দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সম্প্রতি হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায়, নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। বিশেষ করে, নয় মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যেও হাম শনাক্ত হওয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি অনুযায়ী শিশুকে হামের প্রথম ডোজ দেওয়া হয় নয় মাস পূর্ণ হওয়ার পর এবং দ্বিতীয় ডোজ পনের মাসে। ফলে, এর আগের সময়টুকুতে শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ; যা শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে দ্রুত একজন থেকে অন্যজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে! সাধারণত, শিশুদের রোগ হিসেবে পরিচিত হলেও প্রাপ্তবয়স্করাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন এবং অনেক ক্ষেত্রে জটিলতাও বেশি দেখা যায়। তবে, অল্পবয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে এই রোগ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
কেন ৯ মাসের আগে টিকা দেওয়া হয় না?

জন্মের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত শিশু তার মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে কিছু সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা পায়। যদি মা আগে হামের টিকা নিয়ে থাকেন বা কখনো হামে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে তাঁর শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি গর্ভের শিশুর শরীরেও পৌঁছে যায়। এই অ্যান্টিবডি জন্মের পর কয়েক মাস শিশুকে সুরক্ষা দেয়।
কিন্তু এই সময়ের মধ্যে শিশুকে হামের টিকা দিলে সেটি কার্যকরভাবে কাজ নাও করতে পারে। কারণ, মায়ের অ্যান্টিবডি টিকার প্রতিক্রিয়াকে বাধা দেয়। ফলে পরবর্তী সময়ে শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই নয় মাস বয়স পূর্ণ হওয়ার আগে সাধারণত হামের টিকা দেওয়া হয় না।
তবে বাস্তবতা হলো, সব শিশুই সমান সুরক্ষা পায় না। অনেক মা পূর্ণ টিকা নেননি কিংবা তাঁদের শরীরে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি তৈরি হয়নি। আবার কোনো কোনো শিশুর ক্ষেত্রে এই অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। ফলে, নয় মাসের আগেই সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।
কেন বাড়ছে হামের সংক্রমণ?

চিকিৎসকদের মতে, কয়েকটি কারণে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে—
প্রথমত, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতা থেকে কিছু শিশু বাদ পড়ে যাচ্ছে। ফলে, তাদের শরীরে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হচ্ছে না।
দ্বিতীয়ত, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
তৃতীয়ত, অপুষ্টি ও ভিটামিন এ–এর ঘাটতি শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে।
চতুর্থত, অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অসচেতনতা ও টিকা নিয়ে ভ্রান্ত ধারণাও সমস্যা বাড়াচ্ছে।
এই কারণগুলো মিলেই বর্তমানে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখছে। এখন জনসচেতনার বিকল্প নেই।
অল্পবয়সী শিশুদের জন্য কেন ঝুঁকি বেশি?
৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও পুরোপুরি বিকশিত হয় না। ফলে, হাম হলে তাদের শরীরে দ্রুত জটিলতা দেখা দিতে পারে। নিউমোনিয়া, মারাত্মক ডায়রিয়া, অপুষ্টি, কান পাকা, এমনকি মস্তিষ্কের প্রদাহ পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ভিটামিন এ–এর ঘাটতির কারণে চোখের সমস্যা দেখা দেয়, যা অন্ধত্বের ঝুঁকি বাড়ায়।
এ ছাড়া হামের কারণে শিশুর শরীর সাময়িকভাবে অন্যান্য সংক্রমণের প্রতিও দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ বা মাসেও নানা অসুখে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এই বয়সে সংক্রমণ প্রতিরোধই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
যেভাবে সুরক্ষিত রাখবেন শিশুকে
বর্তমান পরিস্থিতিতে নয় মাসের কম বয়সী শিশুকে সুরক্ষিত রাখতে অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা খুবই জরুরি।
সংক্রমণ এড়ানো
অপ্রয়োজনে শিশুকে বাইরে না নেওয়াই ভালো। ভিড়, বাজার বা সংক্রমণপ্রবণ স্থানে নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। অসুস্থ ব্যক্তির সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন।
পরিবারে সতর্কতা
বাড়িতে কারও জ্বর, কাশি বা শরীরে র্যাশ দেখা দিলে তাকে আলাদা রাখুন। প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করুন, বিশেষ করে শিশুর কাছাকাছি গেলে। এর সাথে শিশুকে র্স্পশ করার সময় অবশ্যই সচেতন থাকতে হবে।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা
শিশুকে ধরার আগে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুতে হবে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করাও কার্যকর। শিশুর কাপড়, খেলনা ও ব্যবহার্য জিনিস নিয়মিত পরিষ্কার রাখা জরুরি।
মায়ের দুধের গুরুত্ব
জন্মের পর ছয় মাস পর্যন্ত একচেটিয়া বুকের দুধ শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর বয়স অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার যোগ করতে হবে, যাতে শিশুর শরীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে পারে।
ভিটামিন-এ নিশ্চিত করা
ভিটামিন এ শিশুর রোগ প্রতিরোধক্ষমতা জোরদার করে এবং হামের জটিলতা কমাতে সহায়তা করে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী বয়সভিত্তিক ডোজ নিশ্চিত করা উচিত।
সময়মতো টিকাদান
৯ মাস পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো এলাকায় সংক্রমণ বেশি হলে বিশেষ পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আগেই টিকা দেওয়া হতে পারে।
লক্ষণ চিনে রাখা জরুরি
হামের লক্ষণ সাধারণত ভাইরাস সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে দেখা দেয়। শুরুতে জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায়। এরপর মুখের ভেতরে ছোট সাদাটে দাগ দেখা দেয়, যা হামের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। কয়েক দিনের মধ্যে মুখ থেকে শুরু করে সারা শরীরে লালচে র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে।
লক্ষণ দেখা দিলে করণীয়
শিশুর মধ্যে এসব লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে তাকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখুন। দ্রুত একজন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। নিজে থেকে কোনো ওষুধ দেওয়া ঠিক নয়, কারণ ভুল ডোজ শিশুর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। এই সময় মায়ের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না এবং শিশুকে পর্যাপ্ত তরল খাবার দিতে হবে।
বিপজ্জনক লক্ষণগুলো
নিচের উপসর্গগুলোর কোনোটি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে—
- শ্বাসকষ্ট
- বারবার বমি
- খিঁচুনি
- শিশুর অস্বাভাবিক নিস্তেজ হয়ে পড়া
- কান থেকে পুঁজ বা পানি পড়া
এসব লক্ষণ জটিলতার ইঙ্গিত দেয় এবং তাৎক্ষণিক চিকিৎসা প্রয়োজন।
বড়দের মধ্যেও হাম: অবহেলা নয়!

হাম শুধু শিশুদের রোগ—এই ধারণা ভুল। প্রাপ্তবয়স্করাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন এবং অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা আরও গুরুতর হয়। নিউমোনিয়া, লিভারের প্রদাহ, এমনকি স্নায়বিক জটিলতার ঝুঁকি থাকে বেশি।
বিশেষ করে যাঁরা ছোটবেলায় টিকা নেননি বা যাঁদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল, তাঁদের জন্য এই রোগ বিপজ্জনক হতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান। যাঁরা টিকা নেননি, তাঁদের চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী টিকা নেওয়া উচিত। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে অন্তত ৫ থেকে ৭ দিন আলাদা রাখা জরুরি, যাতে সংক্রমণ ছড়াতে না পারে।
নিয়মিত হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় টিস্যু বা রুমাল ব্যবহার এবং ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ শরীরের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
গর্ভবতী নারীদের জন্য সতর্কতা
গর্ভাবস্থায় হাম হলে গর্ভপাত বা সময়ের আগে সন্তান জন্মের ঝুঁকি থাকে। তাই যেসব নারী ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের আগে টিকা সম্পন্ন করা প্রয়োজন। টিকা নেওয়ার পর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিরাপদ সময় বেছে গর্ভধারণ করা উচিত।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশুদের সুরক্ষায় সচেতনতা ও সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে, যখন টিকা দেওয়ার সুযোগ থাকে না, তখন সংক্রমণ এড়ানো, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং দ্রুত লক্ষণ শনাক্ত করাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। অভিভাবকদের দায়িত্বশীল আচরণ, সময়মতো চিকিৎসা গ্রহণ, সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে সক্রিয় অংশগ্রহণই পারে এই প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে শিশুদের নিরাপদ রাখতে। সচেতন পরিবার ও সমন্বিত উদ্যোগই হামের বিস্তার রোধে সবচেয়ে বড় শক্তি। মনে রাখতে হবে, সুস্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল।







