২৮শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ১৫ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

অতিরিক্ত টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়া: মুদ্রাস্ফীতির চাপে দিশেহারা বাংলাদেশ

অতিরিক্ত টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়া: মুদ্রাস্ফীতির চাপে দিশেহারা বাংলাদেশ

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা ২৮ এপ্রিল, ২০২৬


​বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে টানাপোড়েন, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে নিত্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম। এই পরিস্থিতির মধ্যে সরকারের ব্যয় মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক অতিরিক্ত নতুন টাকা ছাপিয়ে বাজারে ছাড়ার বিষয়টি অর্থনীতিবিদদের মধ্যে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, উৎপাদন না বাড়িয়ে কেবল টাকা ছাপিয়ে ঘাটতি পূরণ করলে দেশ দীর্ঘমেয়াদী ‘হাইপার-ইনফ্লেশন’ বা অতি-মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকিতে পড়তে পারে।


​১. টাকা ছাপানোর প্রেক্ষাপট: কেন এই পথে হাঁটা?
​সাধারণত একটি দেশের সরকার যখন রাজস্ব আয় (ট্যাক্স) দিয়ে তার উন্নয়ন ও প্রশাসনিক ব্যয় মেটাতে পারে না, তখন তারা ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ নেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া এবং বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণে সরকার বড় ধরনের বাজেট ঘাটতির মুখে পড়েছে।
​এই ঘাটতি মেটাতে সরকার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পরিবর্তে সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন সরকারকে এই ঋণ দেয়, তখন তারা মূলত নতুন টাকা ছাপিয়ে (যাকে অর্থনীতিতে ‘হাইউইড মানি’ বলা হয়) বাজারে প্রবেশ করায়। গত অর্থবছর থেকে এই প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।


​২. মুদ্রাস্ফীতির আগুনে ঘি
​অর্থনীতির সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, বাজারে যদি পণ্য ও সেবার সরবরাহ না বাড়ে কিন্তু মানুষের হাতে টাকার পরিমাণ বেড়ে যায়, তবে পণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে।
​টাকার মান হ্রাস: অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর ফলে বাজারে টাকার সরবরাহ বেড়ে যায়, যা স্থানীয় মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ, আগে যে পণ্য ১০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে ১১০ বা ১২০ টাকা লাগছে।
​ভোক্তা পর্যায়ে প্রভাব: নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের জন্য এটি একটি মরণফাঁদ। বেতন বা আয় না বাড়লেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ সঞ্চয় হারিয়ে ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ছে।


​৩. বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভের ওপর চাপ
​নতুন টাকা ছাপানোর প্রভাব কেবল অভ্যন্তরীণ বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকে না, এটি বৈদেশিক মুদ্রার বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করে।
​ডলার সংকট: যখন স্থানীয় মুদ্রার সরবরাহ বেশি হয়, তখন মানুষ ও আমদানিকারকদের মধ্যে ডলার কেনার প্রবণতা বেড়ে যায়। এতে টাকার বিপরীতে ডলারের দাম আরও বেড়ে যায়।
​আমদানি ব্যয়: ডলারের দাম বাড়লে জ্বালানি তেল, সার এবং শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আগের চেয়ে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে দেশের উৎপাদন খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।


​৪. বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা: শ্রীলঙ্কা মডেলের আশঙ্কা?
​দেশের শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই পথটি অত্যন্ত পিচ্ছিল। তাদের মতে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করে কেবল ঘাটতি মেটাতে টাকা ছাপানো হলে তা অর্থনীতিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
​”সরকার যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা ধার করে, তখন তা সরাসরি মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দেয়। এটি এক ধরণের অদৃশ্য কর, যা সাধারণ মানুষের পকেট থেকে টাকা চুরি করে নেয়। উৎপাদন না বাড়িয়ে মুদ্রার সরবরাহ বাড়ানো কোনোভাবেই টেকসই সমাধান নয়।” — নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অর্থনীতি বিশ্লেষক।


​৫. ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা ও তারল্য সংকট
​অতিরিক্ত টাকা ছাপানোর ফলে ব্যাংকিং খাতে এক ধরণের কৃত্রিম ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছে, অন্যদিকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে ভুগছে। আমানতকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় অনেকে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।


​৬. উত্তরণের উপায়: কী করা উচিত?
​বর্তমান ঝুঁকি থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন:
​রাজস্ব নীতিতে সংস্কার: কেবল টাকা না ছাপিয়ে করের আওতা বাড়ানো এবং কর ফাঁকি রোধে কঠোর হতে হবে।
​বিলাসদ্রব্য আমদানি নিয়ন্ত্রণ: বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমাতে বিলাসদ্রব্য আমদানিতে আরও কড়াকড়ি আরোপ করতে হবে।
​সরকারি ব্যয় সংকোচন: উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অপ্রয়োজনীয় ও কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় বন্ধ করতে হবে।
​সুদ হারের সমন্বয়: মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে সুদের হার বাজারভিত্তিক করতে হবে।

​টাকা ছাপানো সাময়িকভাবে সরকারের আর্থিক সংকট দূর করলেও, এটি দেশের সাধারণ মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদী দুর্ভোগ বয়ে আনে। বাংলাদেশ বর্তমানে যে অর্থনৈতিক ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে, তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা। এখনই যদি লাগামহীনভাবে টাকা ছাপানো বন্ধ না করা হয়, তবে মুদ্রাস্ফীতির এই দানব নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে, যা সামগ্রিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলবে।
​সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে যৌথভাবে বাস্তবসম্মত ও সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা পায় এবং দেশের অর্থনীতি আবার সচল হয়।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর