৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ

ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ

 

ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ
ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ

দক্ষিণ এশিয়ার ভূপ্রাকৃতিক গঠনে বড় ধরনের ঝাঁকুনি দিয়ে গেল সাম্প্রতিক একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ। আকস্মিক এই ভূকম্পনে পুরো অঞ্চল জুড়ে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে বহুতল ভবনের বাসিন্দারা ভয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। হিমালয় অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে এই ভূকম্পন অনুভূত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ও ভূতত্ত্ববিদরা।

এই প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব কীভাবে এই ভূমিকম্প সংঘটিত হলো, কোন কোন দেশ এতে বেশি প্রভাবিত হয়েছে এবং বাংলাদেশসহ পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর জন্য এটি কী ধরনের ভবিষ্যৎ সতর্কবার্তা দিচ্ছে।

ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ও তীব্রতা

ভূমিকম্পের মূল উৎপত্তিস্থল ছিল পাহাড়ি দেশ ভুটানের অভ্যন্তরে। রিখটার স্কেলে এই ভূমিকম্পের তীব্রতা বেশ মাঝারি থেকে শক্তিশালী মাত্রার ছিল। ভূগর্ভের গভীরে টেকটোনিক প্লেটের আকস্মিক স্থানচ্যুতির কারণে এই শক্তির সৃষ্টি হয়, যা মুহূর্তের মধ্যে কয়েকশত কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

যেহেতু ভুটান হিমালয় পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত, তাই এই অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবেই ভূমিকম্পপ্রবণ। কিন্তু এবারের কম্পনটি এতটাই শক্তিশালী ছিল যে তা শুধু ভুটানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর ফলে ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক এবং ভৌগোলিক সীমানাকে এক সুতোয় আতঙ্কের মধ্যে ফেলে দেয়।

যেসব দেশে কম্পন অনুভূত হয়েছে

ভুটানের এই শক্তিশালী ভূকম্পন শুধু তাদের নিজস্ব সীমান্তের মধ্যে আটকে ছিল না। উৎপত্তিস্থল থেকে সৃষ্ট ভূকম্পন তরঙ্গ বা সিসমিক ওয়েভ খুব দ্রুত চারপাশের দেশে ছড়িয়ে পড়ে। নিচে বিস্তারিত দেওয়া হলো কোন কোন দেশ এই ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে

ভুটান: ভূমিকম্পের মূল কেন্দ্রস্থল হওয়ায় এখানেই কম্পনের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি। পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক কাঁচা ঘরবাড়ি এবং রাস্তায় ফাটল ধরার খবর পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ: ভুটানের ভৌগোলিক অবস্থানের খুব কাছে হওয়ায় বাংলাদেশে তীব্র কম্পন অনুভূত হয়। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকা, রংপুর, সিলেট এবং দিনাজপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

ভারত: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো, যেমন—আসাম, সিকিম, পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের একাংশ এই ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে কেঁপে ওঠে।

নেপাল: হিমালয় অঞ্চলের আরেক দেশ নেপালেও এই কম্পনের প্রভাব পড়ে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে।

চীন: ভুটানের সীমান্ত সংলগ্ন তিব্বত অঞ্চলেও এই ভূকম্পনের হালকা থেকে মাঝারি তরঙ্গ অনুভূত হয়েছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশে ভূমিকম্পের প্রভাব ও বর্তমান পরিস্থিতি

ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ—এই খবরটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে একযোগে কম্পনের খবর আসতে থাকে।

ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতি

রাজধানী ঢাকার বহুতল ভবনগুলোতে কম্পন খুব স্পষ্টভাবে বোঝা গেছে। দুপুরের দিকে বা রাতের দিকে (সময়ভেদে) যখন এই কম্পন হয়, তখন মানুষ আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নিচে নেমে আসে। অন্যদিকে, দেশের উত্তরাঞ্চল যেহেতু ভুটানের সবচেয়ে কাছে, তাই রংপুর এবং কুড়িগ্রাম অঞ্চলে ঝাঁকুনি ছিল তুলনামূলক তীব্র।

ক্ষয়ক্ষতি ও আতঙ্ক

স্বস্তির বিষয় এই যে, বাংলাদেশে বড় ধরনের কোনো ভবন ধস বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি। তবে আকস্মিক এই ঝাঁকুনিতে অনেক ভবনে হালকা ফাটল দেখা দেওয়ার গুঞ্জন শোনা গেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল আতঙ্ক। হুড়োহুড়ি করে ভবন থেকে নামতে গিয়ে কিছু মানুষ সামান্য আহত হয়েছেন।

কেন বারবার কাঁপছে এই অঞ্চল? 

ভূবিজ্ঞানীদের মতে, ভারতীয় প্লেট এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের সংযোগস্থলে এই অঞ্চলের অবস্থান। ভারতীয় প্লেটটি প্রতি বছর উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে এবং ইউরেশিয়ান প্লেটের নিচে ঢুকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এই দুটি বিশাল প্লেটের সংঘর্ষের ফলে হিমালয় পর্বতমালা সৃষ্টি হয়েছে এবং এই অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ভূগর্ভস্থ শক্তি জমা হয়।

যখন এই জমা হওয়া শক্তি আর ধরে রাখা সম্ভব হয় না, তখনই তা ভূমিকম্প আকারে বেরিয়ে আসে। এবারের ঘটনায় ঠিক তাই ঘটেছে। ভুটানের ভূগর্ভে জমে থাকা শক্তি মুক্ত হওয়ার কারণেই ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘ দিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, এই প্লেট সীমানায় যেকোনো সময় একটি মহাবিপর্যয়কারী ভূমিকম্প বা ‘মেগাআর্থকোয়েক’ ঘটতে পারে।

আরো পড়ুন :পল্লবীতে শিশুহত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড

ভূমিকম্পের সময় আমাদের করণীয়

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ওপর মানুষের কোনো হাত নেই, তবে সঠিক প্রস্তুতি ও সচেতনতা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমিয়ে আনতে পারে। ভূমিকম্পের সময় শান্ত থাকা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

ঘরের ভেতরে থাকলে: যদি আপনি বহুতল ভবনে থাকেন, তবে তাড়াহুড়ো করে নামার চেষ্টা করবেন না। শক্ত টেবিল, খাট বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন। মাথার সুরক্ষায় হাত বা বালিশ ব্যবহার করুন। জানালার কাচ বা ভারী আসবাবপত্র থেকে দূরে থাকুন।

লিফট ব্যবহার না করা: ভূমিকম্পের সময় কোনো অবস্থাতেই লিফট বা এলিভেটর ব্যবহার করবেন না। সিঁড়ি ব্যবহার করুন অথবা ঘরের নিরাপদ কোণে অবস্থান নিন।

বাইরে থাকলে: যদি আপনি খোলা জায়গায় থাকেন, তবে বহুতল ভবন, বৈদ্যুতিক খুঁটি, বড় গাছ এবং ওভারপাস থেকে দূরে সরে যান। খোলা মাঠ বা রাস্তায় অবস্থান নিন।

গাড়ি চালানোর সময়: গাড়ি নিরাপদ স্থানে থামিয়ে ভেতরেই বসে থাকুন। কোনো সেতু বা ফ্লাইওভারের নিচে গাড়ি থামাবেন না।

ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং বাংলাদেশের প্রস্তুতি

যেহেতু ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ, এটি আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা। বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ এবং বিশেষ করে ঢাকা শহরে অপরিকল্পিত ভবনের সংখ্যা অনেক বেশি। ৭ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার কোনো ভূমিকম্প যদি বাংলাদেশের কাছাকাছি কোথাও উৎপত্তি হয়, তবে তার ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

করণীয় পদক্ষেপ

বিল্ডিং কোড মেনে চলা: নতুন ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে জাতীয় বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে, যাতে ভবনগুলো ভূমিকম্প সহনশীল হয়।

মহড়া ও সচেতনতা: স্কুল, কলেজ এবং কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত ভূমিকম্প মোকাবিলা সংক্রান্ত মহড়ার আয়োজন করা উচিত।

উদ্ধারকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সসহ অন্যান্য জরুরি সেবা সংস্থাকে আরও আধুনিক প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ করতে হবে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও ভূবিজ্ঞানীদের ভূকম্পন পর্যবেক্ষণ

এই ঘটনার পর বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই দুর্যোগের খবর প্রকাশ করছে। তাদের মূল শিরোনাম ছিল যে, ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সিসমোলজিক্যাল তথ্যানুযায়ী, এই কম্পনটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম দূরপাল্লার ভূকম্পন তরঙ্গ। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনাটি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন কারণ যখনই ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ, তখনই স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ ফল্ট লাইনগুলো কতটা সক্রিয় এবং বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে।

উপগ্রহ ও প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ নজরদারি

আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট চিত্র অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম উপগ্রহের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখছেন যে, এই কম্পনের ফলে হিমালয় অঞ্চলের ভূত্বকের গঠনে কোনো সূক্ষ্ম পরিবর্তন এসেছে কিনা। যেহেতু ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ, তাই মহাকাশ গবেষণা সংস্থাগুলো এখন এই পুরো অঞ্চলের টেকটোনিক প্লেটের গতিবিধির ওপর বাড়তি নজর রাখছে, যেন ভবিষ্যতের সম্ভাব্য বড় ঝাঁকুনি সম্পর্কে কিছুটা আগে পূর্বাভাস পাওয়া যায়।

 

ভুটানের এই ভূমিকম্প আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল যে প্রকৃতির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। ভুটানের ভূমিকম্পে বাংলাদেশসহ কেঁপে উঠল ৫ দেশ—এই ঘটনাটি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের এখন থেকেই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক প্রস্তুতি গ্রহণের দিকে নজর দিতে হবে, যেন ভবিষ্যতের যেকোনো বড় বিপর্যয় থেকে আমরা আমাদের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করতে পারি।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর