা করব কেন এই নির্যাতন বাড়ছে, এর ভয়াবহ প্রভাব কী এবং এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়গুলো কী কী।

শিশু নির্যাতন কী?

সাধারণ অর্থে শিশুর শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতন কিংবা অবহেলা করাকেই শিশু নির্যাতন বলা হয়। যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী কেউ কোনো শিশুর ওপর বলপ্রয়োগ করে বা তাকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে, তখনই তা নির্যাতনের আওতায় পড়ে। বর্তমানে দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এবং এর ধরনগুলোও দিন দিন আরও বেশি নৃশংস হয়ে উঠছে।

কেন দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে?

হঠাৎ করেই সমাজে শিশু নির্যাতন বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে বেশ কিছু সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে। নিচে প্রধান কারণগুলো আলোচনা করা হলো:

নৈতিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয়

বর্তমান সমাজে মানুষের মধ্যে সহনশীলতা এবং নৈতিক মূল্যবোধ চরমভাবে হ্রাস পেয়েছে। পারিবারিক বন্ধনগুলো শিথিল হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক সময় শিশুরা পরিবারের ভেতরেই নিরাপদ বোধ করে না। মানবিক গুণাবলীর অভাবের কারণেই দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

 আইনের সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগের অভাব

আমাদের দেশে শিশু সুরক্ষায় বেশ কিছু চমৎকার আইন রয়েছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই আইনগুলোর সঠিক এবং দ্রুত বাস্তবায়ন খুব একটা দেখা যায় না। অপরাধীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে অথবা বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফলেই দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, কারণ অপরাধীরা মনে করে তারা অপরাধ করলেও পার পেয়ে যাবে।

দারিদ্র্য ও শিশুশ্রম

দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত হয়ে অনেক বাবা-মা তাদের সন্তানদের অল্প বয়সেই কাজে পাঠিয়ে দেন। গৃহকর্মী হিসেবে বা বিভিন্ন কলকারখানায় কাজ করতে গিয়ে এই শিশুরা মারাত্মক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে শিশুরা যখন শ্রমের বাজারে প্রবেশ করে, তখন তাদের সুরক্ষার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

আকাশ সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির অপব্যবহার

ইন্টারনেট এবং প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে মানুষের মনস্তত্ত্বে এক ধরনের বিকৃতি দেখা দিচ্ছে। পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা এবং সহিংস কন্টেন্ট দেখার ফলে অনেকের মধ্যেই অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার সহজ শিকার হচ্ছে কোমলমতী শিশুরা।

শিশু নির্যাতনের বিভিন্ন রূপ

আমাদের সমাজে শিশুরা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে প্রধান কয়েকটি রূপ নিচে উল্লেখ করা হলো:

শারীরিক নির্যাতন: সামান্য ভুলের জন্য শিশুকে নির্মমভাবে প্রহার করা, ছ্যাঁকা দেওয়া বা আটকে রাখা।

মানসিক নির্যাতন: শিশুকে সারাক্ষণ গালমন্দ করা, ভয় দেখানো, তুলনা করে হীনম্মন্যতায় ভুগতে বাধ্য করা।

যৌন নির্যাতন: বর্তমানে এই ধরনের অপরাধ সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক রূপ ধারণ করেছে। পরিচিত বা অপরিচিত মানুষের দ্বারা শিশুরা যৌন হেনস্থার শিকার হচ্ছে।

অর্থনৈতিক শোষণ বা শিশুশ্রম: ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের ব্যবহার করা এবং তাদের প্রাপ্য মজুরি থেকে বঞ্চিত করা।

আরো পড়ুন:হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু

শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ প্রভাব

একটি শিশুর ওপর যখন নির্যাতন চালানো হয়, তখন তার প্রভাব শুধু সাময়িক থাকে না, বরং তা দীর্ঘমেয়াদী রূপ নেয়। দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বিধায় আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এক গভীর সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে।

মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া

নির্যাতনের শিকার শিশুরা চরম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়। তারা হীনম্মন্যতা, বিষণ্ণতা এবং একাকীত্বে ভোগে। তাদের স্বাভাবিক মানসিক বিকাশ থমকে দাঁড়ায় এবং তারা কাউকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না।

আচরণগত পরিবর্তন ও অপরাধপ্রবণতা

যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে নির্যাতন দেখে বা নিজে নির্যাতনের শিকার হয়, বড় হয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেও এক ধরনের সহিংস আচরণ তৈরি হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, শৈশবের এই ক্ষোভ বড় হয়ে তাদের অপরাধ জগতের দিকে ঠেলে দেয়।

শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হওয়া

নির্যাতনের কারণে শিশুরা বিদ্যালয় থেকে দূরে সরে যায়। তারা পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারে না, যার ফলে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি পায়। একটি শিক্ষিত জাতি গঠনে যা বড় বাধা।

শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে আমাদের করণীয়

যেহেতু দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, তাই এখনই সময় সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত স্তরে আমাদের বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

 আইনের কঠোর ও দ্রুত বাস্তবায়ন

শিশু নির্যাতনকারীদের জন্য এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যা দেখে অন্যরা এই ধরনের অপরাধ করার সাহস না পায়। বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে বিচার কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি

পাড়া-মহল্লায়, স্কুলে এবং ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোতে শিশু অধিকার ও শিশু সুরক্ষা নিয়ে আলোচনা করতে হবে। সবাইকে বোঝাতে হবে যে, শিশুদের গায়ে হাত তোলা বা তাদের অবহেলা করা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।

পারিবারিক নজরদারি ও সচেতনতা

বাবা-মাকে তাদের সন্তানদের প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে। সন্তান কার সাথে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, তার আচরণের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে সার্বক্ষণিক খেয়াল রাখতে হবে। শিশুদের গুড টাচ এবং ব্যাড টাচ সম্পর্কে সচেতন করতে হবে।

গণমাধ্যমের ভূমিকা

টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে। সচেতনতামূলক নাটক, শর্ট ফিল্ম এবং টকশো আয়োজনের মাধ্যমে জনমত গড়ে তুলতে হবে।

 

শিশুরাই আমাদের আগামী দিনের পথপ্রদর্শক। তাদের জন্য একটি নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলা আমাদের প্রত্যেকের নৈতিক দায়িত্ব। বর্তমানে দেশে শিশু নির্যাতন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে—এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তবে আমরা যদি সবাই নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই, তবে অবশ্যই এই অন্ধকার অধ্যায় থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব। আসুন, আজই প্রতিজ্ঞা করি—শিশুদের ওপর সব ধরনের সহিংসতা বন্ধে আমরা এক হয়ে কাজ করব এবং প্রতিটি শিশুর জন্য একটি সুরক্ষিত সোনালী ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করব।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর