২৩শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ১০ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

স্বপ্ন জয়: যমজ দুই ভাইয়ের একসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্য

স্বপ্ন জয়: যমজ দুই ভাইয়ের একসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাফল্য

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print

যুদ্ধ কঠিন হলেও জয়ী হলো জনি ও রনি

স্বপ্ন যদি এক হয়, চেষ্টা যদি একসঙ্গে হয়—তবে সাফল্যও একসঙ্গেই ধরা দেয়। এমনই এক অনুপ্রেরণাময় গল্প তৈরি করেছেন যমজ দুই ভাই শাকিবুল হাসান জনি ও রাকিবুল হাসান রনি। একসঙ্গে জন্ম, একসঙ্গে বেড়ে ওঠা, আর এবার একসঙ্গেই দেশের অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ—তাদের এই অর্জন এখন শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার গর্বের প্রতীক।

শেরপুর সদর উপজেলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মোবারকপুর বাঁশতলা গ্রামের এই দুই তরুণ প্রথমবারের মতো তাদের এলাকাকে পৌঁছে দিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গর্বিত তালিকায়। তাদের এই সাফল্য যেন প্রমাণ করে—গ্রাম থেকেও স্বপ্ন উড়ে যেতে পারে আকাশ ছুঁতে, যদি থাকে দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি ও নিরলস পরিশ্রম।

জীবনের সিঁড়িতে পিছিয়ে ছিল না দুই ভাই

শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে জনি ও রনির ছিল একসঙ্গে পথচলা। শেরপুর সরকারি ভিক্টোরিয়া একাডেমি থেকে মাধ্যমিক এবং শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর তারা নিজেদের লক্ষ্য স্থির করেন আরও বড় কিছু অর্জনের। সেই লক্ষ্যই তাদের নিয়ে গেছে সাফল্যের এই উজ্জ্বল দোরগোড়ায়।

ভর্তি পরীক্ষার কঠিন প্রতিযোগিতায় নিজেদের প্রমাণ করে শাকিবুল হাসান জনি শিফট-১-এ মেধাতালিকায় ১৬৫৭তম হয়ে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে সুযোগ পেয়েছেন। অন্যদিকে রাকিবুল হাসান রনি শিফট-২-এ ২৭৫৪তম হয়ে পপুলেশন সাইন্স অ্যান্ড হিউম্যান রিসোর্স ডেভেলপমেন্ট বিভাগে ভর্তির সুযোগ অর্জন করেছেন। তবে এখানেই থেমে থাকতে চান না তারা—আরও ভালো বিষয়ে পড়ার আশায় দুজনই সাবজেক্ট মাইগ্রেশন চালু রেখেছেন।

রনির কণ্ঠে ধরা পড়ে দৃঢ় সংকল্প ও ভবিষ্যতের স্বপ্ন। তিনি বলেন, “আমাদের বাবা-মা অনেক কষ্ট করে আমাদের মানুষ করেছেন। আমরা চাই সেই কষ্টের প্রতিদান দিতে। ইনশাআল্লাহ, আরও ভালো কিছু অর্জন করবো।” তার এই প্রত্যয় শুধু ব্যক্তিগত নয়—এটি এক নতুন প্রজন্মের আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।

অন্যদিকে জনির কথায় ফুটে ওঠে আবেগ ও বিশ্বাসের শক্তি। তিনি জানান, অনেকেই ভেবেছিলেন দুই ভাই আলাদা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। কিন্তু তাদের মা-বাবার অগাধ বিশ্বাস ও দোয়া তাদের একসঙ্গে এই সাফল্যের পথে এনেছে। “মা-বাবার মুখে যে আনন্দ দেখেছি, সেটাই আমাদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি”—তার এই বক্তব্য যেন সাফল্যের প্রকৃত অর্থই তুলে ধরে।

এই অর্জনের পেছনে পরিবারের অবদান অনস্বীকার্য। পিতা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “দুই ছেলে একসঙ্গে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে—এটা আমার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দের একটি মুহূর্ত।” তার কণ্ঠে গর্ব যেমন স্পষ্ট, তেমনি ভবিষ্যতের প্রত্যাশাও—তিনি চান তার সন্তানরা একদিন বড় প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে দেশের সেবা করুক।

উদাহরণ হলো প্রেরণার

শিক্ষকদের চোখেও এই সাফল্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শেরপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আবদুর রউফ বলেন, “তারা দুজনই ছিল অত্যন্ত পরিশ্রমী ও মেধাবী। তাদের এই অর্জন ভবিষ্যৎ শিক্ষার্থীদের জন্য পথ দেখাবে।”

বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, জনি ও রনির এই গল্প শুধুই দুই ভাইয়ের সাফল্যের গল্প নয়—এটি আশা, অধ্যবসায় এবং স্বপ্ন পূরণের এক জীবন্ত উদাহরণ। যেখানে অনেকেই সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত বানায়, সেখানে তারা প্রমাণ করেছে—ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো বাধাই চূড়ান্ত নয়।

তাদের এই অর্জন পুরো এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এখন সেই গ্রামের কোনো শিক্ষার্থী যখন বড় স্বপ্ন দেখবে, তখন জনি ও রনির গল্প তাকে সাহস জোগাবে—“আমিও পারবো।”

সবশেষে বলা যায়, এই যমজ দুই ভাইয়ের সাফল্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বপ্ন দেখা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরলস প্রচেষ্টা। আর যখন সেই প্রচেষ্টা একসঙ্গে হয়, তখন সাফল্যও হয়ে ওঠে দ্বিগুণ উজ্জ্বল।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর