৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫: ঈদের আগে বাড়ি ফেরার পথে ঝরল প্রাণ, শোকের ছায়া

কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫: ঈদের আগে বাড়ি ফেরার পথে ঝরল প্রাণ, শোকের ছায়া

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫
কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫
কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানি ঈদের আনন্দ বিষাদে রূপ নিল ১৫টি পরিবারে। আজ ২৫ মে, ২০২৬ (সোমবার) ভোরের আলো ফোটার আগেই ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল (যমুনা সেতুর পূর্ব পাড়) এলাকায় রডবোঝাই একটি খোলা ট্রাক উল্টে খাদে পড়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই রডের নিচে চাপা পড়ে ও পানিতে ডুবে অন্তত ১৫ জন শ্রমজীবী মানুষ নিহত হয়েছেন। এই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন, যাদের মধ্যে অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। মহাসড়কে কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের এই নির্মম খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর পুরো এলাকায় এবং নিহতদের নিজ গ্রামে কান্নার রোল পড়েছে।

পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, নিহতদের বেশিরভাগই উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বাসিন্দা। তারা কম খরচে বাড়ি ফিরতে রডবোঝাই ওই ট্রাকের ওপর চড়েছিলেন। তবে ভোরের এই অসতর্ক মুহূর্তে চালকের ক্লান্তি ও অতিরিক্ত গতির কারণেই মূলত এই প্রাণহানি ঘটেছে।

যেভাবে ঘটেছিল ভোরের সেই বিভীষিকা

স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রডবোঝাই উত্তরবঙ্গগামী ট্রাকটি আজ সোমবার ভোর আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে যমুনা সেতুর পূর্ব পাড়ের সরাতৈল নামক এলাকায় পৌঁছায়। এ সময় ট্রাকটির গতি অত্যন্ত বেশি ছিল। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাড়িটি মহাসড়কের পাশে গভীর খাদে উল্টে যায়। ট্রাকের ওপরে থাকা রডগুলো ছিটকে গিয়ে নিচে বসে থাকা যাত্রীদের ওপর পড়ে। রডের ভারী ওজন এবং খাদের জমে থাকা নোংরা পানির কারণে যাত্রীরা নিশ্বাস বন্ধ হয়ে ও পিষ্ট হয়ে মারা যান। ঘটনাস্থলেই কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয়রা ছুটে এসে উদ্ধারকাজ শুরু করেন এবং পুলিশকে খবর দেন।

ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের যৌথ উদ্ধার অভিযান

ভয়াবহ এই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানা পুলিশ এবং এলেঙ্গা ও টাঙ্গাইল ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। উদ্ধারকর্মীরা ক্রেন ব্যবহার করে ভারী রডগুলো সরিয়ে একের পর এক লাশ বের করতে শুরু করেন। পানির নিচে আরও কোনো দেহ আটকে আছে কিনা তা নিশ্চিত করতে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলও উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। উদ্ধার অভিযান শেষে দুপুরের দিকে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করা হয় যে, কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এছাড়াও আহত অন্তত ১০ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঈদ যাত্রায় জীবনের ঝুঁকি ও অসচেতনতা

আসন্ন কোরবানি ঈদকে সামনে রেখে ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকা থেকে ঘরমুখো মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে। গণপরিবহনের অতিরিক্ত ভাড়া এবং টিকিটের সংকটের কারণে প্রতি বছরই নিম্নআয়ের মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্যবাহী ট্রাক, পিকআপ বা লরিতে করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হন। আজ ভোরের এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে, প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও মহাসড়কে এই ধরণের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা বন্ধ হচ্ছে না। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কড়া নজরদারির অভাব এবং যাত্রীদের অসচেতনতাই আজ কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জন মানুষের অকাল মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নিহতদের পরিচয় ও স্বজনদের আহাজারি

হাসপাতাল ও পুলিশ সূত্র থেকে নিহতদের প্রাথমিক পরিচয় পাওয়া গেছে। তাদের অধিকাংশের বাড়ি গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম এবং রংপুর জেলায়। তারা মূলত ঢাকায় দিনমজুর, রিকশাচালক বা পোশাক কারখানার শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ঈদের ছুটিতে পরিবারের সাথে আনন্দ ভাগ করে নিতে তারা ট্রাকে চড়েছিলেন। কিন্তু এক নিমেষেই সব আনন্দ শেষ হয়ে গেল। টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের পরিবারগুলো এখন সম্পূর্ণ অভিভাবকহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়েছে।

আহতদের চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের বক্তব্য

দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে ৫ জনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাদের শরীরের বিভিন্ন অংশে রডের আঘাতে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছে এবং অনেকের হাড় ভেঙে গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য ২ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরো পড়ুনঃ এক ধাক্কায় প্রবাসী আয় বাড়ল ২৫ শতাংশ

হাইওয়ে পুলিশের বক্তব্য ও তদন্ত কমিটি গঠন

দুর্ঘটনার বিষয়ে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, চালক সারারাত গাড়ি চালানোর কারণে ভোরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, যার ফলে এই নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পরপরই চালক ও হেলপার পালিয়ে গেছে।” এদিকে, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান এবং দায়ীদের চিহ্নিত করতে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ আশ্বস্ত করেছে যে, চালকের অবহেলা প্রমাণিত হলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মহাসড়কে পণ্যবাহী ট্রাকে যাত্রী পরিবহন রোধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা

এই ঘটনার পর নড়েচড়ে বসেছে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন। কোরবানি ঈদের আগে হাইওয়েতে আর কোনো খোলা ট্রাকে বা লরিতে যাত্রী পরিবহন করতে দেওয়া হবে না বলে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তল্লাশি জোরদার করা হচ্ছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ট্রাকে যাত্রী তুললে চালকের লাইসেন্স বাতিল এবং গাড়ি জব্দ করা হবে। তবে সাধারণ মানুষের মতে, যদি আগেই এই নিয়ম কঠোরভাবে মানা হতো, তবে আজ মহাসড়কে কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের এই রক্তক্ষয়ী দৃশ্য দেখতে হতো না।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ক্ষোভ ও দাবি

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কাজ করা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এই ঘটনায় গভীর শোক ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, প্রতি বছর ঈদের আগে মহাসড়কগুলোতে ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং লাইসেন্সবিহীন চালকদের আনাগোনা বেড়ে যায়। প্রশাসনের চোখের সামনে দিয়ে ট্রাকে করে মানুষ যাতায়াত করলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। বক্তারা অবিলম্বে মহাসড়কগুলোতে সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো এবং চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি জানান। সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না ফিরলে কালিহাতীতে ট্রাক উল্টে নিহত ১৫ জনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা

এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং জেলা প্রশাসক। সরকারের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রত্যেক পরিবারকে দাফন-কাফনের খরচ বাবদ তাৎক্ষণিকভাবে ২৫,০০০ টাকা এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য ১৫,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক বলেন, “যাদের প্রাণ হারিয়েছে তাদের এই ক্ষতি পূরণ হওয়ার নয়, তবে সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সব ধরণের মানবিক সহায়তা দেওয়া হবে।” স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া দ্রুত করতে জেলা প্রশাসন কাজ করছে।

 

ঈদের ঠিক আগ মুহূর্তে ঘরমুখো ১৫টি তাজা প্রাণের এই অকাল মৃত্যু কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একটি দুর্ঘটনা কেবল কয়েকটি প্রাণ কেড়ে নেয় না, বরং পুরো পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের সবার উচিত যাতায়াতের ক্ষেত্রে সচেতন হওয়া এবং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পণ্যবাহী যানবাহনে চড়া থেকে বিরত থাকা। একই সাথে, প্রশাসনকেও কেবল দুর্ঘটনার পর নয়, বরং আগে থেকেই আইন বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স নীতি দেখাতে হবে। আমরা আশা করি, এই তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হবে এবং ভবিষ্যতে মহাসড়কে যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর