১৫ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২রা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

শিক্ষায় নকলমুক্ত এবং কোচিং নিষিদ্ধের ঘোষণায় শিক্ষামন্ত্রী:

শিক্ষায় নকলমুক্ত এবং কোচিং নিষিদ্ধের ঘোষণায় শিক্ষামন্ত্রী:

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

সুশিক্ষার বিকাশে মুখস্ত বিদ্যা এবং কোচিং নির্ভর পড়াশোনা বাতিল প্রসঙ্গে:

কুমিল্লা, ৪ এপ্রিল—দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, নকল নির্মূল এবং কোচিংনির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, পাবলিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে চাকরির ইন্টারভিউ—কোনো ক্ষেত্রেই আর নকলের সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত কোচিং সেন্টারগুলোর কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি, যা শিক্ষাক্ষেত্রে একটি বড় নীতিগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে।

শনিবার কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমি অডিটোরিয়ামে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষামন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিবরা উপস্থিত ছিলেন। পরীক্ষার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং নৈতিকতা নিশ্চিত করাই ছিল এ সভার মূল উদ্দেশ্য। তার মধ্যে নকলমুক্ত পরীক্ষা এবং কোচিং বাণিজ্য বাতিল করা যেন সময়ে দাবি হয়ে ওঠেছে। সচেতন অভিভাবকরাও সিংহভাগ চায়ে এই পরিবর্র্তন; একইসাথে যুগোপযোগী শিক্ষা সকলের কাম্য। আসুন জেনে নিই এর ভালমন্দ দিকসহ বিস্তারিত:

নকলের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা

শিক্ষামন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে নকলের বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নকল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র সচিবকে আইনের আওতায় আনা হবে। শুধু তাই নয়, কেন্দ্রের বাথরুমে নকল পাওয়া গেলেও প্রতিষ্ঠান প্রধানকে দায় নিতে হবে। অর্থাৎ, পরীক্ষার পুরো পরিবেশের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পূর্ণ জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হবে জানা যাচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বাইরে থেকে কেউ নকল সরবরাহ করলে কিংবা সহায়তা করলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। “কাউকে নকল করতে দেওয়া হবে না, নকলের সহযোগিতাও বরদাস্ত করা হবে না”—এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সরকারের কঠোর অবস্থান স্পষ্ট করেন।

এই ঘোষণার মাধ্যমে বোঝা যায়, পরীক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকার এবার আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। শিক্ষাবিদদের মতে, যদি এই নীতি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে পরীক্ষার মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা উল্লেখযোগ্যভাবেই বৃদ্ধি পাবে।

শিক্ষকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ

শুধু পরীক্ষার্থীদের নয়, শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। যা অত্যন্ত গুরুত্বর্পূণ। তিনি উল্লেখ করেন, খাতা মূল্যায়নে যদি কোনো শিক্ষক ইচ্ছাকৃতভাবে নম্বর বাড়ানো বা কমানোর মতো অনিয়ম করেন, তাহলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এটি শিক্ষাব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, কারণ মূল্যায়নের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। শিক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, শুধু পরীক্ষার সময় নয়, মূল্যায়নের পুরো প্রক্রিয়াকেই কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হচ্ছে। আর সেটিই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কারণ, শিক্ষার্থীকে ভালো ছাত্র হিসেবে গড়ে তোলা যতটা জরুরি তার চেয়ে বেশি জরুরি প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা। আর সেজন্যই সুশিক্ষার বিকাশ ঘটানো আগামী প্রজন্মের জন্য সবেচেয়ে বড় উপহার এবং উন্নয়ন।

তিনি আরও জানান, এই নীতি শুধু পাবলিক পরীক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; চাকরির ইন্টারভিউসহ সব ধরনের মূল্যায়ন প্রক্রিয়াতেও একই নিয়ম প্রয়োগ করা হবে। ফলে, একটি সামগ্রিক নৈতিক মানদণ্ড প্রতিষ্ঠার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

কোচিং সেন্টার বন্ধের ঘোষণা: বাস্তবতা চ্যালেঞ্জ

শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণার সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল দেশের সব কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত। তিনি বলেন, “ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে ওঠা কোচিং সেন্টার শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এগুলো আর চলতে দেওয়া হবে না।”

সুশিক্ষার বিকাশ ঘটানো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কোচিংয়ের পিছে দৌড়ে জিপিএ, সিজিপিএ-এর জন্য মুখস্ত নির্ভর পড়াশোনায়। বাস্তবশিক্ষা থেকে আমরা এমনিতেই অনেক পিছিয়ে তার মধ্যে এটি হলো বড় সমস্যা। বাংলাদেশে কোচিং সেন্টারের বিস্তার গত দুই দশকে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শহর থেকে শুরু করে উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়েও কোচিং সেন্টারের বিস্তার ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসের চেয়ে কোচিংয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, যা মূল শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোচিং সেন্টার সম্পূর্ণ বন্ধ করা একটি কঠিন ও জটিল সিদ্ধান্ত। কারণ, বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, বড় ক্লাসরুম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাতের ভারসাম্যহীনতা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন পদ্ধতি—এসব কারণে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।

কোচিং নির্ভরতার ক্ষতিকর দিক

শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, কোচিং সেন্টারের অতিনির্ভরতা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এর কিছু প্রধান নেতিবাচক দিক হলো—

  • চিন্তাশক্তি সৃজনশীলতার হ্রাস: রেডিমেড নোট ও সাজানো উত্তরনির্ভর পড়াশোনা শিক্ষার্থীদের নিজস্বভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
  • মুখস্থনির্ভরতা বৃদ্ধি: বোঝার চেয়ে মুখস্থ করার প্রবণতা বাড়ে, ফলে মৌলিক জ্ঞান অর্জন ব্যাহত হয়।
  • মানসিক চাপ ক্লান্তি: স্কুলের পর কোচিং, আবার বাড়ির কাজ—সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীরা চরম মানসিক চাপে পড়ে।
  • আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি: নিজের ওপর নির্ভর না করে কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ায় আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
  • অর্থনৈতিক চাপ: কোচিংয়ের পেছনে পরিবারের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়, যা অনেকের জন্য কষ্টকর।
  • সময় শৈশব হারানো: খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ ও বিশ্রামের সময় কমে যায়, যা শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। সুস্থ, সুন্দর বিনোদন থেকে আজকের শিশুরা বহুদূরে।

পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা: একটি গভীর সংকট

বর্তমানে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা অনেকাংশেই পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। যার কারণে ভালো নম্বর পাওয়াই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, শিক্ষার্থীরা জ্ঞান অর্জনের পরিবর্তে ‘নম্বর অর্জন’-এর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছে। যেখানে ‘সুশিক্ষার বিকাশ’ যেন এক অসম্ভবের পথে এগিয়ে যাচ্ছে! এতে যেমন দেশের ক্ষতি তেমনই নাগরিকেরও ভয়ংকর ক্ষতি। প্রজন্মকে আবিষ্কারে উৎসাহি এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু অনেকের দ্বিমত থাকলেও তারা ভেবে দেখে না যে, সন্তানকে বাস্তবসম্মত শিক্ষা দেওয়াটা কতটা জরুরি।

এই প্রবণতা শিক্ষার মৌলিক উদ্দেশ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে প্রজন্ম এবং চারিদিক অন্ধাকার নেমে আসছে। তার কারণ, শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষা হওয়া উচিত আনন্দময়, অনুসন্ধানী ও সৃজনশীল; কিন্তু বাস্তবে তা হয়ে উঠছে যান্ত্রিক ও চাপসৃষ্টিকারী। তার মধ্যে পরীক্ষা ও কোচিং বড় বাধা হলে ‘সুশিক্ষার বিকাশ’ যেন স্বপ্নই থেকে যাবে। কিন্তু না, তা আর করা যাবে না।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তর থেকেই অধিকাংশ শিক্ষার্থী কোচিংমুখী হয়ে পড়ছে এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে এ প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের শেখার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে এবং তারা ধীরে ধীরে ক্লান্ত ও বিরক্ত হয়ে পড়ছে।

সমাধানের পথ কী?

শিক্ষামন্ত্রীর ঘোষণাগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে শুধু প্রশাসনিক কঠোরতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি দিকের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন—

  1. শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষার মান উন্নয়ন
  2. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ জবাবদিহিতা বৃদ্ধি
  3. পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার (সৃজনশীল মূল্যায়ন)
  4. শিক্ষার্থীবান্ধব আনন্দময় শিক্ষার পরিবেশ তৈরি
  5. অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি

সুশিক্ষার বিকাশ

সুশিক্ষা একটি জাতির সামগ্রিক উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। এটি কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার মাধ্যম। একটি দেশে সুশিক্ষার বিকাশ ঘটাতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে হতে হবে জীবনমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক ও সৃজনশীল। শিক্ষককে হতে হবে দক্ষ, আদর্শবান ও শিক্ষার্থীবান্ধব, যাতে শিক্ষার্থীরা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে। পাশাপাশি পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনের প্রথম পাঠ শুরু হয় পরিবার থেকেই। আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, গবেষণাভিত্তিক শিক্ষা এবং নৈতিক শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে পারলে সুশিক্ষার বিকাশ ত্বরান্বিত হবে। সুশিক্ষিত নাগরিকই পারে একটি দেশকে উন্নত, সমৃদ্ধ ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আন ম এহছানুল হক মিলনের ঘোষণাগুলো নিঃসন্দেহে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। নকলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান এবং কোচিং সেন্টার বন্ধের উদ্যোগ—দুটিই প্রশংসনীয়। তবে এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগ।

যদি এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা ও কোচিংনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে সত্যিকারের জ্ঞানভিত্তিক, সৃজনশীল ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থায় রূপান্তরিত হতে পারে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর