পুরোনো ভিডিও ঘিরে উত্তেজনা, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ; পুলিশের সামনেই সহিংসতা
কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে কোরআন শরিফ অবমাননার অভিযোগ তুলে একটি দরবারে হামলা চালিয়ে কথিত পীর আব্দুর রহমান ওরফে শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এ সময় দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে।
শনিবার বেলা একটার পর থেকে ফিলিপনগর ইউনিয়নের দারোগার মোড় এলাকায় অবস্থিত ‘শামীম বাবার দরবার শরিফ’-এ এই সহিংসতা শুরু হয় এবং প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে দফায় দফায় হামলা চলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েক বছর আগের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ওঠে। এর জেরে শনিবার দুপুরে শত শত মানুষ দরবার ঘেরাও করে এবং একপর্যায়ে ভেতরে ঢুকে হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা লাঠিসোটা নিয়ে দরবারে ভাঙচুর চালায় এবং একাধিক কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ সময় শামীমসহ তিনজনকে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়।
পরে পুলিশ আহতদের উদ্ধার করে দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামীমের মৃত্যু হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও গুরুতর আঘাতেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। অন্য দুইজন আহত ব্যক্তি শঙ্কামুক্ত।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও বিক্ষুব্ধ জনতার সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বিকেলের দিকে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
এ ঘটনায় এলাকায় অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তবে নিহতের পরিবার এখনো মামলা করতে আগ্রহ দেখায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, নিহত শামীম এর আগেও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে ২০২১ সালে গ্রেপ্তার হয়ে কারাভোগ করেছিলেন।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যকে কেন্দ্র করে ‘মব সহিংসতা’ বাড়তে থাকায় কুষ্টিয়ার এই ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
দরবারে ঢুকে পীরকে কুপিয়ে হত্যা: কুষ্টিয়ায় ‘মব সন্ত্রাসের’ নির্মম বহিঃপ্রকাশ

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে এক পীরকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিওকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষুব্ধ জনতা দরবারে ঢুকে পীর শামীম রেজা (ওরফে জাহাঙ্গীর)কে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে। এ সময় তাঁর দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বেড়ে ওঠা ‘মব সন্ত্রাসের’ উদ্বেগজনক প্রবণতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
ঘটনাস্থল ও সময়
গতকাল শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত শামীম রেজা ওই গ্রামের মৃত জেছের আলীর ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েক বছর আগের একটি ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শামীমের বিরুদ্ধে পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগ ওঠে। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
উত্তেজনা থেকে সহিংসতা
স্থানীয় সূত্র জানায়, শনিবার সকাল থেকেই আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা চরমে পৌঁছায়। দুপুরের পর একটি মিছিল শামীমের দরবারের দিকে অগ্রসর হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্লোগান দিতে দিতে মিছিলকারীরা দরবারে প্রবেশ করে এবং সেখানকার ভবনগুলোতে হামলা চালায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ১৮ মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, হামলাকারীরা দরবারের একতলা দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। পরবর্তীতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় মুহূর্তেই পুরো এলাকা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
নির্মম হত্যাকাণ্ড
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, হামলার সময় দরবারে অবস্থানরত শামীম রেজাকে প্রথমে মারধর করা হয়। পরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় দরবারে থাকা আরও পাঁচ থেকে সাতজন আহত হন। আহতদের মধ্যে নারী-পুরুষ উভয়ই রয়েছেন। অন্যরা প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালিয়ে যান।
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই শামীম রেজার মৃত্যু হয়েছে। তাঁর সঙ্গে হাসপাতালে আনা অন্য দুইজন বর্তমানে শঙ্কামুক্ত।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনার সময় পুলিশের উপস্থিতি থাকলেও তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়। কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন জানান, পুলিশ শামীমকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু বিক্ষুব্ধ জনতার সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে জনতার হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান তিনি।
এ ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ, পরিস্থিতি আগে থেকেই উত্তপ্ত ছিল, কিন্তু যথাযথ প্রস্তুতি না থাকায় এমন মর্মান্তিক পরিণতি ঘটেছে।
শামীম রেজার পটভূমি
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শামীম রেজা প্রাথমিক শিক্ষা নেন ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৮৪ সালে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। এরপর রাজধানীর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কেরানীগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। পরে চাকরি ছেড়ে আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ করেন এবং গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন। সেখানে খাদেম হিসেবে কিছুদিন থাকার পর ২০১৮ সালের দিকে নিজ গ্রামে ফিরে দরবার প্রতিষ্ঠা করেন।

স্থানীয়দের দাবি, তাঁর দরবারে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গানবাজনার আয়োজন হতো, যা নিয়ে আগেও বিতর্ক ছিল।
পূর্বের বিতর্ক
২০২১ সালের ১৬ মার্চ এক অনুসারীর শিশুপুত্রের মরদেহ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শামীম রেজা আলোচনায় আসেন। ওই ঘটনায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিন মাস কারাভোগের পর তিনি আবার নিজ দরবারে ফিরে আসেন।
প্রশাসনের পদক্ষেপ
কুষ্টিয়া জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, শামীমের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। এ ঘটনায় তাঁর ভাই হত্যা মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এলাকায় বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছেন। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
ঘটনার পরপরই গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি, এবি পার্টি, উদীচী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন পৃথক বিবৃতি দিয়েছে। তারা এই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে।
কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, “কেউ যদি সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, সেটি প্রশাসন দেখবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই।”
বাড়ছে ‘মব সন্ত্রাস’
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে গণপিটুনি বা মব সন্ত্রাসে নিহত হয়েছেন ১৯৭ জন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এই পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, দেশে বিচারবহির্ভূত সহিংসতার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে।

কুষ্টিয়ার এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য—তা সত্য হোক বা মিথ্যা—কত দ্রুত জনমনে উত্তেজনা ছড়াতে পারে এবং তা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা যদি প্রতিরোধ করা না যায়, তবে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুজব প্রতিরোধ, দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ এবং আইনের কঠোর প্রয়োগ—এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল এমন মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব।







