
পবিত্র ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিনে দুপুরের পর থেকেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রধান প্রধান পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে ঢল নেমেছে লাখো মানুষের। ঈদের চিরচেনা ব্যস্ততা আর আনুষ্ঠানিকতা শেষে পরিবার ও প্রিয়জনদের সাথে ছুটির দিনে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মেতেছেন সবাই। ঢাকার হাতিরঝিল, মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানা, আশুলিয়ার ফ্যান্টাসি কিংডম এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ও বিশ্বের দীর্ঘতম কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিটি স্পটেই তৈরি হয়েছে উৎসবের আমেজ, কোথাও কোথাও মানুষের চাপে তিল ধারণের ঠাঁই নেই।
বিনোদন কেন্দ্রগুলোর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদের প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনে দর্শনার্থীদের সমাগম বহুগুণ বেশি। বিকেল গড়াতেই চারপাশের কোলাহল আর রঙিন পোশাকে উৎসবের রঙ ছড়িয়ে পড়ে সবখানে।
হাতিরঝিলে তরুণ-তরুণী ও পরিবারের জলযান ভ্রমণ
রাজধানীর ফুসফুস খ্যাত হাতিরঝিলে দুপুরের পর থেকেই দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে রামপুরা, বাড্ডা ও মগবাজার অংশ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ হাতিরঝিলে প্রবেশ করেন। ওয়াটার ট্যাক্সিগুলোতে ওঠার জন্য দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। যান্ত্রিক ঢাকার বুকে একটু খোলা হাওয়া আর লেকের পানির শীতল পরশ নিতে সপরিবারে এসেছেন অনেকে। বন্ধুদের সাথে সেলফি তোলা, আড্ডা আর লেকের পাড়ে হেঁটে বেড়ানোর মাধ্যমে তরুণ-তরুণীরা এই ছুটির দিনে ঈদের আনন্দ ফ্রেমবন্দি করছেন। হাতিরঝিলের উন্মুক্ত মঞ্চ ও ব্রিজের ওপর বিকেল থেকেই মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় শিশুদের উপচে পড়া ভিড়
ঈদের ছুটিতে শিশুদের প্রথম পছন্দ মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানা। আজ সকাল থেকেই চিড়িয়াখানার প্রবেশদ্বারে টিকিট কাটার জন্য উপচে পড়া লম্বা লাইন দেখা যায়। দুপুরের পর এই ভিড় আরও প্রকট আকার ধারণ করে। বাঘ, সিংহ, হরিণ ও জলহস্তীর খাঁচার সামনে ছিল উৎসুক শিশুদের কোলাহল। রাজধানীর কামরাঙ্গীরচর থেকে আসা এক অভিভাবক বলেন, “কোরবানির সব কাজ শেষ করে আজ বাচ্চাদের নিয়ে বের হলাম। চিড়িয়াখানায় এসে বাচ্চারা খুব খুশি, আর তাদের এই হাসিমুখ দেখাই মূলত আমাদের ছুটির দিনে ঈদের আনন্দ।” তীব্র গরম উপেক্ষা করেই অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে এখানে ভিড় করছেন।
ফ্যান্টাসি কিংডমে থ্রিল আর রোমাঞ্চের ছোঁয়া
ঢাকার অদূরে আশুলিয়ার থিম পার্ক ‘ফ্যান্টাসি কিংডম‘ ও ‘ওয়াটার কিংডম’-এ রাইড চড়ার জন্য তরুণদের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা দেখা গেছে। রোলার কোস্টার, জায়ান্ট স্প্ল্যাশসহ বিভিন্ন রোমাঞ্চকর রাইডে চড়তে দর্শনার্থীরা দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। ওয়াটার কিংডমের ডিজে মিউজিক আর কৃত্রিম ঢেউয়ের পুলে মেতে উঠেছে কিশোর-কিশোরীরা। পার্ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও বাড়তি বিনোদনের জন্য ঈদের বিশেষ শো এবং লাইভ মিউজিকের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা আগত অতিথিদের মাঝে ছুটির দিনে ঈদের আনন্দ আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আরো পড়ুনঃ তীব্র গরমের পর স্বস্তির আভাস
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সৈকতে সমুদ্রের গর্জন আর আড্ডা
ঢাকার বাইরে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে দুপুরের পর থেকেই যেন মানুষের মেলা বসেছে। পতেঙ্গার নেভাল এরিয়া এবং নতুন জেটি ঘাটে মানুষের হাঁটার জায়গা পর্যন্ত ছিল না। সমুদ্রের আছড়ে পড়া ঢেউ আর শীতল বাতাসে গা ভাসাতে চট্টগ্রামের আশেপাশের জেলাগুলো থেকেও হাজার হাজার মানুষ ছুটে এসেছেন। ঘোড়ার পিঠে চড়া, স্পিডবোট ভ্রমণ আর সাগরের তীরে বসে চটপটি-ফুচকা খাওয়ার মাধ্যমে মধ্যরাত পর্যন্ত মানুষ মেতে ছিল উৎসবে। পতেঙ্গায় আসা এক দম্পতি জানান, যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে সাগরের তীরে এই সময়টুকু কাটাতে পারাটাই তাদের ছুটির দিনে ঈদের আনন্দ।
কক্সবাজারে লাখো পর্যটকের ঢল, বুকিং শেষ হোটেলগুলোতে
দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন হাব কক্সবাজারে ঈদের দ্বিতীয় দিনেই পা রেখেছেন লাখ লাখ পর্যটক। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্টে পা রাখার মতো কোনো জায়গা নেই। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা সাগরের নীল জলে গোসল আর ওয়াটার বাইক রাইডিংয়ে মেতে উঠেছেন। পর্যটকদের এই উপচে পড়া ভিড়ের কারণে কক্সবাজারের চার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্টহাউসের প্রায় সব কক্ষই শতভাগ বুকড হয়ে গেছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও হয়রানি বন্ধে সমুদ্র সৈকত জুড়ে সাদা পোশাকে এবং ড্রোনের মাধ্যমে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে, যাতে সবাই নির্বিঘ্নে ছুটির দিনে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন।
যানজট ও অতিরিক্ত ভাড়ার ভোগান্তি
বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে উৎসবের আমেজ থাকলেও যাতায়াতের ক্ষেত্রে দর্শনার্থীদের বেশ ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। হাতিরঝিল ও চিড়িয়াখানার আশেপাশের সড়কগুলোতে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া সিএনজি ও রিকশাচালকেরা স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ ভাড়া দাবি করছে বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ দর্শনার্থীরা। তবে এই উৎসবের দিনে কিছুটা বাড়তি খরচ আর ভোগান্তি মেনে নিয়েই মানুষ মেতে উঠেছেন উদযাপনে। সকল কষ্টকে ভুলে পরিবারকে একটু খুশি রাখাই যেন এই ছুটির দিনে ঈদের আনন্দ এর মূল সার্থকতা।
ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই খুশি। ঈদের এই বিশেষ দিনগুলোতে বিনোদন কেন্দ্রগুলোর এই উপচে পড়া ভিড় প্রমাণ করে বাঙালি কতটা উৎসবপ্রিয়। কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি দূর করে পরিবারের সাথে কিছুটা সুসময় কাটানো প্রতিটি মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনের সঠিক তদারকি আর লজিস্টিক সহায়তায় দেশের বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে এই উৎসবের পরিবেশ আরও নিরাপদ ও আনন্দময় হয়ে উঠুক। সব ধরনের নাগরিক ক্লান্তি আর অবসান ভুলে প্রতিটি নাগরিকের জীবনে এই ছুটির দিনে ঈদের আনন্দ চিরকাল এক রঙিন স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকুক—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।







