৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান: সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর হুঁশিয়ারি

মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান: সিন্ডিকেট নির্মূলে কঠোর হুঁশিয়ারি

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান

 

মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান
মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান

দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে এবং তরুণ প্রজন্মকে মাদকের মরণছোবল থেকে রক্ষা করতে বড় ধরণের পদক্ষেপ নিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। আজ সকালে পুলিশ সদর দপ্তরে আইজিপি  মহোদয়ের সভাপতিত্বে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে আইজিপি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এখন থেকে অপরাধীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করা হবে। এই লক্ষ্যে সারা দেশে আজ থেকেই মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ও সাঁড়াশি অভিযান

বৈঠকের শুরুতেই আইজিপি দেশের বর্তমান মাদক পরিস্থিতির ওপর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মাদক কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি একটি সামাজিক ব্যাধি যা পরিবার ও রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই অভিশাপ নির্মূলে পুলিশ বাহিনীকে আরও আক্রমণাত্মক ভূমিকা পালন করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান এমনভাবে পরিচালিত হবে যাতে কোনো ছোট বা বড় কারবারি আইনের জাল থেকে বেরিয়ে যেতে না পারে।

ড্রাগ সিন্ডিকেটের গডফাদারদের ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

আজকের বৈঠকের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতা বা গডফাদারদের বিরুদ্ধে নেওয়া কঠোর অবস্থান। আইজিপি মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন আগামী ৭২ ঘণ্টার মধ্যে চিহ্নিত মাদক সম্রাটদের আইনের আওতায় আনা হয়। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, “মাদকের গডফাদারদের কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নেই। তাদের একমাত্র পরিচয় তারা অপরাধী।” এই ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম শেষ হওয়ার পর অভিযানের তীব্রতা আরও বাড়ানো হবে।

সীমান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারি

বাংলাদেশকে মাদকের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার রোধ করতে সীমান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইজিপি বলেন, পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে যাতে কোনোভাবেই মাদক দেশে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য বিজিবি এবং কোস্ট গার্ডের পাশাপাশি পুলিশকেও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান সফল করতে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর এসপিদের বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এলাকাভিত্তিক অভিযান

কোনো সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হয়, সেজন্য কেবল সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। প্রতিটি জেলার গোপন আস্তানাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর বস্তি এলাকা এবং অভিজাত এলাকার ক্লাবগুলোতে যেখানে মাদকের কারবার চলে, সেখানে পুলিশি পাহারা ও অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।

ডোপ টেস্ট ও পুলিশ বাহিনীর স্বচ্ছতা

আইজিপি কেবল বাইরে নয়, পুলিশ বাহিনীর ভেতরেও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে চান। তিনি বলেন, যদি পুলিশের কোনো সদস্য মাদকের সাথে জড়িত থাকে বা মাদক কারবারিদের সহায়তা করে, তবে তাকেও এই মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান-এর আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। নিয়মিত ডোপ টেস্টের মাধ্যমে পুলিশ সদস্যদের স্বচ্ছতা যাচাই করা হবে।

সামাজিক সচেতনতা ও জনগণের অংশগ্রহণ

আইজিপি মনে করেন, কেবল অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়। এজন্য সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা সন্তানদের চলাফেরার ওপর নজর রাখেন। মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান সফল করতে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় ‘মাদক বিরোধী কমিটি’ গঠন করার পরামর্শ দেন তিনি।

মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন

আইজিপির নির্দেশনায় কেবল ধরপাকড় নয়, বরং যারা ইতিমধ্যে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছে তাদের পুনর্বাসনের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, মাদকাসক্তদের অপরাধী হিসেবে না দেখে রোগী হিসেবে বিবেচনা করে সঠিক চিকিৎসায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে যারা এই মরণনেশা ছড়িয়ে দিচ্ছে, তাদের ক্ষেত্রে মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান হবে আপসহীন।

আরো পড়ুনঃ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে ওঠেন আটতলায়, সেখান থেকেই মৃত্যু

বিশেষায়িত ইউনিটের সমন্বিত অভিযান

আইজিপি নির্দেশ দিয়েছেন যে, কেবল জেলা পুলিশ নয়, বরং র‍্যাব , ডিবি  এবং সিআইডি -এর মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো এই অভিযানে একযোগে কাজ করবে। প্রতিটি ইউনিটের মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদানের জন্য একটি ‘সমন্বিত কন্ট্রোল রুম’ স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান চলাকালীন কোনো অপরাধী এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে না।

ড্রাগ মানি লন্ডারিং ও অর্থের উৎস অনুসন্ধান

মাদক ব্যবসার আড়ালে যারা অবৈধ অর্থ উপার্জন করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা এসেছে। সিআইডি-এর ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মাদক সম্রাটদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উৎস তদন্ত করতে। আইজিপি স্পষ্ট করেছেন যে, মাদকের অর্থের উৎস বন্ধ করা না গেলে এই সিন্ডিকেট নির্মূল করা কঠিন। তাই মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান-এর পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবেও এদের পঙ্গু করে দেওয়া হবে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ নজরদারি ও মোটিভেশনাল প্রোগ্রাম

তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে বিশেষ গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে যে, অভিযানের পাশাপাশি প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক সেমিনার করা হবে। আইজিপি বলেন, “আমরা চাই না কোনো শিক্ষার্থী ভুল পথে পা বাড়াক।” মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান-এর অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসের ড্রাগ পেডলারদের তালিকা তৈরি করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

মাদক কারবারিদের প্রশ্রয়দাতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা

আইজিপি কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, কেবল মাঠ পর্যায়ের বিক্রেতা নয়, যারা পর্দার আড়ালে থেকে মাদক কারবারিদের রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়, তাদেরও ছাড় দেওয়া হবে না। ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুযায়ী এসব প্রশ্রয়দাতাদের তালিকা তৈরি করে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে এই প্রভাবশালী মহলের দৌরাত্ম্য বন্ধ করাকে এবারের অভিযানের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে ধরা হয়েছে।

প্রযুক্তির ব্যবহার ও সিসিটিভি মনিটরিং

অভিযান চলাকালীন মাদক কেনাবেচার হটস্পটগুলোতে নজরদারি বাড়াতে ড্রোন প্রযুক্তি এবং ভ্রাম্যমাণ সিসিটিভি ক্যামেরা ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইজিপি জানিয়েছেন, যেসব এলাকায় অপরাধীরা সহজে গা ঢাকা দেয়, সেখানে প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হবে। এছাড়া, মাদক কারবারিদের ডিজিটাল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটকেও সক্রিয় রাখা হয়েছে যাতে অনলাইনে মাদকের অর্ডার বা লেনদেন বন্ধ করা যায়।

তথ্যদাতার সুরক্ষা ও বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা

মাদকের আস্তানা বা গডফাদারদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য দিলে তথ্যদাতাকে বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। আইজিপি আশ্বস্ত করেছেন যে, তথ্যদাতার পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখা হবে এবং তাদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। এই পদক্ষেপের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে সাহস বাড়বে এবং মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান আরও বেগবান হবে।

আজকের এই বিশেষ বৈঠকের পর সারা দেশের পুলিশ ইউনিটে চাঞ্চল্য লক্ষ্য করা গেছে। আইজিপির কড়া বার্তার পর অপরাধীরা আত্মগোপনে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের দাবি, এবারের মাদকের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাঁড়াশি অভিযান হবে চূড়ান্ত এবং এর মাধ্যমে দেশ থেকে মাদক ব্যবসা পুরোপুরি নির্মূল করা হবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর