১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

যুদ্ধবিরতি ঘিরে অনিশ্চয়তা ও বিশ্ববাজারে তেলের দাম:

যুদ্ধবিরতি ঘিরে অনিশ্চয়তা ও বিশ্ববাজারে তেলের দাম:

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

বিবিসি বলছে, ইরান যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে এশিয়ার দেশগুলো। কেননা এ অঞ্চলের দেশগুলোই উপসাগরীয় জ্বালানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। জ্বালানির উচ্চ মূল্য ও সরবরাহের সংকট মোকাবিলায় গত কিছুদিনে বিভিন্ন দেশের সরকার ও কোম্পানি নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ফিলিপাইনের কথাই বলা যায়। দেশটির জ্বালানি আমদানির ৯৮ শতাংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। হরমুজ বন্ধের পর প্রথম দেশ হিসেবে গত ২৪ মার্চ তারা জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। দেশটিতে পেট্রলের দাম বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হয়ে গিয়েছিল। 

আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির টানাপোড়েনের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে প্রতিফলিত হচ্ছে জ্বালানি বাজারে। সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা সত্ত্বেও তা ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় বিশ্ববাজারে আবারও তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এই পরিস্থিতি শুধু জ্বালানি বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এর প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। বর্তমান প্রতিবেদনে যুদ্ধবিরতির প্রেক্ষাপটে তেলের দামের ওঠানামা, এর কারণ এবং বাংলাদেশসহ এশিয়ার দেশগুলোর ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হলো।

প্রথমত, যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দামে একটি তাৎক্ষণিক পতন দেখা যায়। গত বুধবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম দ্রুত কমে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৯২ মার্কিন ডলারে নেমে আসে। তবে এই পতন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আবারও তেলের দাম বেড়ে যায়। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে ১১টায় ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ ডলারে পৌঁছায়, যা একদিনের ব্যবধানে ৫ ডলারের বেশি বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এ থেকে স্পষ্ট যে, জ্বালানি বাজার এখনো অস্থিতিশীল এবং সামান্য রাজনৈতিক পরিবর্তনেও দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক দেশের পরিশোধনাগার উৎপাদন সংকটে পড়েছে। একই সঙ্গে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটেছে। ফলে দেশগুলোকে খোলাবাজার থেকে অনেক বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় যেসব দেশ নির্দিষ্ট দামে জ্বালানি পেত, তারাও এখন উচ্চমূল্যের চাপে পড়েছে। এতে জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ছে।

তৃতীয়ত, যুদ্ধবিরতির ইতিবাচক প্রভাবও কিছুটা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আটকে থাকা অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলো আবার গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে সরবরাহ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দামও কিছুটা কমতে শুরু করেছে, যা আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য স্বস্তির বার্তা বয়ে আনছে। তবে এই স্বস্তি এখনো অনিশ্চিত, কারণ যুদ্ধবিরতি স্থায়ী না হলে পরিস্থিতি আবারও অবনতির দিকে যেতে পারে।

চতুর্থত, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি বাজারের এই অস্থিরতা মূলত রাজনৈতিক ঝুঁকির ফল। যুদ্ধ শুরুর আগে যেখানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি গড়ে ৭০ ডলারের মধ্যে ছিল, তা একপর্যায়ে বেড়ে ১১৯ ডলারে পৌঁছে যায়। বর্তমানে দাম কিছুটা কমলেও এখনো তা পূর্বাবস্থায় ফেরেনি। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সংঘাত আবার তীব্র হলে জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করবে।

পঞ্চমত, এশিয়ার দেশগুলো এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কারণ, এ অঞ্চলের অধিকাংশ দেশই মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। যুদ্ধের ফলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় এসব দেশকে বাড়তি মূল্যে জ্বালানি কিনতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ফিলিপাইন তাদের জ্বালানি আমদানির প্রায় ৯৮ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে করে থাকে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর দেশটি জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। একইভাবে জেট ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিমান ভাড়া বৃদ্ধি ও ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা ঘটেছে।

ষষ্ঠত, উন্নয়নশীল এশীয় দেশগুলোর জন্য এই সংকট আরও গভীর হয়েছে তাদের সীমিত জ্বালানি অবকাঠামোর কারণে। অনেক দেশের নিজস্ব পরিশোধনাগার বা পর্যাপ্ত মজুত ব্যবস্থা নেই। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামের ওঠানামার প্রভাব সরাসরি তাদের অর্থনীতিতে পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে, তবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে।

সপ্তমত, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধবিরতির খবর কিছুটা স্বস্তি নিয়ে এসেছে। যুদ্ধের কারণে প্রায় এক মাস ধরে পারস্য উপসাগরে আটকে থাকা তেল ও এলএনজিবাহী ট্যাংকারগুলো এখন দেশে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। পাশাপাশি পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী জাহাজ আসা শুরু হলে জ্বালানি সংকট অনেকটাই কাটবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অষ্টমত, এলএনজি বাজারেও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতির পর বিশ্ববাজারে এলএনজির দাম কমে এসেছে। আগে যেখানে প্রতি ইউনিট এলএনজি গড়ে ২০ ডলার দামে কিনতে হচ্ছিল, তা কমে প্রায় ১৬ ডলারের ঘরে নেমেছে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য আমদানিকারক দেশগুলো কিছুটা কম দামে জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সুবিধা স্থায়ী হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।

নবমত, হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি বন্ধ বা আংশিক সচল থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দামের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে এই পথের ওপর নির্ভর করছে। যদি প্রণালিটি পুরোপুরি চালু থাকে, তবে সরবরাহ পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হতে পারে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও বিশ্ব জ্বালানি বাজার এখনো অস্থির অবস্থায় রয়েছে। সামান্য অনিশ্চয়তাই তেলের দামে বড় ধরনের ওঠানামা ঘটাচ্ছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে, বিশেষ করে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। বাংলাদেশের জন্য সাময়িক স্বস্তি এলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি। তাই দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎস, মজুত বৃদ্ধি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং ভূরাজনৈতিক ঘটনার ওপর এর নির্ভরশীলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। যুদ্ধবিরতি যদি স্থায়ী হয়, তবে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে; অন্যথায় অস্থিরতা আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জ্বালানি তেলের সংকট আপনার খরচ বাড়াবে কীভাবে?

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের বাজারেও। বিভিন্ন জ্বালানি পাম্পে দীর্ঘ লাইন, সরবরাহে চাপ এবং সরকারের মজুতে টান—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এতে সরকারের বেশি ডলার খরচ হয় এবং রিজার্ভের ওপর চাপ পড়ে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় বাজারে জ্বালানির দাম সমন্বয় করতে হয়, ফলে অকটেন, পেট্রল ও ডিজেলের দাম বাড়তে পারে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতিতে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে প্রথমেই পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়। বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের ভাড়া বাড়ে এবং পণ্য পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পাইকারি ও খুচরা বাজারে চাল, সবজি, ভোজ্যতেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বাড়ায় শিল্পপণ্যের দামেও চাপ সৃষ্টি হয়।

এ অবস্থায় পরিবারের মাসিক খরচ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আগেভাগে পরিকল্পনা করা জরুরি। নিয়মিত বাজেট তৈরি, অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত কমানো এবং পরিকল্পিতভাবে বাজার করা ব্যয় কমাতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি জ্বালানিনির্ভর খরচ কমানোর চেষ্টা করাও প্রয়োজন।

এ ছাড়া কিছু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। যেমন—জরুরি তহবিল গড়ে তোলা, আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা থেকে বিরত থাকা এবং বাজারদর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা।

সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি তেলের সংকট সরাসরি ও পরোক্ষভাবে পরিবারের ব্যয় বাড়ায়। তবে সচেতনতা ও পরিকল্পিত ব্যয়ের মাধ্যমে এই চাপ অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর