১৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

অর্থনীতি কি গভীর সংকটের দ্বারপ্রান্তে? বহুমাত্রিক চাপ ও নীতিগত দোটানায় বাংলাদেশ

অর্থনীতি কি গভীর সংকটের দ্বারপ্রান্তে? বহুমাত্রিক চাপ ও নীতিগত দোটানায় বাংলাদেশ

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একাধিক সংকট একসঙ্গে দৃশ্যমান এবং পরস্পরকে আরও জটিল করে তুলছে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের স্থবিরতা, বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংক খাতের ভঙ্গুরতা এবং জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতের নতুন ঝুঁকি—সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ভিত্তিই যেন চাপের মুখে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অর্থনীতি কি ধীরে ধীরে একটি গভীর সংকটের দিকে এগোচ্ছে?

বহুমুখী চাপ: সংকটের প্রকৃত চিত্র

বর্তমান পরিস্থিতিকে একক কোনো সমস্যার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। বরং এটি একটি “মাল্টি-লেয়ারড ক্রাইসিস”, যেখানে প্রতিটি খাতের দুর্বলতা অন্য খাতকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত আয় কমিয়ে দিচ্ছে; আয় কমে গেলে চাহিদা কমছে; চাহিদা কমলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে; আর বিনিয়োগ কমলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এই চক্রটি এখন অর্থনীতির ভেতরে কার্যত একটি নেতিবাচক সর্পিল (negative spiral) তৈরি করেছে।

মূল্যস্ফীতি: সামষ্টিক স্থিতিশীলতার প্রধান বাধা

বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যা দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতির ইঙ্গিত দেয়। মজুরি বৃদ্ধির হার এর নিচে থাকায় বাস্তব আয় কমছে—ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর সামাজিক প্রভাবও গভীর: ভোক্তা ব্যয় কমে যাচ্ছে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং অর্থনীতির চাহিদা-ভিত্তিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল হয়ে পড়ছে।

নীতিগতভাবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদহার বাড়ানো হলেও এর একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে—ঋণের খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিনিয়োগ আরও কমে যায়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি জটিল দোটানায় পড়েছে: মূল্যস্ফীতি কমাবে, নাকি প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগকে উৎসাহ দেবে?

কর্মসংস্থান সংকট: প্রবৃদ্ধির ভঙ্গুরতা

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে একটি “কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি” (jobless growth) প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অর্থাৎ জিডিপি বাড়লেও সেই অনুপাতে নতুন চাকরি সৃষ্টি হচ্ছে না। বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও তাদের একটি বড় অংশ কাজ পাচ্ছে না বা কম উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত হচ্ছে।

বিশেষ করে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ কমে যাওয়া অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। এটি শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক উৎপাদনক্ষমতারও ক্ষতি করছে। ফলে জনমিতিক সুবিধা (demographic dividend) কাজে লাগানোর সুযোগ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

প্রবৃদ্ধি বনাম স্থিতিশীলতা: নীতির মৌলিক প্রশ্ন

টানা তিন বছর ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার অর্থ হলো—অর্থনীতি তার গতি হারাচ্ছে। তবে এই পরিস্থিতিতে অনেক অর্থনীতিবিদই মনে করেন, এখনই উচ্চ প্রবৃদ্ধির পেছনে ছোটা নয়; বরং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা জরুরি।

কারণ, অস্থিতিশীল অর্থনীতিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। বরং তা নতুন করে আর্থিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে। তাই “স্ট্যাবিলাইজেশন ফার্স্ট, গ্রোথ লেটার”—এই নীতিই এখন বেশি প্রাসঙ্গিক।

দারিদ্র্য ও বৈষম্য: অন্তর্নিহিত দুর্বলতা

দারিদ্র্য আবার বাড়তে শুরু করেছে—এটি অর্থনীতির একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে আয়বৈষম্য বেড়ে যাওয়া বোঝায় যে প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজে সমানভাবে বণ্টিত হচ্ছে না।

যখন জাতীয় আয়ের বড় অংশ অল্পসংখ্যক মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন সামগ্রিক ভোক্তা চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির সংকোচন অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির জন্য একটি বড় ঝুঁকি।

বিনিয়োগ ও আস্থার সংকট

বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা মূলত আস্থাহীনতার প্রতিফলন। নীতিগত অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা—সব মিলিয়ে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়ছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো “নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা” (policy credibility)। বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু প্রণোদনা নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ নীতির প্রয়োজন।

ব্যাংক খাত: অর্থনীতির দুর্বলতম স্তম্ভ

উচ্চ খেলাপি ঋণ, দুর্বল তদারকি এবং রাজনৈতিক প্রভাব—এই তিনটি কারণে ব্যাংক খাত গভীর সংকটে রয়েছে। ব্যাংক যদি কার্যকরভাবে ঋণ বিতরণ ও পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তবে পুরো অর্থনীতির অর্থপ্রবাহ ব্যাহত হয়।

ব্যাংক খাতের এই দুর্বলতা বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই খাতকে স্থিতিশীল করা সম্ভব নয়।

জ্বালানি ও বৈদেশিক খাত: বহিরাগত ঝুঁকির চাপ

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। এতে আমদানি ব্যয় বাড়বে, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ পড়বে এবং টাকার অবমূল্যায়ন ঘটতে পারে।

এর সরাসরি প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতির ওপর। একই সঙ্গে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় কমে গেলে চলতি হিসাবের ঘাটতি আরও বাড়তে পারে।

রাজস্ব সংকট: নীতির সীমাবদ্ধতা

রাজস্ব আহরণ কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয় করার সক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে সরকার চাইলেও বড় আকারে প্রণোদনা বা সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করতে পারছে না।

অন্যদিকে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে তা আবার মূল্যস্ফীতির চাপ সৃষ্টি করতে পারে—বিশেষ করে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া হয়।

সামগ্রিক মূল্যায়ন: সংকট কতটা গভীর?

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো “ক্রাইসিস জোন”-এ পুরোপুরি প্রবেশ না করলেও “হাই রিস্ক জোন”-এ রয়েছে। অর্থাৎ সঠিক নীতি গ্রহণ করা হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব; কিন্তু ভুল পদক্ষেপ বা বিলম্ব হলে সংকট আরও গভীর হতে পারে।

করণীয়: একটি সমন্বিত নীতি কাঠামো

বর্তমান বাস্তবতায় প্রয়োজন একটি সুসংহত ও সমন্বিত নীতি কৌশল, যার মূল উপাদানগুলো হতে পারে—

  • মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর ও ধারাবাহিক মুদ্রানীতি
  • ব্যাংক খাতে গভীর কাঠামোগত সংস্কার
  • বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা
  • জ্বালানি খাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও বিকল্প উৎস অনুসন্ধান
  • রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি ও কর ব্যবস্থার সংস্কার

অর্থনীতি কি গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে

দেশের অর্থনীতি এখন একসঙ্গে কয়েকটি চাপে আছে। মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি কমেনি, মানুষের আয় চাপে, কর্মসংস্থান পরিস্থিতি দুর্বল। বিনিয়োগও প্রত্যাশামতো বাড়ছে না।
এর মধ্যে নতুন করে জ্বালানি ও বৈদেশিক খাতে চাপের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ফলে সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখা আরও কঠিন হতে পারে।
এ অবস্থায় নতুন সরকারের সামনে মূল প্রশ্ন একটাই—কোন সমস্যাকে আগে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে? মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, ব্যাংক খাত, নাকি জ্বালানি।

বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যেই নতুন সরকার অর্থনীতির দায়িত্ব নিয়েছে। টানা তিন বছর ধরে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল। এতে অর্থনীতির পর্যাপ্ত নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করার সক্ষমতা কমে গেছে।

সংকটে আছে দেশের আর্থিক খাত। কয়েকটি ব্যাংক চালু রাখতে সরকারকে তারল্যসহায়তা দিতে হচ্ছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে, যা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের মানুষ। রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকারের ব্যয়ের সক্ষমতা সংকুচিত হয়েছে। ফলে এখন সরকার চাইলেও অর্থনীতিকে চাঙা করতে অর্থের খরচ বাড়াতে পারছে না।
প্রবাসী আয় বাড়ায় বৈদেশিক খাতের চাপ কিছুটা কমলেও রপ্তানি আরও দুর্বল হয়েছে। এর মধ্যে আবার মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অর্থনীতির আরও ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, রপ্তানি দুর্বল হতে পারে, প্রবাসী আয় কমতে পারে, আর তাতে চলতি হিসাবে ঘাটতি বাড়বে।

ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে টাকার আরও অবমূল্যায়নের আশঙ্কা আছে, যা মূল্যস্ফীতির হার আরও বাড়াবে। এখন জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাড়লে সরকারের আর্থিক জায়গা আরও সংকুচিত হবে।

সব মিলিয়ে, অর্থনীতি আগে থেকেই সমস্যায় ছিল, ছিল নানা ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা। আর এখন সেই অর্থনীতি আরও গভীর সংকটে পড়তে যাচ্ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ অবস্থায় স্থিতিশীলতা ফেরাতে, আস্থা পুনরুদ্ধার করতে, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে এবং  অর্থনীতিকে আরও টেকসই রাখতে একটি সুসংগঠিত সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কৌশল দরকার, আর এর সঙ্গে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার।

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। এটি একই সঙ্গে সংকট ও সম্ভাবনার মুহূর্ত। এখন গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করবে—অর্থনীতি কি স্থিতিশীলতার পথে ফিরবে, নাকি আরও গভীর সংকটে নিমজ্জিত হবে।

অতএব, সময়োপযোগী নীতি, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কার্যকর সংস্কারের সমন্বয়ই পারে এই বহুমাত্রিক চাপ থেকে অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে ফিরিয়ে আনতে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর