৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা: প্রাথমিক তথ্যে আশার আলো

সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা: প্রাথমিক তথ্যে আশার আলো

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা

 

সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা
সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন থেকে প্রকৃতি প্রেমী ও পরিবেশবাদীদের জন্য দারুণ এক সুখবর এসেছে। সাম্প্রতিক ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য ও বন বিভাগের পর্যবেক্ষণ বলছে, আগের তুলনায় সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা। সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে স্থাপিত আধুনিক সয়ংক্রিয় ক্যামেরায় বাঘের অবাধ বিচরণ এবং নতুন শাবকের উপস্থিতি বন কর্মকর্তাদের মধ্যে ব্যাপক আশার সঞ্চার করেছে। মূলত বন রক্ষা এবং চোরাচালান বন্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণেই এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ক্যামেরা ট্র্যাপিং ও বর্তমান অবস্থা

২০২৪-২০২৬ সালের জরিপ প্রকল্পের আওতায় সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টে শত শত অত্যাধুনিক ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছিল। এসব ক্যামেরায় ধারণকৃত চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যে, গত কয়েক বছরের তুলনায় সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা। বিশেষ করে সুন্দরবনের শরণখোলা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে বাঘের উপস্থিতি আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন ঘন দেখা যাচ্ছে। বন বিভাগের সূত্রমতে, আগের জরিপে বাঘের সংখ্যা ১১৪টি থাকলেও এবারের সংখ্যাটি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

বাঘের সংখ্যা বাড়ার প্রধান কারণসমূহ

বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশ কিছু কারণে সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা। প্রথমত, বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের সংখ্যা বনে আগের চেয়ে স্থিতিশীল রয়েছে। দ্বিতীয়ত, সুন্দরবনের বড় একটি অংশকে ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’-এর আওতায় আনা হয়েছে, যার ফলে বনদস্যুদের আনাগোনা ও বিষ দিয়ে মাছ ধরা বন্ধ হয়েছে। বন যখন শান্ত থাকে এবং মানুষের উপদ্রব কমে যায়, তখন বাঘের প্রজনন ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।

নতুন শাবকের উপস্থিতি ও বংশবৃদ্ধি

ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে পাওয়া সবচেয়ে আনন্দদায়ক খবর হলো বনের বিভিন্ন স্থানে বাঘিনীর সাথে ছোট ছোট শাবকের বিচরণ। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা এবং বাঘের বংশবৃদ্ধির জন্য একটি আদর্শ পরিবেশ এখন বিরাজ করছে। বাঘিনীরা নিরাপদ আশ্রয়ে তাদের শাবকদের বড় করতে পারছে, যা সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের জন্য এক বিরাট সাফল্য।

চোরাচালান ও বিষ প্রয়োগ বন্ধের সুফল

একটা সময় সুন্দরবনে বাঘের চামড়া ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পাচারকারী চক্র সক্রিয় ছিল। তবে বর্তমানে র‍্যাব, কোস্টগার্ড এবং বন বিভাগের সমন্বিত অভিযানে চোরাচালান প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। বনের শান্ত পরিবেশ বজায় থাকায় বাঘের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে না। সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা শীর্ষক আলোচনার মূল কৃতিত্ব তাই কঠোর বন পাহারার কাছেই প্রাপ্য।

বন বিভাগের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

বন বিভাগ জানিয়েছে, বাঘের এই সংখ্যা ধরে রাখা এবং আরও বাড়ানোর জন্য তারা কৃত্রিম জলাধার তৈরি এবং বাঘের বিচরণ ক্ষেত্রে মানুষের প্রবেশ সীমিত করার পরিকল্পনা করছে। সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা—এই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে স্থানীয় কমিউনিটিকেও বাঘ সংরক্ষণে সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্মার্ট পেট্রোলিং ও প্রযুক্তির ব্যবহার

সুন্দরবনে বাঘের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে ‘স্মার্ট পেট্রোলিং’  পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। বনরক্ষীরা জিপিএস এবং আধুনিক অ্যাপের মাধ্যমে বাঘের বিচরণক্ষেত্রগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। এই নিশ্ছিদ্র পাহারার ফলেই চোরা শিকারিদের কবল থেকে বাঘ রক্ষা পাচ্ছে এবং সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা।

বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণের প্রাচুর্য

বাঘের সংখ্যা বাড়ার পেছনে হরিণ ও বন্যশূকরের পর্যাপ্ততা একটি প্রধান কারণ। সাম্প্রতিক তথ্যানুযায়ী, সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় হরিণের সংখ্যাও আশাব্যঞ্জকভাবে বেড়েছে। বাঘের খাদ্যশৃঙ্খল  মজবুত থাকায় শাবকগুলোর বেঁচে থাকার হার বেড়েছে। পর্যাপ্ত শিকার পাওয়ায় বাঘেরা এখন আগের চেয়ে সুস্থ ও শক্তিশালী অবস্থায় রয়েছে, যা সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা কিওয়ার্ডটির সার্থকতা প্রমাণ করে।

বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্ব হ্রাস ও সচেতনতা

বন সংলগ্ন লোকালয়ে বাঘের ঢুকে পড়া এবং মানুষের আক্রমণে বাঘ মারা যাওয়ার ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমেছে। ‘টাইগার রেসপন্স টিম‘ এবং স্থানীয় ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিমের  সক্রিয়তা বাঘের জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখছে। বাঘ লোকালয়ে চলে আসলেও গ্রামবাসী এখন বাঘ না মেরে বন বিভাগকে খবর দেয়। এই সামাজিক সচেতনতা সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা নিশ্চিত করতে সহায়ক হয়েছে।

প্লাবনভূমি ও উঁচু মাটির কিল্লা নির্মাণ

বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঘ ও হরিণসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণী যাতে নিরাপদ আশ্রয় পায়, সেজন্য সুন্দরবনের গহীনে কৃত্রিম মাটির ঢিবি বা ‘কিল্লা’ তৈরি করা হয়েছে। এতে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বাঘের মৃত্যুর হার কমেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বন্যপ্রাণী রক্ষার এই কৌশলগত পদক্ষেপের ফলেই দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা।

আন্তঃসীমান্ত বাঘ সংরক্ষণ উদ্যোগ

বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশের সুন্দরবন অংশে বাঘের অবাধ বিচরণ রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে বাঘ রক্ষায় তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বাঘের যাতায়াতের করিডোরগুলো নিরাপদ হওয়ায় এবং দুই দেশের বন বিভাগের সমন্বিত প্রচেষ্টায় বাঘের নিরাপত্তা ও প্রজনন পরিবেশ উন্নত হয়েছে, যার ফলশ্রুতিতে সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা।

আরো পড়ুনঃ প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে ওঠেন আটতলায়, সেখান থেকেই মৃত্যু

সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ

বাঘের সুস্বাস্থ্যের জন্য বনে সুপেয় পানির উৎস থাকা অত্যন্ত জরুরি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনের অনেক জলাশয়ে লোনা পানি ঢুকে পড়লেও বন বিভাগ সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর পরিমাণে নতুন পুকুর খনন এবং পুরাতন পুকুর সংস্কার করেছে। বনের গভীরে এসব পুকুর থেকে মিষ্টি পানি পাওয়ায় বাঘেরা এখন আগের চেয়ে সতেজ থাকছে এবং পানিবাহিত রোগ থেকে মুক্তি পাচ্ছে। প্রজনন মৌসুমে বাঘের শারীরিক সক্ষমতা বজায় রাখতে সুপেয় পানির এই পর্যাপ্ততা বড় ভূমিকা পালন করেছে, যা সরাসরি সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা নিশ্চিত করতে সাহায্য করছে।

বাঘ সুন্দরবনের অতন্দ্র প্রহরী। বাঘ ভালো থাকলে সুন্দরবন ভালো থাকবে, আর সুন্দরবন ভালো থাকলে বাংলাদেশ সুরক্ষিত থাকবে। ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের ইতিবাচক ফলাফল আমাদের সেই বার্তাই দিচ্ছে যে, সুন্দরবনে বাড়ছে বাঘের সংখ্যা। এই ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে সুন্দরবন আবারও বিশ্বের সেরা বাঘের অভয়ারণ্য হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর