
জ্যৈষ্ঠের চিরচেনা রসালো ফলের ঘ্রাণ এখন রাজধানীর অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা শহরের বাজারগুলোতে। গ্রীষ্মের আগমনী বার্তার সাথে সাথে বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম। ফলের ঝুড়িতে আগাম জাতের গোপালভোগ, গোবিন্দভোগ আম এবং সুস্বাদু লিচু শোভা পেলেও সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ। বাজারে ফলের সরবরাহ দৃশ্যত পর্যাপ্ত থাকলেও দাম সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন বলছে, চাষি পর্যায়ে দাম সহনীয় থাকলেও পাইকারি ও খুচরা বাজারের সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে ফলের দাম এখন আকাশচুম্বী।
ফলের বাজারে আগাম জাতের দাপট
রাজধানীর কারওয়ান বাজার, বাদামতলী এবং নিউ মার্কেট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাজশাহীর আঁটি ও আগাম জাতের গুটি আম এবং সোনারগাঁ ও দিনাজপুরের লিচুতে বাজার সয়লাব। বিক্রেতারা রঙিন সাজে ফল সাজিয়ে রাখলেও ক্রেতার আনাগোনা তুলনামূলক কম। কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে উচ্চমূল্য। বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত পরিবারের জন্য এই ফল কেনা এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে।
১০০ লিচু ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা
বাজারে আসা লিচুর মান ও আকারভেদে দামের ব্যাপক তারতম্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমানে ১০০ লিচু বিক্রি হচ্ছে ৪০০ থেকে শুরু করে ৬০০ টাকা পর্যন্ত। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, আড়ত থেকে চড়া দামে কিনতে হওয়ায় তারা বেশি দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ দিনাজপুরের বাগানগুলোতে লিচুর ফলন এবার ভালো হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাগানে যে লিচু ২ থেকে ৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, তা ঢাকা বা বড় শহরে এসে ৫ থেকে ৭ টাকা হয়ে যাচ্ছে কীভাবে? মূলত এই অসামঞ্জস্যই প্রমাণ করে যে, বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।
আমের বাজারে সিন্ডিকেটের থাবা
আমের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাগান মালিকরা বলছেন, প্রচণ্ড তাপদাহের কারণে এবার আম দ্রুত পেকে গেছে, ফলে সরবরাহ অনেক বেশি। কিন্তু আড়তদারদের কারসাজিতে বাজারে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে দাম বাড়িয়ে রাখা হয়েছে। প্রতি কেজি আম এখন জাতভেদে ১০০ থেকে ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, আড়তদার এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের সিন্ডিকেটের কারণেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম ঘোষণার পরেও দাম কমছে না।
চাষীরা কি লাভবান?
রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাগান মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফড়িয়া ও আড়তদাররা বাগান থেকে নামমাত্র মূল্যে আম কিনে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ খুচরা বাজারে সেই আমের দাম তিনগুণ। চাষিরা জানান, পরিচর্যা ও পরিবহণ খরচ বাড়লেও সিন্ডিকেটের কারণে তারা প্রকৃত লাভ পাচ্ছেন না। বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম শীর্ষক প্রতিবেদনে এটি স্পষ্ট যে, সাধারণ ক্রেতা ও প্রান্তিক চাষি—উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আরো পড়ুনঃ টিকার আগেই শিশুদের হাম
পরিবহণ খরচ ও চাঁদাবাজির প্রভাব
ব্যবসায়ীদের দাবি, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ট্রাক ভাড়া অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে চাদাবাজির কারণে ফলের দামে এর প্রভাব পড়ছে। খুচরা বিক্রেতাদের মতে, পরিবহণ পথেই ফলের দামের বড় একটি অংশ বেড়ে যায়। তবে সাধারণ মানুষ এই অজুহাত মানতে নারাজ। তাদের মতে, নজরদারির অভাবেই বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম শোনার পরেও তাদের পকেট খালি করতে হচ্ছে।
মৌসুমি ফল থেকে বঞ্চিত শিশু ও বয়স্করা
ফলের পুষ্টিগুণ বিবেচনা করে সাধারণ মানুষ এই সময়ে পরিবারের জন্য ফল কেনেন। কিন্তু অস্বাভাবিক দামের কারণে অনেক পরিবার এখন ফল কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। নিম্ন আয়ের মানুষের কাছে আম-লিচু এখন কেবলই চোখের দেখা। বাজারে থরে থরে ফল সাজানো থাকলেও আয়ের সাথে ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম খবরটি তাদের কাছে কেবল একটি দুঃসংবাদ হিসেবে ধরা দিচ্ছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ভূমিকা
বাজার নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালালেও তার প্রভাব খুব একটা স্থায়ী হচ্ছে না। কারওয়ান বাজারের এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অভিযান চললে দাম একটু কমে, ম্যাজিস্ট্রেট চলে গেলেই আবার আগের মতো।” বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম এই সময়ে বাজার তদারকি কঠোর না হলে সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দাম কি কমবে?
আগামী কয়েক সপ্তাহে হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম বাজারে আসলে সরবরাহ আরও বাড়বে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যদি পরিবহণ ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তবে দাম কিছুটা কমতে পারে। তবে লিচুর মৌসুম ছোট হওয়ায় এর দাম কমার সম্ভাবনা খুব কম। বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম—এই শিরোনামটি তখনই সার্থক হবে যখন প্রতিটি সাধারণ মানুষ ফলের ঘ্রাণ ও স্বাদ নিতে পারবে।
মৌসুমি ফল সাধারণ মানুষের জন্য কেবল শৌখিনতা নয়, এটি শরীরের প্রয়োজনীয় ভিটামিনের বড় একটি উৎস। সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে এই পুষ্টি থেকে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হবে, তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যাতে বাজারে উঠতে শুরু করেছে লিচু ও আম এই খবরটি সাধারণ ক্রেতার জন্য স্বস্তির সংবাদ হয়ে ওঠে।







