৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ■ ২৪শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

/

কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া: নাটোরে যাত্রা শুরু করল দেশের প্রথম স্মার্ট এগ্রিকালচার হাব

কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া: নাটোরে যাত্রা শুরু করল দেশের প্রথম স্মার্ট এগ্রিকালচার হাব

||

দৈনিক মাটির কণ্ঠ

Facebook
Twitter
LinkedIn
WhatsApp
Print
কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া
কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া
কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া

বাংলাদেশের কৃষি খাতে এক ঐতিহাসিক ও বৈপ্লবিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের আধুনিক প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিতে ঢাকার বাইরে অর্জিত হলো এক বিশাল মাইলফলক। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের বিশেষ উদ্যোগে নাটোরে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়েছে দেশের সর্বপ্রথম ‘স্মার্ট এগ্রিকালচার হাব’। এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ঐতিহ্যবাহী চাষাবাদ পদ্ধতিতে যুক্ত হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চালকবিহীন ড্রোনের মতো সর্বাধুনিক প্রযুক্তি। মূলত কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া কীভাবে ফসলের উৎপাদন বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে পারে, নাটোরের এই হাবটি এখন তারই জীবন্ত উদাহরণ।

আজ সকালে এক জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই স্মার্ট এগ্রিকালচার হাবের প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত কার্যক্রমের শুভ উদ্বোধন করেন আইসিটি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। এই সময় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রতিনিধি এবং বিপুল সংখ্যক স্থানীয় কৃষক উপস্থিত ছিলেন।

স্মার্ট এগ্রিকালচার হাবের প্রেক্ষাপট ও মূল উদ্দেশ্য

জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সনাতন কৃষি পদ্ধতির আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি। আইসিটি বিভাগ দীর্ঘদিন ধরে কৃষি খাতের ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে কাজ করছিল। সেই পরিকল্পনারই প্রথম বাস্তব রূপ এই স্মার্ট এগ্রিকালচার হাব। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কৃষকদের অবদান সবচেয়ে বেশি, আর তাই প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা তাদের কাছে সবার আগে পৌঁছানো উচিত। এই চিন্তাভাবনা থেকেই কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া পৌঁছে দিতে নাটোরে এই পাইলট প্রকল্প চালু করা হয়েছে, যা পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে।

ড্রোনের মাধ্যমে ফসলের মাঠ পর্যবেক্ষণ

এই হাবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো মাল্টিস্পেক্ট্রাল ক্যামেরা যুক্ত বিশেষায়িত ড্রোন। কৃষকরা এখন থেকে তাদের বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ মানুষের চোখ ছাড়াই নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন। ড্রোনগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে মাঠের ওপর দিয়ে উড়ে গিয়ে হাই-রেজোলিউশন ছবি ও ডাটা সংগ্রহ করবে। এর ফলে ফসলের ফলন কেমন হতে পারে, মাঠের কোনো অংশে পানির ঘাটতি আছে কি না—তা চোখের পলকে জানা যাবে। মূলত কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া লাগার কারণে কৃষকদের এখন আর মাইলের পর মাইল হেঁটে মাঠের অবস্থা পরীক্ষা করতে হবে না।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর যাদু

ড্রোন এবং মাঠে বসানো আইওটি সেন্সর থেকে প্রাপ্ত সমস্ত তথ্য জমা হবে হাবের মূল সার্ভারে। সেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি সেই তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করবে। এআই অ্যালগরিদম নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করতে পারবে মাটির বর্তমান স্বাস্থ্য কেমন। শুধু তাই নয়, কোনো ফসলে রোগবালাই আক্রমণ করার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দিলেই এআই সিস্টেম কৃষকের মোবাইলে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা ও প্রতিকারের উপায় পাঠিয়ে দেবে। এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করায় কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া নাটোরের কৃষি অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

মাটির আর্দ্রতা ও গুণাগুণ পরীক্ষা

স্মার্ট এগ্রিকালচার হাবের অধীনে নাটোরের নির্বাচিত কিছু ফসলি জমিতে উন্নত সেন্সর স্থাপন করা হয়েছে। এই সেন্সরগুলো মাটির ভেতরের আর্দ্রতা, পিএইচ  মাত্রা এবং পুষ্টি উপাদানের (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম) পরিমাণ রিয়েল-টাইমে পরিমাপ করতে পারে। কৃষকরা তাদের স্মার্টফোনে ‘স্মার্ট কৃষি’ অ্যাপের মাধ্যমে জানতে পারবেন কখন জমিতে সেচ দিতে হবে এবং ঠিক কতটুকু সার প্রয়োগ করতে হবে। অতিরিক্ত সার ও পানির অপচয় রোধে কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা রাখছে।

আরো পড়ুনঃ ব্যাংকিং খাতের সংকট

রোগবালাই নিখুঁতভাবে নির্ণয় ও সমাধান

আগে কৃষকদের ফসলের রোগবালাই শনাক্ত করতে কৃষি কর্মকর্তাদের জন্য অপেক্ষা করতে হতো কিংবা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কীটনাশক ব্যবহার করতে হতো। এতে অনেক সময় ফসল নষ্ট হতো এবং খরচ বাড়ত। এখন এই হাবে কৃষকরা আক্রান্ত ফসলের পাতার ছবি তুলে অ্যাপে আপলোড করলেই এআই প্রযুক্তি সেকেন্ডের মধ্যে রোগ নির্ণয় করে দিচ্ছে। কোন কীটনাশক কতটুকু মাত্রায় দিতে হবে, তাও বাতলে দেওয়া হচ্ছে। আধুনিক চাষাবাদের এই সহজ সমাধান মূলত কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া এর অন্যতম বড় সুফল।

প্রান্তিক কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা

প্রযুক্তি কেবল ল্যাবরেটরিতে সীমাবদ্ধ না রেখে তা সাধারণ কৃষকদের হাতের মুঠোয় এনে দিতে এই হাবে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের বিনামূল্যে ড্রোন পরিচালনা, ডাটা রিডিং এবং অ্যাপের ব্যবহার শেখানো হচ্ছে। আইসিটি বিভাগের টেকনিক্যাল টিম সার্বক্ষণিকভাবে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা দেবে। প্রান্তিক পর্যায়ে এমন উদ্যোগের ফলেই আজ কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া প্রতিটি কৃষকের ঘরের দুয়ারে পৌঁছাতে পেরেছে।

উৎপাদন খরচ হ্রাস ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি

পরীক্ষামূলক চাষাবাদে দেখা গেছে, প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে সনাতন পদ্ধতির চেয়ে উৎপাদন খরচ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কমে আসে। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার কারণে ফসলের অপচয় শূন্যের কোঠায় নেমে আসে। কৃষকরা তাদের উৎপাদিত ফসলের সঠিক মূল্য পাবেন এবং কম খরচে বেশি ফলন ঘরে তুলতে পারবেন। গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া একটি যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটাতে যাচ্ছে।

পরিবেশবান্ধব টেকসই কৃষি ব্যবস্থা

অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয় এবং পরিবেশের ক্ষতি হয়। স্মার্ট হাবের নিখুঁত নির্দেশনার কারণে কৃষকরা এখন শুধুমাত্র প্রয়োজনমাফিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন। এতে মাটির স্বাস্থ্য ভালো থাকছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ কমছে। পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া এখন বিশ্বজুড়ে সমাদৃত, যা এবার বাংলাদেশেও সফলভাবে বাস্তবায়ন শুরু হলো।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দেশব্যাপী সম্প্রসারণ

আইসিটি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, নাটোরের এই প্রথম স্মার্ট এগ্রিকালচার হাবটির কার্যকারিতা ও সাফল্য মূল্যায়ন করে আগামী দুই বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে এমন হাব স্থাপন করা হবে। সরকার দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে ‘স্মার্ট ভিলেজ’ হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হবে, যা বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পাশাপাশি কৃষি পণ্য রপ্তানিতেও সাহায্য করবে।

 

নাটোরে দেশের প্রথম স্মার্ট এগ্রিকালচার হাবের এই আত্মপ্রকাশ প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের কৃষি খাত এখন আর শুধু লাঙল-জোয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তরুণ প্রজন্মের মেধা আর আধুনিক প্রযুক্তির মেলবন্ধনে দেশের কৃষি আজ এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। কৃষিতে এআই ও ড্রোনের ছোঁয়া যেভাবে নাটোরের মাঠকে সমৃদ্ধ করছে, তা আগামী দিনে পুরো বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। এই অগ্রযাত্রার সুফল ঘরে তুলে দেশের প্রতিটি কৃষক মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এটাই স্মার্ট বাংলাদেশের মূল চাবিকাঠি।

নিউজটি ‍শেয়ার করতে নিচের বাটনগুলোতে চাপ দিন

আরো খবর