১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে ওঠেন আটতলায়, সেখান থেকেই মৃত্যু

প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে ওঠেন আটতলায়, সেখান থেকেই মৃত্যু

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

চট্টগ্রামে কলেজছাত্র সাজিদ হত্যা

চট্টগ্রাম নগরে ভয়াবহ ও নৃশংস এক হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদ (১৭)। হামলাকারীদের হাত থেকে বাঁচতে দৌড়ে একটি নির্মাণাধীন ভবনের আটতলায় আশ্রয় নিলেও শেষ পর্যন্ত সেখান থেকেই তাকে নিচে লিফটের গর্তে ফেলে হত্যা করা হয়—এমন অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি নগরের চকবাজার থানার ডিসি রোড এলাকার মৌসুমি আবাসিক এলাকায় রোববার রাতে ঘটে, যা এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

ঘটনার পর নিহতের বাবা আবুল হাশেম সিকদার বাদী হয়ে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ভবনটির নিরাপত্তাকর্মী এনামুল হককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

নিহত আশফাক কবির সাজিদ চট্টগ্রাম নগরের বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায়। পড়াশোনার সুবিধার্থে তিনি নগরের বাকলিয়া ডিসি রোড কবরস্থানের পাশের একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। পরিবারের দাবি, তিনি কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন বিকেলে সাজিদকে তার বন্ধু পরিচয় দেওয়া ফারদিন হাসান মুঠোফোনে কল দিয়ে মৌসুমি আবাসিক এলাকার মোড়ে ডেকে নেয়। সেখানে পৌঁছালে পূর্বপরিকল্পিতভাবে আইমন, অনিক, রানা মাইকেল, ইলিয়াস, এনায়েত উল্লাহ ও মিসকাতুল কায়েসসহ একদল তরুণ তাকে ঘিরে ফেলে। তারা ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে জোরপূর্বক সাজিদকে একটি নির্মাণাধীন ভবনের দিকে নিয়ে যায়।

একপর্যায়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে সাজিদ কৌশলে হামলাকারীদের হাত থেকে ছুটে গিয়ে পাশের ওই নির্মাণাধীন ভবনে ঢুকে পড়ে এবং ভেতর থেকে গেট বন্ধ করে দেয়। এরপর তিনি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে ভবনের আটতলায় উঠে যান। কিন্তু সেখানেও শেষ রক্ষা হয়নি। হামলাকারীরা গেটে ধাক্কা দিলে ভবনের নিরাপত্তাকর্মী এনামুল হক গেট খুলে দেন—যা পুরো ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ।

গেট খোলার সুযোগে হামলাকারীরা ভবনে ঢুকে ওপরতলায় গিয়ে সাজিদকে ধরে ফেলে। এরপর তাকে বেধড়ক মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তাকে আটতলা থেকে নিচে লিফটের ফাঁকা গর্তে ফেলে দেওয়া হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। একটি কিশোরকে এভাবে নির্মমভাবে হত্যা করা সমাজের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বাবুল আজাদ জানান, এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। হত্যার পেছনের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এটি কিশোর গ্যাংয়ের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল কি না, সেটিও গুরুত্বসহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

নিহতের বাবা আবুল হাশেম সিকদার শোক ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আমি এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”

বিশ্লেষকদের মতে, নগরজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এবং তাদের সহিংস কর্মকাণ্ড ক্রমেই উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। তুচ্ছ কারণেও সংঘবদ্ধ হামলা ও প্রাণঘাতী সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবনের মতো ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে নিরাপত্তার ঘাটতি এমন ঘটনায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের স্বপ্ন ভেঙে দেয়নি, বরং নগরের কিশোর অপরাধের ভয়াবহ বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত কত দ্রুত সত্য উদ্ঘাটন করতে পারে এবং অপরাধীরা কতটা দ্রুত আইনের আওতায় আসে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর